ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ১৭৮ জন আহত হওয়ার পরদিনই নতুন ঘোষণা দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। দেশের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজিপি)। খবর এএফপির।
আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে শত শত বিক্ষোভকারী অবস্থান নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের দাবিতে এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
এর আগে গতকাল সোমবার ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপি) অনলাইন আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির কেন্দ্রস্থলে জড়ো হন।
চলতি বছরের মে মাসে যাত্রা শুরুর পর থেকেই সিজেপি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ২০২৪ সালে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসা হিন্দু-জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য এই আন্দোলনকে অন্যতম বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, আমরা থামব না। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করতেই হবে।
সোমবার সিজেপি ভারতের সংসদের দিকে মিছিল করার জন্য বিশাল জনতাকে একত্রিত করলেও আজ মঙ্গলবারের সমাবেশে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। তবে আন্দোলনের প্রধান ও সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক বিক্ষোভকারীদের আশা না হারানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ওরা আমাদের মনোবল ভেঙে দিতে চায়। ওদেরকে আপনাদের কণ্ঠরোধ করতে দেবেন না।
উল্লেখ্য, সোমবার বিক্ষোভকারীদের সংসদ অভিমুখে মিছিল ঠেকাতে দিল্লির রাজপথে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এটি গত পাঁচ বছরের মধ্যে দিল্লির অন্যতম বড় বিক্ষোভ সমাবেশ বলে জানা গেছে।
সোমবার গভীর রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৭৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১১৮ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। পুলিশ এই ঘটনাকে ‘হিংস্র জনতার অবাধ্য ও আক্রমণাত্মক আচরণ’ হিসেবে অভিহিত করে এর তীব্র সমালোচনা করেছে। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, ধস্তাধস্তির সময় প্রায় ৬০ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, আন্দোলনের আয়োজকরা কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপকে ‘স্বৈরাচারী আচরণ’ বলে নিন্দা করেছেন। তাদের দাবি, পুলিশের হামলায় শত শত বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। সিজেপি মুখপাত্র রাঙ্কা এএফপিকে বলেন, ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এটি একটি লজ্জাজনক দিন। সাধারণ মানুষ ও ছাত্ররা একটি যৌক্তিক দাবি নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু দিল্লি পুলিশ তাদের ওপর নির্মমভাবে চড়াও হয়েছে। তিনি আরও জানান, সরকারের ঊর্ধ্বতন মন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেও এখনও তাদের দাবির কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব মেলেনি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের বিরোধী দলগুলো আজ মঙ্গলবার সংসদে ছাত্রদের ওপর চালানো কথিত ‘নিষ্ঠুরতা’ নিয়ে জরুরি আলোচনার দাবি জানিয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ন্যায্য প্রশ্ন করার জন্য মারধর করা হয়েছে। সংসদ যদি ভারতের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে না পারে, তাহলে এর উদ্দেশ্য কী?
ভারতের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশটির লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনও ভালো বেতনের চাকরি খুঁজে পেতে সংগ্রাম করছে, যা এই অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। মূলত দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা নাড়িয়ে দেওয়া ধারাবাহিক কয়েকটি পরীক্ষা কেলেঙ্কারির পরই এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। গত মাসে প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে বাতিল হওয়া একটি পরীক্ষায় প্রায় ২২ লাখ মেডিকেল শিক্ষার্থী কড়া নিরাপত্তার মধ্যে পুনঃপরীক্ষায় বসে। এর আগে আরও প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীর অনলাইন মূল্যায়ন পদ্ধতি সংক্রান্ত আরেকটি কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছিল।
তবে সরকারের পক্ষ সমর্থন করে সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি জানান, মঙ্গলবার মিত্রদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভবিষ্যতে অনিয়ম রোধে একটি ‘নিখুঁত ব্যবস্থা’ চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। অবশ্য এই বিক্ষোভ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি এখনও সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।







