এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) বিল পরিশোধও করার দেশের বর্তমান নিট রিজার্ভ ২৭ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট (গ্রস) রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। এদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের প্রথম ৬ দিনে দেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে ৬৯ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় আট হাজার ৫৪৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা হিসাবে)। রিজার্ভের শক্তিশালী অবস্থান এবং প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকার মধ্যেই মালয়েশিয়ায় নতুন করে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার সুখবর পাওয়া গেল। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে দ্রুত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার আশা জেগেছে বাংলাদেশিদের মনে।
আরও জানা যায়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দুই দফায় উদ্যোগ নিয়েও সংকটের সমাধান করতে পারেনি। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা করতে ১৩ মে তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিনিধিদল দেশটি সফরে গেছে। সেখানে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী স্টিভেন সিম চি কেওয়ংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। তবে এ সফরের পরও কোনো সুফল আসেনি।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর এপ্রিলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন মালয়েশিয়া সফর করে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করেন। সফর শেষে তিনি ঘোষণা করেন, দ্রুতই বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।
জানা যায়, ২০২৪ সালের মে মাস থেকে বন্ধ আছে বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। তবে নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, বনায়ন, পরিষেবাসহ বিভিন্ন খাতে ৮ থেকে ১০ লাখ বাংলাদেশি এখনো কাজ করছেন মালয়েশিয়ায়। কিন্তু ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত মোট পাঁচবার বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শ্রমবাজার। এর পেছনে রয়েছে সিন্ডিকেট, অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, দুর্নীতি, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও শ্রম অধিকারের অবনতিসহ পরস্পর সম্পর্কিত কারণ।
১৯৭৮ সালে ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেইনিংয়ের মাধ্যমে ২৩ জনকে পাঠিয়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী রপ্তানি শুরু করে বাংলাদেশ। এরপর ১৯৮৬ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ৫০০ জন শ্রমিক পাঠানো হয় দেশটিতে। দুই দেশের সরকারের মধ্যে শ্রমিক অভিবাসনবিষয়ক প্রথম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৯২ সালে। কিন্তু তারপরও ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত শ্রমবাজারটি প্রায় বন্ধ ছিল।
তবে এবার মালয়েশিয়া নয়, বাংলাদেশই রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করবে। তাই সিন্ডিকেট ও দুর্নীতি এড়াতে সরকার ও এজেন্সিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৮ সালে শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পর ২০১৬ সালে আবার চালু হয়। পরে দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া আবারও বন্ধ করে মালয়েশিয়া।
এরপর আবার ২০২২ সালের আগস্ট থেকে আবার কর্মী যাওয়া শুরু হয়। তবে ২০২৪ সালের ১ জুন আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন শর্ত শিথিল নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে।
এদিকে ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা ৭ হাজার ৮৭৩ জন কর্মীকে পাঠানোর দায়িত্ব সরকারি সংস্থা বোয়েসেলকে দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পেরেছেন। বাকি কর্মীদের বিষয়েও দ্রুত পৃথক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২১ জুন দুদিনের সরকারি সফরে তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরেও দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। দুই দেশের সরকারের আলোচনার মাধ্যমে আইনি জটিলতা দ্রুত কাটিয়ে শ্রমবাজার আবারও চালুর ঘোষণা এলো।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত—শুধু শ্রমবাজার উন্মুক্ত করলেই হবে না, একটি স্বচ্ছ ও নিরাপদ অভিবাসনের পরিবেশই তৈরি করতে না পারলে, রক্ষিত হবে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার।
শ্রমবাজার বিষয়ক বিশ্লেষকরা জানান, স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে আবারও জনশক্তি রপ্তানিতে ধাক্কা আসতে পারে।






