চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা ও তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনায় দেশটির সম্পৃক্ততার খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশে নিজেদের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় নড়েচড়ে বসেছে ভারত। আজ শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বাংলাদেশের এসব সামরিক ও কৌশলগত উন্নয়নের ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ভারতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আজ ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইয়ের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত নিয়মিত সাপ্তাহিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপগুলো নিয়ে ভারতের অবস্থান পরিষ্কার করেন। বাংলাদেশ কর্তৃক চীন থেকে জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল বলেন, ভারত তার প্রতিবেশী দেশের সব ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।
একই সঙ্গে বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার চলমান আলোচনার বিষয়ে ভারতের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ভারতের দেওয়া আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা মূলত একটি দ্বিপক্ষীয় এবং যৌথভাবে অনুমোদিত রোডম্যাপের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যা দুই দেশ নিয়মিত পর্যালোচনা করে থাকে। তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে ভারতের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তিস্তা ইস্যু নিয়ে ভারতের সামগ্রিক ও চূড়ান্ত কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পসংক্রান্ত সব ধরনের আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং গতিপ্রকৃতিকে ভারত পুরোপুরি বিবেচনায় রাখবে।
এএনআই তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, তিস্তা নদী ও এর পানিবণ্টন ইস্যুটি দীর্ঘদিন ধরে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অন্যতম প্রধান এবং সংবেদনশীল একটি বিষয়। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর সম্পন্ন করেছেন এবং সফর শেষে তিনি ঘোষণা করেছেন, বাংলাদেশের এই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি চীনের কাছ থেকে পূর্ণ সমর্থন ও আর্থিক সহযোগিতার নিশ্চয়তা লাভ করেছেন।
এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আগে একবার বলেছিলেন, দুই দেশের মধ্যে প্রবাহিত ৫৪টি নদীর পানিবণ্টন-সংক্রান্ত সব বিষয় মূলত একটি সুনির্দিষ্ট দ্বিপক্ষীয় কাঠামোগত ব্যবস্থার অধীনে আলোচনা করা হচ্ছে।
তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের বিরোধিতার কারণে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ঝুলে রয়েছে। এর আগে ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় এই বিরোধ নিষ্পত্তির একটি বড় চেষ্টা করা হয়েছিল, যেখানে তিস্তার পানির ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাংলাদেশকে ও ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ ভারতকে দেওয়ার একটি প্রস্তাবিত চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর রাজ্যের কৃষি ও সেচব্যবস্থার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার দোহাই দিয়ে শেষ মুহূর্তে এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি।
এরও আগে ১৯৮৩ সালে তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে একটি অস্থায়ী চুক্তি হয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশকে ৩৬ শতাংশ ও ভারতকে ৩৯ শতাংশ পানি দেওয়ার কথা বলা হলেও ২৫ শতাংশ পানির হিসাব পরে নির্ধারণের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু সেই চুক্তিও কখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এ ছাড়া ফারাক্কা ব্যারাজে শুষ্ক মৌসুমে পানিবণ্টন নিয়ে ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি চুক্তি থাকলেও বাংলাদেশ প্রায়ই লিন পিরিয়ড বা কম পানির মাসগুলোতে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ার অভিযোগ করে আসছে, যা দেশটির কৃষি ও লাখ লাখ মানুষের জীবিকাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানির প্রাপ্যতা আরও কমে যাওয়ায় এই বিরোধ দিন দিন আরও তীব্র রূপ নিচ্ছে।







