১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর পলাশীর বেদনার ঠিক ২০০ বছর পর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলির রোজ গার্ডেনে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। পলাশীতে বাংলার যে রাজনৈতিক পরাজয় ঘটেছিল, রোজ গার্ডেনে সেই হৃত অধিকার ও স্বাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে। এটাই ঐতিহাসিক গুরুত্ব সৃষ্টি করে যা ইউনিক ব্যাপার। দলটি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে মুক্তির সূচনার ইঙ্গিত দেয়।
আওয়ামী লীগের ৭৭ বছর :
সাতাত্তর বছর। বাংলাদেশের জন্মের চেয়েও দীর্ঘ এই পথচলা। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পেছন ফিরে তাকালে যা দেখা যায়, তা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়, বরং একটি জাতির অস্তিত্বের লড়াই, একটি ভূখণ্ডের ক্রমশ মাথা তোলার গল্প। স্বাধীনতার রক্তাক্ত ভোরে যে দল দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই দলই পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলাদেশকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তা আজ আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত। ২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজনীতির পট যেভাবে পালটেছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই অর্জনগুলো নিয়ে কথা বলা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই দল ভাষার জন্য লড়েছে, মানুষের অধিকারের জন্য লড়েছে। এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি নতুন দেশের জন্ম দিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই ভূমিতে টিকে থাকাটাই ছিল তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ৭৫ বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে এই দল অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল। নাম উচ্চারণ করা তত সহজ ছিল না। ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগকে উজ্জীবিত করেন। ২১ বছর পরে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতার মসনদে আরোহন করে আওয়ামী লীগ। ২০০৯ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন ফের ক্ষমতায় ফিরলেন, দেশের চিত্রটা মোটেই সুখকর ছিল না।
যে দল বাঙালির পরাজয়ের গ্লানি থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ছাই ভস্ম থেকে উঠে দাঁড়াতে পারে সেটা আওয়ামী লীগ। পলাশীর প্রান্তরে পরাজয়ের গ্লানি থেকে একটি জাতির ইতিহাস তৈরি করতে পারে সেটা আওয়ামী লীগ।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে আওয়ামী লীগের পরিণতির অদ্ভুত মিল:
নবাব সিরাজের পতনের ঘটনা আর আড়াইশ বছর পর শেখ হাসিনার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য দেখিনা। সেদিন সিরাজের মাথার তাজ সমুন্নত ছিল, রাজকীয় পোশাক ছিল। সৈন্য সামন্ত আর বাংলার মানুষের সাহসের প্রতীক ছিলেন সিরাজ। মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে লর্ড ক্লাইভের প্ররোচনায় সেদিন প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল সিরাজকে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব এর পরিণতি ছিল অবধারিত মৃত্যু আর সিংহাসন ত্যাগ। জীবজন দিয়ে সিরাজ আলীবর্দী খানের উত্তরসূরি সিরাজ সেদিন বেইমানি কারণে বাংলার মসনদ দখল হয়েছিল আপনজনের ষড়যন্ত্রের কাছে।
২০২৪ এর ৫ আগষ্টের সঙ্গে নবাব সিরাজের পতনের ঘটনার অনেক মিল দেখি। ইতিহাস খুকলে বাকে বাকে সত্য যেন হুহু করে কেঁদে উঠে। আলীবর্দী খান যেন কবির থেকে তার দৌহিত্র করুন পরিণতি দেখে আফসোস করছেন এদিকে আড়াইশ বছর পর আলী বর্দি খানের আরেক অনুসারী বাংলার রাখল রাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেন তার কণ্যদয়ের জন্য তেমন অনুভূতি। পলাশীর আম্রকাননে সেই বিশ্বাস ঘাতকদের পরিণীতি হয়েছিল অত্যন্ত করুন ও বেদনা বিধুর। আজকের বেঈমানদের পরিণীতি একই ভাবে দেখি। এটা কেউ স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি পাচ্ছে না। বেইমানি আর পেছনের দরজা দিয়ে প্রভুদের খুশি করে ক্ষমতা দখল যেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
আমি পলাশী আর ৫ আগষ্টের মধ্যে বেশ মিল পাই। সেদ্দিন সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে ছিল। সিরাজের বাহিনী একই ঘটনা। সেদিনের কুশীলব আর সমকালীন সময়ের কুশীলবদের মধ্যে দারুণ মিল পাই। সেদিনের মসনদ দখল ছিল বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় এখানকার ঘটনা একই। যেখানে বিদেশি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট রয়েছে। আর এর পেছনে রয়েছে দেশ বিরুধি ইউনূস গং। যারা এদেশকে সোনায় মোড়ানো গল্পে প্রলুব্ধ করেছিল তরুণদের। কিছুদূর যেতে না যেতেই অপকর্মের আর কুশীলবদের সবই নিজে মুখে বেরিয়ে এসেছে।
এদেশকে বিদেশিদের কাছে তুলে দেয়ার প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল শেখ হাসিনা। তাকে মেরে ফেলা যাদের টার্গেট অল্পের কারণে ব্যাঘাত ঘটে। খোদা যাকে রক্ষা করতে চায় তাকে মারার সাধ্য কর আছে। জীবন বাঁচানো ফরজ হলেও তিনি এদেশ ছাড়তে চাননি। তিনি পিতা মুজিবের কুটিরে যেতে চেয়েছিলেন। ক্ষমতার ক্রিনক যারা ছিল তারা আজ বলছেন তিনি পালিয়ে গেছেন। এটাকে কি পালানো বলে যেদেশের বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান করে তিনি আরেকটি রাষ্ট্রে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি জীবন থেকেও এদেশকে ধারণ করেছেন তাই তার উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সামিল ছিলেন।
এদেশের যা কিছু অর্জন সব আওয়ামী লীগের হাত ধরেই। এই একটি দল একটি দেশ, ভাষা , সার্বভৌমত্ব দিয়েছে। , পতাকা দিয়েছেন। দিয়েছেন অর্থনৈতিক মুক্তি। উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পথে শেখ হাসিনার এই লড়াই অনেকের মুখ ভবিষ্যতে ফ্যাকাসে হবে, হতে শুরু করেছে। তাইতো এই দলের প্রতি মানুষ একসময় বেশি আশা করেছিল,দলের নেতৃত্বে গুণে ধরেছিল তাই একটি প্রজন্মকে ভুল পথে পরিচালিত করতে সফল হয়েছিল ষড়যন্ত্রকারীরা। আর সেটি আওয়ামী লীগের কোন কৃতিত্ব ছাড়াই বাংলার মানুষ আবার বুঝতে পেরেছে আগেই ভালো ছিলাম।
একটা দুর্ভাগ্য হল আওয়ামী লীগ কে এদেশের মানুষ কখনও প্রত্যাখ্যান করেনি, আওয়ামী লীগে নিজেরাই নিজেদের ডুবিয়ে দিয়েছেন। আওয়ামী ক্ষমতায় এলে এদেশের মানুষ জিতে যায় সবকিছুতেই। আর হেরে গেলে সবাই ডুবিয়ে হয়। এটা শেখ হাসিনা বিহীন, আওয়ামী লীগ বিহীন এদেশ গত বিশ মাসে সেটা হারে হারে উপলব্ধি করেছেন।
আজ পথে প্রান্তরে সাধারণ মানুষের মুখে ওয়াকার ইউনুস সরকার এর প্রতি তিরস্কার গালি শুনতে পাই। ইউনূস একজন দেশদ্রোহী সেটা ইতোমধ্যে তার কর্মকাণ্ডে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন নতুন সরকার ক্ষমতায়। তাদের কিছু করবার মানসিকতা থাকলেও জামাত এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি সেটি নস্যাৎ করবে। তার কারণ এরা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে ক্ষমতায় এলেও মুকিযুদ্ধের চরম অবমাননার সময় শুধু মাত্র ক্ষমতার জন্য চুপ থাকছে। যদি বিএনপির অবস্থান। আরও পরিষ্কার হতো দেশটা এভাবে ছারখার হতো না।
এত অনাচার জামাত করেছে এর দায় পড়েছেন রাজনৈতিক দলের উপর। এদেশকে মানলে এদেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলে অবশ্যই আওয়ামী লীগকে অস্বীকার করে শুদ্ধতা আসবে না। আওয়ামী লীগ তার সময় ভুল করেছে অনেক। তবে একটা জায়গায় আওয়ামী লীগ পরিষ্কার সেটা হল দেশটাকে শেয়াল শুকুরের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়া কিংবা কুরুক্ষেত্র পরিণত হতে দেয়নি। আজ ভৌ রাজনীতির কূটকৌশলে শীতল যুদ্ধের ইঙ্গিত এই বঙ্গোপসাগরের তীরে। আওয়ামী লীগ এই যুদ্ধ বন্ধের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। সমরে নয় শেখ হাসিনার পররাষ্ট্র নীতি সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। এমন কৌশলের অংশ হয়ে তিনি বিশ্বকে শান্তির বার্তা দিয়ে গেছেন। আজ তার বিপরীত মুখী অবস্থানে এদেশ আজ নিয়ন্ত্রণহীন।
আওয়ামী লীগ তার ভুল শুধরে দ্রুত সম্ভব রাজনীতিতে নিয়ামক শক্তি হয়ে ভূমিকা রাখবে। তবে যাদের কারণে আওয়ামী লীগকে এদেশের তরুণ প্রজন্মের একটা অংশ ভুল বুঝেছিল যাদের জন্য প্রাসাদ ষড়যন্ত্র হয়েছিল তাদের ছাড় দিলে এ দল ভবিষ্যতে আরেক পলাশী আরেক ৫ আগষ্ট ঘটিবে। এ ক্ষেত্রে রাজনীতির রণনীতি অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে। মানুষের জন্য রাজনীতি অনিবার্য হোক, কোন অস্থিরতায় নয় কোন অনিষ্টের রাজনীতি নয় বরং মানুষ কদিন পর রাজপথে ফেটে পড়বে এ দলকে কার্যক্রম নিষিদ্ধের
তকমা থেকে বের করতে। আওয়ামী লীগ আছে থাকবে। যদি এদেশ থাকে। তবে অবশ্যই এটি অনিবার্য বাকিরা অনর্থক। কারণ আওয়ামী লীগ মানেই এদেশ। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে এ দলের মধ্য দিয়েই। কখনও ইউনূস সিরাজ কিংবা বঙ্গবন্ধুর ভুলকে আসতে পারবে না। ইউনূস সব সময় মীর জাফরের তালিকায় মূল্যায়িত হবে।
আজ ২৩ শে জুন যে দমন পীড়নের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপিত হয়েছে তাতে একটা বার্তায় স্পষ্ট হয় সেটি হচ্ছে আওয়ামী লীগ খুব দ্রুত মানুষের মধ্যে রেসপন্স করতে পেরেছে। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত ৩২ নম্বরে সেনা মোতায়ন করে সমর্থকদের উপর যে টর্চার করা হয়েছে সেটি নিন্দনীয়। আওয়ামী লীগ যে ভুল বিএনপির প্রতি করেছে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে দেশটা প্রতিহিংসার অনল থেকে বের হতে পারবে না। আমরা মনে করি দেশটার সামনে এগিয়ে যাওয়া দরকার তার জন্য সকল দল ও মতের অংশগ্রহণ জরুরী।







