যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে যুক্ত হচ্ছে ফায়ারিং স্কোয়াড, বৈদ্যুতিক শক ও বিষাক্ত গ্যাস

যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে নতুন তিনটি পদ্ধতি যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রাণঘাতী ইনজেকশনের ওষুধের স্বল্পতার কথা উল্লেখ করে গত শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসন ফায়ারিং স্কোয়াড (গুলি করে মারা), ইলেকট্রিক চেয়ার (বৈদ্যুতিক শক) এবং বিষাক্ত গ্যাসের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ঘোষণা দিয়েছে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ফেডারেল পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ড পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি পূরণের অংশ হিসেবে মার্কিন বিচার বিভাগের একটি প্রতিবেদনে এই সুপারিশ এসেছে। তবে নতুন করে এ ধরনের কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

২০২১ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে ২০ বছরের বিরতি ভেঙে ফেডারেল পর্যায়ে পুনরায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শুরু হয়েছিল। তখন ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ কয়েক মাসে ১৩ জন কয়েদির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অথচ এর আগের ৫০ বছরে ফেডারেল পর্যায়ে মাত্র তিন জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত অঙ্গরাজ্য সরকারগুলোই অধিকাংশ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে থাকে। গত বছর পুনরায় হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেনের জারি করা ফেডারেল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের স্থগিতাদেশ বাতিল করেন। বর্তমানে দেশজুড়ে ৪০ জনেরও বেশি আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আবেদন জানিয়েছে ট্রাম্পের বিচার বিভাগ। যদিও এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

বিচার বিভাগের ৫২ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনের ভূমিকায় ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ লিখেছেন, বাইডেন প্রশাসনের স্থগিতাদেশের কারণে ফেডারেল মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থা ‘ক্ষুণ্ণ’ হয়েছে এবং এর ফলে ভুক্তভোগী পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ‘পরিণাম ভোগ’ করতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন:  সৌদিতে যাচ্ছেন ট্রাম্প, দেবেন ১০০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব

প্রতিবেদনে ব্ল্যাঞ্চ ব্যুরো অব প্রিজন্সকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিদ্যমান বিধিমালা (প্রোটোকল) পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন। এতে ফায়ারিং স্কোয়াড এবং ইলেকট্রিক চেয়ারের মতো পুরোনো পদ্ধতির পাশাপাশি ২০২৪ সালে আলাবামা অঙ্গরাজ্যের চালু করা ‘গ্যাস অ্যাসফিক্সিয়েশন’ বা বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরোধ করে মারার মতো সাংবিধানিক পদ্ধতিগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্দিষ্ট কোনো ওষুধের সংকট থাকলেও বিকল্প পদ্ধতিগুলো যুক্ত থাকলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হবে।

ডেমোক্র্যাট নেতা জো বাইডেন তাঁর মেয়াদে ফেডারেল পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা ৪০ জনের মধ্যে ৩৭ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেছিলেন। বর্তমানে মাত্র তিনজন ফেডারেল মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় আছেন। তাঁরা হলেন, ২০১৫ সালে বোস্টন ম্যারাথনে বোমা হামলার দায়ে দণ্ডিত জোখার সারনায়েভ, ২০১৭ সালে সাউথ ক্যারোলাইনার গির্জায় নয়জনকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত ডিলান রুফ এবং ২০২৩ সালে পিটসবার্গের একটি সিনাগগে ১১ জনকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত রবার্ট বাওয়ার্স।

এখনো মৃত্যুদণ্ড প্রথা চালু আছে এমন পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। যদিও দেশটির জনমতে এই দণ্ডের প্রতি সমর্থন ক্রমান্বয়ে কমছে। গ্যালাপ জরিপ অনুযায়ী, গত অক্টোবরে ৫২ শতাংশ আমেরিকান খুনের মামলায় মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করেছেন, যা গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে ৪৪ শতাংশ মানুষ এর বিরোধিতা করেছেন।

আরও পড়ুন:  যুক্তরাষ্ট্রের ‘এইচ-১বি ভিসা’ পুরোপুরি বাতিলের উদ্যোগ ট্রাম্প প্রশাসনের

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা চ্যালেঞ্জ করার সব আইনি পথ শেষ হতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। বিচার বিভাগের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ফেডারেল পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা ওই তিনজনের কারও দণ্ড কার্যকরের তারিখ এখনো নির্ধারিত হওয়ার যোগ্য নয়।

সাধারণত কোনো অঙ্গরাজ্য বা ফেডারেল সরকার নতুন কোনো মৃত্যুদণ্ড পদ্ধতি গ্রহণ করলে কয়েদিরা একে ‘নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক শাস্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পান। অতীতে সুপ্রিম কোর্টে এ ধরনের চ্যালেঞ্জগুলো টেকেনি। তবে ফায়ারিং স্কোয়াড বা ইলেকট্রিক চেয়ারের মতো পদ্ধতিগুলো উনিশ শতকের পর থেকে শীর্ষ আদালত আর পর্যালোচনা করেনি। এমনকি বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরোধ করার পদ্ধতি নিয়ে করা চ্যালেঞ্জ শুনতেও আদালত এখনো রাজি হননি।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি। তবে এই পদ্ধতিতে জটিলতা তৈরির হার অন্যগুলোর চেয়ে বেশি। ২০১৯ সালে ফেডারেল সরকার ‘পেন্টোবারবিটাল’ নামক একটি শক্তিশালী বারবিচুরেট ওষুধের মাধ্যমে একক পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে কয়েদির শরীরে সূচ ফোটানোর শিরা খুঁজে না পাওয়ায় দণ্ড কার্যকর মাঝপথে বন্ধ করতে হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, ময়নাতদন্তে দেখা গেছে ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুর আগে কয়েদিরা পানিতে ডুবে মরার মতো তীব্র যন্ত্রণা ভোগ করেন।

ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মৃত্যুদণ্ডে ব্যবহারের জন্য তাদের ওষুধ সরবরাহ করতে অস্বীকার করছে। এর একটি কারণ হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা। ফলে জেল কর্তৃপক্ষকে এখন ছোট ও কম নিয়ন্ত্রিত ফার্মেসিগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন:  ট্রাম্পের শপথের আগে বিদেশি শিক্ষার্থীদের দ্রুত ফিরে আসার আহ্বান

এসব কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু অঙ্গরাজ্য পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাচ্ছে। ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে ফায়ারিং স্কোয়াড পদ্ধতি চালু আছে এবং আইডাহো আগামী জুলাই থেকে একে প্রাথমিক পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত বছর সাউথ ক্যারোলাইনায় ১৫ বছর পর প্রথমবার ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২০২৪ সালে আলাবামা প্রথম অঙ্গরাজ্য হিসেবে ফেস মাস্কের মাধ্যমে নাইট্রোজেন গ্যাস প্রয়োগ করে এক কয়েদির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। এরপর আরকানসাস, লুইজিয়ানা, মিসিসিপি ও ওকলাহোমাও এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।

অ্যামেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের (এসিএলইউ) ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট প্রজেক্টের পরিচালক ক্যাসান্দ্রা স্টাবস ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, বিচার বিভাগ এমন সব পদ্ধতিকে গ্রহণ করছে যা চরম বেদনাদায়ক ও নিষ্ঠুর হিসেবে বিশ্বজুড়ে নিন্দিত।

সিনেটের জুডিশিয়ারি কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ডিক ডারবিন এক বিবৃতিতে মৃত্যুদণ্ডকে ‘বর্বরোচিত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই হত্যাকাণ্ড কোনো ন্যায়বিচার নয়। এই পদক্ষেপগুলো আমাদের জাতির ইতিহাসে কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *