পোশাকশিল্পের সুতা আমদানিতে শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ

রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট মানের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস অর্থাৎ শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। দেশীয় স্পিনিং-শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষা, রপ্তানি খাতে মূল্য সংযোজন বাড়ানো ও এলডিসি উত্তরণপরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উদ্দেশ্যে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের দাবি। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে পোশাকশিল্পের ওপর ‘বিরূপ প্রভাব’ পড়বে এবং ‘গভীর সংকটের’ সৃষ্টি হবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিল্পমালিকেরা। এই খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ আগামীকাল সোমবার যৌথ সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে।

১২ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেল-২ থেকে এক চিঠিতে সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রত্যাহারের পাশাপাশি শুল্ক কর্তৃপক্ষকে সুতার কাউন্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ এবং এ বিষয়ে কঠোর নজরদারির সুপারিশ করা হয়। এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) আহ্বানের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে শিল্পের সুরক্ষা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন:  যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্টের বাসভবনে হামলা

রপ্তানিমুখী পোশাক খাতকে উৎসাহিত করতে ও প্রতিযোগিতা সক্ষম রাখতে আশির দশক থেকে সুতা আমদানিতে বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার। তবে দেশের বস্ত্রকলমালিকেরা এ সুবিধা বাতিল চান। তাঁদের যুক্তি, প্রতিবেশী দেশ কম দামে বাংলাদেশে সুতা রপ্তানি করায় অস্তিত্বের সংকটের মুখে পড়েছেন তাঁরা। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধা তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

এনবিআরকে দেওয়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, কাস্টমস ট্যারিফের এইচএস কোড ৫২.০৫, ৫২.০৬ ও ৫২.০৭-এর আওতায় ১০ ও ৩০ কাউন্টের সুতায় বন্ড সুবিধা থাকায় গত কয়েক বছরে আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসব কোডের আওতায় সুতা আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৬ হাজার টন, যার মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪১ হাজার টনে এবং মূল্য ছাড়িয়ে যায় প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দিকের প্রবণতাও ঊর্ধ্বমুখী, যেখানে আমদানির পরিমাণ ও মূল্য দুটিই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

বন্ড সুবিধা বন্ধের ব্যাখ্যায় চিঠিতে বলা হয়, বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কে আমদানি করা ১০ ও ৩০ কাউন্টের সুতা দেশীয় বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে, ফলে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। বর্তমানে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদনে সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তারা মাত্র ৬০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করে উৎপাদন কার্যক্রম চালাচ্ছে, যা শিল্পটির আর্থিক টেকসই অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অন্যদিকে, সুতা আমদানির এই প্রবণতার কারণে দেশে উৎপাদিত সুতার বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

আরও পড়ুন:  মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এরই মধ্যে প্রায় ৫০টি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও মিল বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ উভয়ের জন্যই নেতিবাচক। এ ছাড়া সুতা আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের গার্মেন্টস খাতকে ধীরে ধীরে বিদেশনির্ভর করে তুলছে। এতে দেশের বস্ত্রশিল্প ঘিরে সংযোগশিল্প দুর্বল হচ্ছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে শিল্পকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এলডিসি উত্তরণপরবর্তী বাস্তবতার কথা তুলে বলেছে, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো প্রধান রপ্তানি বাজারে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধা অনেকাংশে হারাতে হবে। তখন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, সেপা ও জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে হলে রপ্তানি পণ্যে ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং ‘ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হবে। আমদানি করা সুতার ওপর নির্ভরতা থাকলে এসব শর্ত পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন:  বর্ধিত ভ্যাট প্রত্যাহার করায় যেসব পণ্যের দাম কমবে

সরকার মনে করছে, বন্ড সুবিধা অব্যাহত থাকলে দেশীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং উৎপাদন ব্যয় ও লিড টাইম বেড়ে যাওয়ার কারণে রপ্তানি খাতের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাবে। বিপরীতে, নিম্ন কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে দেশীয় স্পিনিং-শিল্পে ভারসাম্য ফিরে আসবে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *