পুলিশের অনুপস্থিতিতে রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ শিক্ষার্থীরা

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে? কুসুম কুমারী দাশের কবিতার সেই আদর্শ ছেলে এখন বাংলার ঘরে ঘরে। সেই আদর্শ ছেলেরা এখন ঢাকার রাজপথে। তাদের নিয়ে দেশের মানুষ আজ গর্বিত।

কয়েকদিন আগেও তারা অধিকার আদায়ের দাবিতে স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ মুখর করেছে। বুলেটের সামনে বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে অকাতরে জীবন দিয়েছে। তাদের আন্দোলনের মুখে দীর্ঘ দিনের ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয়েছে। সরকার প্রধান শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। সেই ছেলেরাই আবার দেশের অরাজক পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রাণপণ চেষ্টা করছে। নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে পাহারা দিচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির, বাড়ি ঘর। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় এবং ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মানুষদের রক্ষায়ও তারা দিনরাত পাহারা দিচ্ছে। শুধু-তাই নয় এই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরাই এখন রাজপথে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্যও ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করছে।

জনরোষের ভয়ে পুলিশ যখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে, রাস্তায় যখন কোন ট্রাফিক নেই তখন কোমলমতি শিক্ষার্থীরাই মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে লাঠি হাতে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করছে। সিটি-কর্পোরেশনের কর্যক্রম যখন ভেঙ্গে পড়েছে রাস্তায় ময়লা আর্বজনার পাহাড় জমে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে তখন এই বিপ্লবী ছেলারা কিলানারের দায়িত্ব পালন করছে। কুসুম কুমারী দাশ আপনার লেখা আদর্শ ছেলে কবিতার শেষ দু’লাইনে বলেছেন, ‘মনে প্রাণে খাট সবে, শক্তি কর দান,/ তোমরা ‘মানুষ’ হলে দেশের কল্যাণ। এদেশের আদর্শ ছেলেরা আজ সত্যি দেশের জন্য মনে প্রাণে খাটছে। তারা আজ সত্যিকারের মানুষ হয়েই দেশের কল্যাণে জীবন বাজি রেখে কাজ করছে।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর সারাদেশের মানুষ আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠে। ঢাকার রাজপথে, অলিতে-গলিতে, পাড়া মহল্লায় মানুষের ঢল নামে। মুক্তির আনন্দে দিশেহারা মানুষ গণভবন, সংসদভবন দখল করে নেয়। এই আনন্দ উদযাপন অনেক সময় কিছুটা মাত্রাও ছাড়িয়ে যায়। বিাভন্ন স্থানে হামলা ভাংচুর, অগ্নি সংযোগ ও লুটপাট শুরু হয়। এই অরাজক পরিস্থিতি সারাদেশে শুরু হলে আন্দোলনকারীরা বুঝতে পারে যে তাদের এই বিজয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগের দোসরাই এসব করছে। হিন্দুদের বাড়ি ঘরে ভাংচুর করছে, লুটপাট করছে। মন্দিরে হামলা করে এটিকে সম্প্রাদায়িক হামলায় রূপ দেওয়ারও অপচেষ্টা করছে যারা এই আন্দোলনের বিপক্ষে ছিল তারা।

আরও পড়ুন:  স্বস্তি ফেরেনি নিত্যপণ্যের বাজারে, মাছ-মাংসের দাম চড়া

ষড়যন্ত্রকারীদের এই হীন চক্রান্তের বিষয়টি বুঝতে পেরে অর্জিত বিপ্লবকে সুসংহত করতে শিক্ষার্থীরা এবার মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নি সংযোগের ঘটনা প্রতিরোধ করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার জন্য আন্দোলনের সমন্বয়করাও বারবার আহবান জানাচ্ছেন। শুধু তাই নয় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারাও হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘর-বাড়ি এবং মন্দির পাহারা দেওয়ার জন্য তাদের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের আহবানে ও নির্দেশে ইতোমধ্যে দেশের পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত হয়ে এসেছে।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের মন্দির, খ্রিস্টানদের গীর্জাসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় ও তাদের বাড়ি ঘর পাহারা দিতে শুরু করেছে। গত মঙ্গলবার বিকাল থেকে তারা এ কাজটি করছে। রাজধানীতে ঢাকেশ্বরী মন্দির, রমনার কালিমন্দিরসহ বিভিন্ন এলাকায় গতকাল শিক্ষার্থীদের পাহারা দিতে দেখা যায়। এ ছাড়া মেরুল বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টোদিকে বৌদ্ধদের উপসনালয়ও শিক্ষার্থীরা পাহারা দিচ্ছে।

এই আন্দোলনে পুলিশের উপর জনগণের তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমপ্লিট শাট ডাউন কর্মসূচিতে রংপুরে পুলিশ প্রকাশ্যে আবু সাঈদের বুকে গুলি করে হত্যা করার পর তাদের প্রতি জনরোষ তীব্র আকার ধারণ করে এবং তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা ঘেরাও করে পুলিশের উপর জনগণ হামলা করে। অনেক স্থানে থানা ভাংচুরের ঘটনাও ঘটে।

তীব্র ছাত্র গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ক্ষুব্ধ জনগণ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় হামলা ভাংচুর শুরু করে। অনেক থানা পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ অবস্থায় পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। সরকারের পদত্যাগের পর উর্ধ্বতন সব পুলিশ অফিসার আত্মগোপনে চলে যায় এবং কর্মবিরতি ঘোষণা করে। রাজধানীর সব থানা এখন পুলিশ শূন্য। এছাড়া রাজধানীর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেও নেই কোন পুলিশ। এমন অবস্থায় রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও যানজট নিরসনে কাজ করছেন তারা।

আরও পড়ুন:  নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে সহিংসতা, অর্ধশতাধিক গ্রেপ্তার

গতকাল (৭ আগস্ট) রাজধানীর পল্টন, কাকরাইল, মৌচাক, ফার্মগেট, শান্তিনগর, মালিবাগ আবুল হোটেল, রামপুরার, যাত্রাবাড়ি এসব এলাকার সড়কগুলোতে শিক্ষার্থীরা ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। তাদের পাশাপাশি অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনের প্রতিনিধিও রাজধানী জুড়ে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজধানীর মৌচাক মোড়ে কথা হয় আবুজার গিফারী কলেজের মাস্টার্স-এর শিক্ষার্থী আফরোজা আক্তার স্মৃতির সঙ্গে। তিনি বলেন, মৌচাক অন্যতম জনবহুল এরিয়া। এখানে যানজট লেগেই থাকে। এখন ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা কলেজের দ‘ুজন এখানে আছি, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত থাকবো। এরপর অন্যরা আসবে। আমার সঙ্গে এখানে আশপাশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন।

মালিবাগ মোড়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রয়েছেন আনসার সদস্য মোস্তফা। তিনি জানান, আমরা সকাল থেকে আছি। এরপর শিক্ষার্থীরা এসে আমাদের সহযোগিতা করছেন। তারা অনেকে বাঁশি ও পতাকা নিয়ে এসেছেন সিগন্যাল দেওয়ার জন্য। দেশের জন্য তারা সত্যি খুব ভাল কাজ করছেন। আমাদের সবারই তাদের কাছ থেকে এই ভাল কাজ করার শিক্ষা নেওয়া উচিত।

আবুল হোটেল মোড়ে কথা হয়, ফয়জুর রহমান আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষার্থী আদনানের সঙ্গে। তিনি জানান, স্কুল থেকে কয়েকজন বন্ধু মিলে এসেছি। আমরা চাই পুলিশের অনুপস্থিতিতে রাস্তায় যেন মানুষের কোনো ভোগান্তি না হয়। দেশকে এখন গোছানোর পালা। যেহেতু এখনো কোনো সরকার গঠন হয়নি, এই মুহূর্তে পুলিশ বা ট্রাফিক পুলিশও নেই। তাই রাস্তায় যাতে যান চলাচলে সমস্যা না হয় তাই আমরা শিক্ষার্থীরা ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের আশ-পাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করছি। আমরা সবাইকে অনুরোধ করব সবাই যেন ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলে।

সারওয়ার আহমেদ নামের এক পথচারী বলেন, শিক্ষার্থীরা দেখিয়ে দিয়েছেন, তাদের কত ক্ষমতা। তারা দেশটা এক প্রকার স্বাধীন করে দিয়েছে। আমি তাদের এই ভূমিকা নেওয়ার জন্য সাধুবাদ জানাই। সেই সাথে তারা মানুষের পাশে যেভাবে দাঁড়িয়েছেন সেটাও খুব প্রশংসনীয়। আমাদের বড়দেরও তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন:  পদ্মা সেতু প্রকল্পের খরচ কমলো ১৮২৫ কোটি টাকা

পুলিশের অনুপস্থিতিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে শিক্ষার্থীদের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করায় সড়কে যানবাহন চলাচল অনেকটাই গতি ও স্বস্তি ফেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে। তাদের এই সেবামূলক কাজ সব মানুষের কাছেই প্রশংসিত হচ্ছে।

ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা সড়ক ও আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাগুলো পরিষ্কার করছেন। শিক্ষার্থীদের এই ভূমিকায় সাধারণ মানুষ প্রশংসা করছেন। পথচারীরা তাদের বাহবা দিচ্ছেন। দেশব্যাপী ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতিতে তরুণ শিক্ষার্থীরা সারাদেশে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় অন্যন্য নজির সৃষ্টি করেছে বলে যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে।

উত্তরা থেকে আমাদের সংবাদদাতা মাসুদ পারভেজ জানান, উত্তরা বিমানবন্দর মহাসড়কে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে শিক্ষার্থীরা। সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা ময়মনসিংহ বিমানবন্দর মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি না থাকায় উত্তরা আব্দুল্লাহপুর, হাউজ বিল্ডিং, জসিমউদদীন, জমজম টাওয়ার, বিমানবন্দর চৌরাস্তা এলাকায় যানচলাচলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সড়কের বিশৃঙ্খলা এড়াতে এসময় ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে নামেন উত্তরা ইউনিভার্সিটি, নর্দান ইউনিভার্সিটি, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, এপিবিএন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজসহ উত্তরার বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরা।

এসময় তাদের পাশাপাশি স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও সড়কের ময়লা আবর্জনা পরিস্কার ও ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করেন। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও উত্তরার বিভিন্ন সড়কে পড়ে থাকা ইট পাথরের টুকরা, বাঁশ কাঠের টুকরা, গাছের ঢাল-পালাসহ ময়লার স্তুপ পরিস্কার করতেও দেখা যায়।

 

…….ডিডিজে নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen + twenty =