যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান দিয়েগো শহরের ক্লেইরমন্ট এলাকায় একটি মসজিদে দুই কিশোর বন্দুকধারীর নৃশংস হামলায় তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। বর্বরোচিত এই তাণ্ডব চালানোর পর হামলাকারী দুই কিশোর নিজেরাও গুলিতে আত্মঘাতী হয়েছে। স্থানীয় সময় সোমবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, সন্দেহভাজন হামলাকারীদের একজনের বয়স ১৭ এবং অন্যজনের ১৯ বছর। যে স্থানে এই হামলা হয়েছে, সেটি সান দিয়েগো কাউন্টির সবচেয়ে বড় মসজিদ ও গুরুত্বপূর্ণ একটি ইসলামিক সেন্টার।
মসজিদ চত্বরের ভেতরেই ‘আল রশিদ স্কুল’ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। হামলার সময় মসজিদের ভেতর শিশুরা নিয়মিত ক্লাসে ব্যস্ত ছিল। বিবিসি ও সিবিএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার পর পুলিশ যখন এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে নেয়, তখন প্রাণভয়ে শিশুরা একে অপরের হাত ধরে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছিল। জননিরাপত্তার স্বার্থে সে সময় পার্শ্ববর্তী সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিকভাবে লকডাউন করে দেওয়া হয়। পুলিশ এই হামলাকে একটি ‘বিদ্বেষমূলক অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করে তদন্ত শুরু করেছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাড়ি থেকে অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে যাওয়া এক কিশোরের খোঁজে তল্লাশি চলার সময়ই এই হামলার খবর আসে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনজনের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে। এর কিছুক্ষণ পরই খবর পাওয়া যায় যে, কাছেই এক মালির ওপর গুলি চালানো হয়েছে। পরে মসজিদ থেকে সামান্য দূরত্বে একটি গাড়ির ভেতর থেকে ১৭ ও ১৮ বছর বয়সী দুই হামলাকারীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। তারা দুজনেই সামরিক ছদ্মবেশী পোশাক পরিহিত ছিল এবং নিজেদের গুলিতে আত্মহত্যা করেছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
নিহতদের মধ্যে মসজিদের একজন নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন, যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে হামলাকারীদের রুখে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর এই সাহসী প্রতিরোধের কারণে আরও বড় ধরণের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। সান দিয়েগোর পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াহল এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘তার এই পদক্ষেপ বীরত্বপূর্ণ। নিঃসন্দেহে তিনি আজ অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন।’ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হামলার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে এক হামলাকারীর মা পুলিশকে জানিয়েছিলেন যে তাঁর ছেলে এবং আরেকজন বন্ধু অস্ত্রসহ সামরিক পোশাকে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে। ওই তরুণ বাড়িতে একটি চিরকুট রেখে যায়, যাতে উগ্র ও চরম বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা লেখা ছিল। যদিও এতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা স্থাপনার নাম উল্লেখ ছিল না, তবে সান দিয়েগোর প্রধান মসজিদকে লক্ষ্যবস্তু করায় এটিকে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হামলা বলেই মনে করা হচ্ছে। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সেমি-অটোমেটিক অস্ত্র থেকে অন্তত ৩০ রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা গেছে।
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিযোগোর পরিচালক ইমাম ত্বহা হাসান বলেন, ‘কোনো উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত জঘন্য ও আপত্তিকর। এই স্থাপনাটি একটি উপাসনালয়, কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়।’ ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য সহ্য করবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘটনাকে ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘আমি প্রাথমিক কিছু তথ্য পেয়েছি। আমরা এই বিষয়টি খুব জোরালোভাবে খতিয়ে দেখব।’ এই মর্মান্তিক ঘটনায় স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটিতে শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।







