ইরান যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন সিনেটে প্রস্তাব পাস

সামরিক হামলা চালানো থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিরত রাখতে মার্কিন সিনেটে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় তিন মাস পর ডেমোক্র্যাটদের আনা এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন চারজন রিপাবলিকান সিনেটরও।

সিনেটে অনুষ্ঠিত ৫০-৪৭ ভোটের এই ফলাফলকে ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবটির পক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সাথে যোগ দেন রিপাবলিকান সিনেটর র‍্যান্ড পল, সুসান কলিন্স, লিসা মুরকোস্কি এবং বিল ক্যাসিডি। তবে ডেমোক্র্যাট দলের জন ফেটারম্যান এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। এটি ট্রাম্পকে এমন একটি যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করার প্রথম পদক্ষেপ, যার জন্য তিনি কখনোই কংগ্রেসের অনুমতি নেননি।

রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি বলেন, ‘তিনি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের সমর্থক হলেও হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগন যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসকে অন্ধকারে রেখেছে।’ তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘লুইজিয়ানার মানুষ, এমনকি ট্রাম্পের সমর্থকরাও এই যুদ্ধ নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রশাসন স্পষ্ট তথ্য না দেওয়া পর্যন্ত কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন বা যুদ্ধের মেয়াদ বৃদ্ধি সমর্থন করা যায় না।’

সিনেটের মাইনোরিটি লিডার চার্লস ই শুমার ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘এই প্রেসিডেন্ট একজন শিশুর মতো, যে কি না একটি লোড করা বন্দুক নিয়ে খেলছে। ইরান থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাব সমর্থনের এটাই উপযুক্ত সময়।’

১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ার রেজ্যুলেশন’ অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া কোনো সংঘাত শুরু করলে ৬০ দিনের মধ্যে সেখান থেকে মার্কিন বাহিনীকে সরিয়ে নিতে হয়। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে গত ১ মে এই সময়সীমা পার হয়ে গেছে। তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘শত্রুতা বন্ধ হয়েছে’, যদিও ইরানের ওপর এখনো মার্কিন নৌ-অবরোধ বলবৎ রয়েছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিম কেইন বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির এই সময়টিই যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্কের সঠিক সময়।’

আরও পড়ুন:  অদক্ষ ব্যক্তিদের হাতে রাষ্ট্র পড়লে জনগণের অনেক ভোগান্তি হয়: স্পিকার

জরিপ বলছে, এই যুদ্ধ আমেরিকানদের কাছে অত্যন্ত অজনপ্রিয়। ‘নিউইয়র্ক টাইমস-সিয়েনা’র সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৬৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার মনে করেন যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল, যেখানে মাত্র ৩০ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন।

তবে এই প্রস্তাবটি আইনে পরিণত হতে আরও বেশ কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হবে। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে এটি পাস হতে হবে এবং ট্রাম্প নিশ্চিতভাবেই এতে ‘ভেটো’ দেবেন। সেই ভেটো কাটাতে হলে দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, যা অত্যন্ত কঠিন।

সিনেটর টিম কেইন মনে করেন, প্রতিটি ভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের কাছে এই বার্তা পৌঁছাবে যে, আমেরিকান জনগণ এই যুদ্ধ পছন্দ করছে না। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট তার জনপ্রিয়তার বিষয়ে পৃথিবীতে অন্য সবার চেয়ে বেশি সচেতন—আর এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

ট্রাম্প-ভ্যান্সের ইতিবাচক বার্তা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ইতিবাচক মন্তব্যের পরপরই বুধবার দুটি তেলবাহী চীনা ট্যাংকার সফলভাবে হরমুজ প্রণালী পার হয়েছে। জাহাজ চলাচলের তথ্য (শিপিং ডেটা) বিশ্লেষণে এই চিত্র দেখা গেছে।

আরও পড়ুন:  ঢাকায় নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন, সিনেটে অনুমোদন

ট্রাম্প বলেছিলেন, এই যুদ্ধ ‘খুব দ্রুতই’ শেষ হয়ে যাবে। একই সাথে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও তেহরানের সঙ্গে চলমান আলোচনার অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে শান্তি চুক্তির জোরালো সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছেন। হোয়াইট হাউসের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা বর্তমানে বেশ ভালো অবস্থানে আছি।’

সংঘাত নিরসনে তেহরান নতুন একটি প্রস্তাব দেওয়ার পর ট্রাম্প গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজই (হামলার) হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার খুব কাছাকাছি ছিলাম আমি, বড়জোর এক ঘণ্টা বাকি ছিল।’

তিনি দাবি করেন, ইরানের নেতারা একটি চুক্তির জন্য অনুনয়-বিনয় করছেন। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব না হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন করে হামলা চালানো হবে।’

প্রায় তিন মাস আগে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে শুরু করা এই যুদ্ধ শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এই পুরো সময়জুড়ে ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে। আবার চুক্তিতে রাজি না হলে বড় ধরনের হামলার হুমকিও দিয়ে গেছেন।

আগামী নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে তেলের উচ্চমূল্য এবং জনপ্রিয়তায় ধস নামায় ট্রাম্পের ওপর দ্রুত এই সংকটের সমাধান করার জন্য প্রচণ্ড ঘরোয়া রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। এই সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

আরও পড়ুন:  ৫৪০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা পেন্টাগনের

শিপিং ডেটা অনুযায়ী, ইরাকি অপরিশোধিত তেল বহনকারী সুপার ট্যাংকারগুলোর মধ্যে চীনের এই দুটি জাহাজ বুধবার সংকীর্ণ ওই প্রণালী পার হয়েছে। এতে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল রয়েছে। হোয়াইট হাউস থেকে আসা এসব ইতিবাচক সংকেতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের (অপরিশোধিত তেল) দাম এক পর্যায়ে ব্যারেল প্রতি ১১০.১৬ ডলারে নেমে আসে।

জেডি ভ্যান্স অবশ্য ইরানের বিভক্ত নেতৃত্বের সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘তেহরানের আলোচক দলের অবস্থান সবসময় পুরোপুরি পরিষ্কার থাকে না।’ তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের নিজস্ব অবস্থান বা শর্তগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ট্রাম্পের এই নীতির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো ওই অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধ করা।

অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ট্রাম্প হামলা স্থগিত করেছেন কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, ইরানের ওপর আক্রমণ করলে তার ‘কড়া সামরিক জবাব’ দেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *