আন্দামানে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ বহু বাংলাদেশি

আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় বহু বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। গত ৮ এপ্রিল ওই দুর্ঘটনায় সব মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা অন্তত ২৬৪ জন। এর মধ্যে শতাধিক বাংলাদেশি রয়েছেন। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে ৬২ জন বাংলাদেশি নাগরিকের নাম-ঠিকানা জানা গেছে।

জানা গেছে, কক্সবাজার থেকে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলার গত ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ডুবে যায়। প্রায় ৩৬ ঘণ্টা ভেসে থাকার পর ৯ জনকে উদ্ধার করে একটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ। তারপর তাদের সেন্ট মার্টিনে কোস্ট গার্ডের জাহাজ মনসুর আলীতে হস্তান্তর করা হয়।

উদ্ধার ৯ জনের মধ্যে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ছয়জন মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য বলে স্বীকার করেন।

তাদের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মানবপাচার আইনের বিভিন্ন ধারায় একটি মামলা করে কোস্ট গার্ড। বর্তমানে এই ছয়জন কক্সবাজার জেলা কারাগারে আছেন।উদ্ধার বাকি তিনজন রোহিঙ্গা নাগরিক। তাদের সঙ্গে কথা বলে ট্রলারডুবির বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে।

নিখোঁজদের মধ্যে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা নাগরিক। তারা উখিয়ার বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত ছিলেন। তবে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে এ ট্রলারডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিখোঁজ ৬২ বাংলাদেশির পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে টেকনাফেরই ৪০ জন। এ ছাড়া উখিয়ার ছয়জন, রামুর চারজন, পেকুয়ার সাতজন এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পাঁচজন রয়েছেন।

এদের ঘরে ঘরে চলছে মাতম। স্বজনের ফেরার অপেক্ষায় কাঁদছেন মা-বাবা, আত্মীয়রা। নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে তারা ছুটছেন থানা, জনপ্রতিনিধির দ্বারে দ্বারে। অনেকেই নিশ্চিত, ডুবে যাওয়া ওই ট্রলারেই ছিলেন তাদের প্রিয়জন। কিন্তু তারা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন–সেই প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছেন না কারো কাছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, গত ১ থেকে ৫ এপ্রিলের মধ্যে টেকনাফ উপকূল থেকে অন্তত তিনটি যাত্রীবাহী ট্রলার মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। এর মধ্যে একটি ট্রলার গত ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ডুবে গেলেও দুটি মঙ্গলবার থাইল্যান্ডে পৌঁছেছে। তবে ডুবে যাওয়া ট্রলারে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি শতাধিক বাংলাদেশি রয়েছে। তাদের বেশির ভাগই কিশোর।

আরও পড়ুন:  ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘সেনিয়ার’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ এলাকার ৩০ জনেরও বেশি যুবক এখনও নিখোঁজ। তারা সবাই দালালের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

নিখোঁজ ৬২ বাংলাদেশির তালিকা

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে টেকনাফের ৪০ জন নিখোঁজের তথ্য পাওয়া গেছে। তারা হলেন সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ উত্তর পাড়ার জাফর আহমেদের ছেলে হারুন রশিদ, একই গ্রামের মো. হোসেনের ছেলে মো. ওসমান, নুরুল আলমের ছেলে মো. হাসান, শাহপরীর দ্বীপ মিস্ত্রী পাড়ার হামিদ হোসেনের ছেলে আব্দুল হান্নান, আবুল কাশেমের ছেলে মো. আবসার, শাহপরীর দ্বীপ দক্ষিণ পাড়ার মছন আলীর ছেলে মো. ফরিদ, সালামত উল্লাহর ছেলে মো. হোসাইন, আব্দুর রহিম মিস্ত্রীর ছেলে মো. জয়নাল উদ্দিন, শাহপরীর দ্বীপ বাজার পাড়ার মৌলিক হোসেন আহমদের ছেলে মো. হাউস, জাহেদ হোসেনের ছেলে জিয়াউর রহমান, শাহপরীর দ্বীপ মাঝের পাড়ার বাদলের ছেলে মো. তারেক, মৃত হাফিজ উল্লাহর ছেলে শাহাব উদ্দিন, শাহপরীর দ্বীপ উত্তর পাড়ার করিম উল্লাহর ছেলে কালাইয়া, শাহপরীর দ্বীপ দক্ষিণ পাড়ার আবুল বশরের ছেলে মো. হাসান, শাহপরীর দ্বীপ কোনার পাড়ার জহির আহমদের ছেলে কালু মিয়া, শাহপরীর দ্বীপ ডেইল পাড়ার একরামের ছেলে মো. আনিস, কোনার পাড়ার কবির আহমদের ছেলে রিদওয়ান করিম, মো. ইসমাইলের ছেলে মো. ইউসুফ, সাবরাং নয়াপাড়ার আব্দুস সালামের ছেলে নুরুল ইসলাম, সাবরাং মণ্ডল পাড়ার মিজানুর রহমানের ছেলে শেফায়েত হোসেন, সাবরাং মুন্ডার ডেইল এলাকার নুরুল আলমের ছেলে মো. তারেক, সাবরাং সিকদার পাড়ার মদিনা খাতুনের ছেলে মো. সাদেক, নবী হোসেনের ছেলে নূর হোসেন, আমির হোসেনের ছেলে মো. সেলিম, মকবুল আহমেদের ছেলে মো. হারেস, মুন্ডার ডেইল এলাকার কবির আহমদের ছেলে রবিউল করিম, কাটাবুনিয়া এলাকার ছৈয়দ উল্লাহর ছেলে এনায়েত উল্লাহ, কুরাইজ্যা পাড়ার আহমদ আলীর ছেলে নুরুল আবসার, মো. আলমের ছেলে ছৈয়দ হোছাইন।

আরও পড়ুন:  একদিকে দাবানল, আরেকদিকে তুষারপাত; লণ্ডভণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের জনজীবন

এ ছাড়া টেকনাফ সদর ইউনিয়নের উত্তর লেঙ্গুরবিলের মৃত শাহেদ মিয়ার ছেলে মো. বেলাল, মো. এশিয়াশের ছেলে মো. আনোয়ার, মৌলভী পাড়ার ঈমান হোসেনের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম, বড় হাবিব পাড়ার দিদার হোসেনের ছেলে মো. শফিক, বাহারছড়া ইউনিয়নের চৌকিদার পাড়ার মো. ইউসুফের ছেলে মো. রিদওয়ান, বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া এলাকার মুহাম্মদ উল্লাহর ছেলে জিয়াউল হক, বড় ডেইল এলাকার মো. আমিনের ছেলে মো. ওসমান, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লাতুরী খোলা এলাকার কালুর ছেলে মো. এনায়েত রহমান, আব্দুর রহমানের ছেলে মো. তারেক এবং জিয়াউর রহমানের দুই ছেলে মো. জুনায়েদ ও তারেকুর রহমান।

উখিয়ার নিখোঁজরা হলেন ইনানীর জাগির হোসেনের ছেলে আলী উদ্দিন, জালিয়া পালং ইউনিয়নের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে মো. আলী, ইনানীর মাদারবনিয়ার মো. ছিদ্দিকের ছেলে মো. নাছির উদ্দিন, জালিয়া পালং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ছৈয়দ আলমের ছেলে মো. তারেক, হরিণমারা এলাকার মো. গিয়াস উদ্দিনের ছেলে মো. আলী এবং একই এলাকার আব্দুল মতলবের ছেলে ইমরান হোসেন বাপ্পী।

রামুর নিখোঁজরা হলেন কচ্ছপিয়া এলাকার মোজাম্মেল হকের ছেলে মো. মিজবাহ উদ্দিন, একই গ্রামের মো. আইয়ুবের ছেলে মো. মোর্শেদ, নুরুল ইসলামের ছেলে আব্দুল হামিদ এবং মো. ইলিয়াসের ছেলে হাবিব উল্লাহ।

পেকুয়ার নিখোঁজরা হলেন রাজাখালী ইউনিয়নের মিয়াপাড়ার আবদুর রহিমের ছেলে মো. বেলাল (২০), একই গ্রামের আবদুল মালেকের ছেলে মো. রহিম (২০), হাজিরপাড়ার শহিদুল ইসলামের ছেলে মো. সোহেল (২১), আহমদ ছবির ছেলে মো. এহেসান (১৯), নুরুল আমিনের ছেলে রাশেদুল ইসলাম (১৯), নতুন ঘোনার বাদশা মিয়ার ছেলে রহুল কাদের (২২) এবং শহিদুল্লাহর ছেলে মানিক (২৪)।

আরও পড়ুন:  ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ভাঙা বাড়িতে যে যা পাচ্ছেন নিয়ে যাচ্ছেন

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর নিখোঁজরা হলেন পুঁইছড়ি ইউনিয়নের পূর্ব পুঁইছড়ি গ্রামের নজির আহমদ সওদাগরের ছেলে মো. রুবেল, আব্দুর রহমানের ছেলে মো. ওসমান গনি, জাফর আলমের ছেলে বেলাল উদ্দিন, তৈয়ব দুলালের ছেলে মো. আজিজ এবং মকছুদ আলমের ছেলে জামাল উদ্দিন।

ভয়ংকর সমুদ্রযাত্রা বাড়ছেই :

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করে জানা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়াগামী অন্তত ৩ হাজার ১৩৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে বড় অংশই রোহিঙ্গা।

সংস্থাটি আরো জানায়, ২০২৫ সালে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশ ও মায়ানমার থেকে বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা শুরু করে, যাদের মধ্যে ৮৯০ জনেরও বেশি প্রাণ হারায়। বিশেষ করে আন্দামান সাগর এবং বঙ্গোপসাগরে ২০২৪ সালে ৫৯৮ জন ও ২০২৫ সালে ৮৬০ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য এ পরিসংখ্যানে বাংলাদেশি নিখোঁজের তথ্য সংযুক্ত করা হয়নি।

অন্যদিকে, ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত মিয়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ৯০৭ জন সমুদ্রপথে দেশ ছেড়েছেন, যেখানে ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫১৭ জন।

অর্থসংকটে জর্জরিত জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এই মাসে বাংলাদেশে থাকা ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের জন্য সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে ভয়াবহ সমুদ্রযাত্রায় ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *