ইরান আক্রমণে ট্রাম্পকে চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন সৌদি যুবরাজ

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা ও দেশটির ইসলামি শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হামলার জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে চাপ দিয়ে যাচ্ছিল সৌদি আরব। গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক সামরিক হামলা চালায়। হামলায় নিহত হয়েছেন প্রায় ৪ দশক ধরে ইরানের ক্ষমতায় থাকা দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। হামলার নেপথ্যে ছিল দুই আঞ্চলিক মিত্র ইসরায়েল ও সৌদি আরবের জোরালো তদবির।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন তথ্য। 

হামলার নীতিনির্ধারণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত চারটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের দুই মিত্র—ইসরায়েল ও সৌদি আরবের কয়েক সপ্তাহের লবিংয়ের পর শনিবার হামলার সিদ্ধান্ত আসে।ওই চারজন ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত এক মাসে ট্রাম্পকে একাধিকবার ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে হামলা চালানোর কথা বলেন। তবে মুখে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলে আসছিলেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর আগে থেকেই ইরানকে তার দেশের ‘অস্তিত্বের হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রকে হামলার জন্য প্ররোচনা দিয়ে আসছিলেন।দুজনের যৌথ প্রচেষ্টায় ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন ট্রাম্প। হামলার প্রথম দিকেই খামেনিসহ দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন, আগামী এক দশকেও ইরানি বাহিনী মার্কিন মূল ভূখণ্ডের জন্য তেমন কোনো হুমকি নয়।

এরপরও হামলা চালানো হয় ইরানে। এটি ট্রাম্পের আগের সামরিক সিদ্ধান্তের তুলনায় একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।ইরানজুড়ে হামলার সময় একটি ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি আজ রাতে যা করতে চাচ্ছি, কোনো প্রেসিডেন্টই তা করতে রাজি ছিলেন না। এখন এমন একজন প্রেসিডেন্ট আছেন যিনি আপনারা যা চান তা করছেন। দেখা যাক আপনারা এতে কেমন সাড়া দেন।

আরও পড়ুন:  গাজাবাসীর কান্না স্বর্গে পৌঁছে যাচ্ছে: পোপ লিও

অর্থাৎ, ট্রাম্প অন্য কোনো দেশের শাসক উৎখাতের চেষ্টায় হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অথচ, এর একদিন আগেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দেশটির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

আলোচনা চলাকালে সৌদি আরব একটি বিবৃতি জারি করে। সেখানে বলা হয়, সৌদি যুবরাজ ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে ফোনালাপ হয়। যুবরাজ সালমান ইরানের ওপর কোনো হামলায় সৌদির আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না।

অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রগুলো জানায়, জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় সৌদি যুবরাজ সতর্ক করে বলেন, ইরাকে ২০০৩ সালের আগ্রাসনের পর মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলার এই সময়েও যদি যুক্তরাষ্ট্র আঘাত না করে, তবে ইরান আরো শক্তিশালী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।

মুহাম্মদ বিন সালমানের এই অবস্থানকে তার ভাই সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খালিদ বিন সালমানও সমর্থন করেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে হামলা না করার নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে সতর্ক করেন খালিদ।

ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, সৌদি নেতার এই দ্বৈত আচরণ হয়ত তার দেশের জ্বালানি তেল অবকাঠামো রক্ষা এবং তেহরানকে রিয়াদের ‘চরম শত্রু’ হিসেবে দেখার মধ্যকার একটি মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে হয়েছে। শিয়া প্রধান ইরান এবং সুন্নি নেতৃত্বাধীন সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক প্রক্সি যুদ্ধ হয়েছে।

শনিবার মার্কিন হামলা শুরুর পর ইরান সৌদি আরবের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়। রিয়াদ ক্ষুব্ধ হয়ে বিবৃতিতে হামলার নিন্দা জানায় এবং ইরানকে মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার’ আহ্বান জানায়।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

উইটকফ ও কুশনার গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে শেষ বৈঠক করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, তেহরান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘খেলছে’—এমন ধারণা নিয়ে বৈঠক শেষ হয়।

আরও পড়ুন:  ভারতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পদদলিত হয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১২০

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি খুব স্পষ্ট যে তাদের (ইরানের) উদ্দেশ্য ছিল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়া যেন একসময় তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজে ব্যবহার করতে পারে।’

শুক্রবার বিকেলে ট্রাম্প টেক্সাসে একটি সভায় অংশ নেন। সেখানে তিনি বারবার ঘোষণা করেন, আলোচনার বিষয়ে তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের ওপর খুশি নন। তিনি বলেন, ‘আমার এখন অনেক কিছু করার আছে। আমাদের একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আপনারা তা জানেন, যা সহজ নয়, মোটেও সহজ নয়।’

পরে তিনি ফ্লোরিডায় পাম বিচে ফিরে যান এবং শুক্রবার সন্ধ্যায় মার-এ-লাগো রিসোর্টে সমর্থকদের সঙ্গে সময় কাটান। সেখানে উপস্থিত ছিল এমন একজন জানান, ট্রাম্পকে সেসময় ক্লান্ত দেখালেও তার মেজাজ ভালো ছিল এবং পরে তিনি ব্যক্তিগত কক্ষে গিয়ে হামলার ঘোষণার বক্তব্য রেকর্ড করেন।

গত দুই মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপক আকারে মার্কিন বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমেই এই আক্রমণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের অতীত রেকর্ড দেখে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না যে, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন।

এ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ট্রাম্প শনিবার ভিডিও বার্তায় ১৯৭৯ সালের ইরানের বিপ্লবের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি এই হামলাকে ইরানের সঙ্গে কয়েক দশকের সংঘাতের ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখলের পর ৫২ মার্কিন নাগরিককে এক বছরের বেশি সময় জিম্মি করে রাখা, ১৯৮৩ সালে বৈরুতে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বোমা হামলায় ২৪১ জন মার্কিন সেনার মৃত্যু এবং ২০০০ সালে ইয়েমেনে হামলার কথা উল্লেখ করেন ট্রাম্প। যদিও ইয়েমেনে আত্মঘাতী হামলার পেছনে এতদিন আল-কায়েদাকে দায়ী করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র।

আরও পড়ুন:  এক মিনিটের মধ্যে খামেনিসহ ৩০ নেতা নিহত হন: ইসরায়েলি গণমাধ্যম

ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানি শাসকদের’ কাছ থেকে হুমকি আসছে। তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে যা দ্রুতই আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পারে। অথচ, গতবছর বিমান হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘নির্মূল’ করেছে বলে জানিয়েছিলেন ট্রাম্প।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, ওই হামলার পর ইরান নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করেছে কি না, এমন কোনো প্রমাণ নেই। ট্রাম্প সরকার ইরানিদের দেশের ক্ষমতা ‘দখল’ করার আহ্বান জানান বক্তৃতায়। তিনি এমন ঘোষণাও দেন যে, ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা অবকাঠামোর ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের ‘সম্পূর্ণ দায়মুক্তি’ দেওয়া হবে।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘শুধু আকাশপথে হামলা করে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তন এবং পুনর্গঠন ইতিহাসে খুব একটা হয়নি।’ এটাকে ‘ট্রাম্পীয়’ বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন ‘এটা জুয়া খেলার মতো।’

২০০৩ সালে ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করার পরিকল্পনায় হাজার হাজার মার্কিন সৈনাকে পাঠানো হয়, যারা সেখানে প্রায় এক দশক অবস্থান করে। নতুন সরকার গঠনের জন্য বেসামরিক মার্কিন কর্মকর্তারা কাজ করে। ইরাক অভিযানের তীব্র সমালোচকদের কেউ কেউ ট্রাম্প প্রশাসনেও আছেন। তাদের মতে, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হবে।

আপাতত ট্রাম্প বলছেন, তিনি আশা করেন খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ শান্তিপূর্ণভাবে ইরানি ‘দেশপ্রেমিকদের’ সঙ্গে কাজ করবে এবং দেশটির পুরোনো গৌরব ফিরিয়ে আনবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *