বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল

একসময় নাট্যমঞ্চে উঠতেন তিনি। করতেন অভিনয়, যুক্ত ছিলেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। ছাত্রজীবনে রাজনীতির উত্তাল স্রোতেও ছিলেন সক্রিয়। এরপর শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, দলের মুখপাত্র এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিব। জীবনের প্রতিটি বাঁক পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন দাঁড়িয়ে আছেন আরও বড় এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সামনে।

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা থাকলেও রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।

নাট্যমঞ্চ থেকে রাজনীতির মঞ্চ
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের গল্প শুধু দলীয় পদ-পদবি কিংবা নির্বাচনি রাজনীতির গল্প নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চা, শিক্ষকতা এবং ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা।

ছাত্রজীবনেই তিনি নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নাট্যমঞ্চে অভিনয় করেছেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। সেই সময়ের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তার ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে। পরে রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায়ও তার মধ্যে সংস্কৃতিমনস্কতার ছাপ থেকে যায়।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী ও একাধিকবারের সংসদ সদস্য। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি শৈশব-কৈশোর থেকেই সমাজ ও সংস্কৃতির নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান তিনি।

আরও পড়ুন:  বিজয় দিবসে এবারও প্যারেড হবে না: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন মির্জা ফখরুল। সেখান থেকে অর্জন করেন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি।

ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময়ে সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

একদিকে নাট্যমঞ্চ, অন্যদিকে রাজনীতির উত্তাল রাজপথ—দুই ভিন্ন জগতের অভিজ্ঞতা নিয়ে গড়ে উঠতে থাকেন তরুণ মির্জা ফখরুল।

শিক্ষকতা থেকে সক্রিয় রাজনীতি
শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। ঢাকা কলেজসহ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন মির্জা ফখরুল

১৯৮৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগ দেন তিনি।

পরাজয় পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হলেও থেমে যাননি মির্জা ফখরুল। ধারাবাহিকভাবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আরও পড়ুন:  বসন্ত এসে গেছে

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটি হারালেও জাতীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা থেমে থাকেনি। ২০০৯ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর দলটির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে রাজপথ ও গণমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দলকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।

অবশেষে ২০১৬ সালের জাতীয় সম্মেলনে বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে দলের অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারক ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শপথ গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন তিনি।

বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর এবার বর্ষীয়ান এ রাজনীতিকের সামনে এসেছে নতুন সম্ভাবনা। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনীত করেছে বিএনপি।

একজন নাট্যকর্মী হিসেবে মঞ্চে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ছাত্ররাজনীতির উত্তাল সময়, শিক্ষকতার শ্রেণিকক্ষ, পৌরসভার দায়িত্ব, জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং বিরোধী দলের রাজপথ—জীবনের নানা অভিজ্ঞতা পেরিয়ে তিনি আজ দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পথে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন।

আরও পড়ুন:  পবিত্র হজ ৫ জুন

ব্যক্তিজীবনে রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ মির্জা ফখরুলের দুই কন্যাসন্তান। তারা উচ্চশিক্ষিত এবং শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত।

তার পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যও উল্লেখযোগ্য। এক চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন সাবেক স্পিকার ও আইনমন্ত্রী। অন্য চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ছিলেন মুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

এবার নতুন অধ্যায়ের হাতছানি
যে মানুষটি একদিন নাট্যমঞ্চে অভিনয় করেছিলেন, পরে শিক্ষক হিসেবে তরুণ প্রজন্মকে পাঠ দিয়েছেন, রাজনীতির মাঠে আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দীর্ঘদিন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের মহাসচিবের দায়িত্ব সামলেছেন—সেই মির্জা ফখরুল এখন বঙ্গভবনের সর্বোচ্চ আসনের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায়।

নাট্যমঞ্চ থেকে রাজনীতির মহামঞ্চ—মির্জা ফখরুলের এই দীর্ঘ যাত্রা শেষ পর্যন্ত তাকে কোথায় নিয়ে যায়, তার উত্তর মিলবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

six + 5 =