কারো অপেক্ষা, মনের অস্থিরতা—কেন রাত জাগে তরুণরা?

রাত গভীর। চারপাশ নিস্তব্ধ, ঘুমিয়ে পড়েছে শহর। অথচ জেগে আছে অনেক তরুণ। কারও হাতে স্মার্টফোন, কেউ আবার অপেক্ষায়—হয়তো একটি মেসেজের, একটি ফোনকলের। আবার কারো ঘুম কেড়ে নিচ্ছে মনের অস্থিরতা। কেন রাত হলেই তরুণদের মনে ভিড় করে এত কথা, এত আবেগ ?
সকাল থেকে রাত—পড়াশোনা, অফিস, কাজ আর নানা দায়িত্বে ব্যস্ত থাকে তরুণরা।
দিনের ব্যস্ততায় নিজের জন্য সময়টুকুই যেন হারিয়ে যায়। তাই রাত নামলে ঘুমকে একটু দূরে সরিয়ে রেখে নিজের মতো করে কিছুটা সময় কাটাতে চান অনেকে।মনোবিজ্ঞানে সারাদিনের হারানো সময় ফিরে পেতে ইচ্ছা করে ঘুমাতে দেরি করার এই অভ্যাসকে বলা হয় ‘রিভেঞ্জ বেডটাইম প্রোক্রাস্টিনেশন’

রাতের নীরবতায় জেগে ওঠে চাপা আবেগ

দিনের ব্যস্ততায় অনেক চিন্তা ও আবেগ চাপা পড়ে থাকে।

কিন্তু রাতের নীরবতায় বাইরের ব্যস্ততা কমে গেলে সেসব ভাবনা আবার মাথায় ঘুরতে শুরু করে।কারও সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা কিংবা কারও একটি মেসেজের অপেক্ষা—সব মিলিয়ে মনের ভেতর তৈরি হতে পারে অস্থিরতা।মনোবিজ্ঞানে একই চিন্তা বারবার মাথায় ঘুরতে থাকাকে ‘রুমিনেশন’ বলা হয়। গবেষণায় তরুণদের ঘুমের সমস্যা ও বারবার নেতিবাচক চিন্তার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন:  চালু হলো ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

কখনো রাত জাগার কারণ কোনো সিরিজ নয়, কোনো ভিডিওও নয়।

কখনো শুধু একজন মানুষ। তার একটি মেসেজ, একটি ফোনকল কিংবা অনলাইনে আসার অপেক্ষা। দিনের ব্যস্ততায় যে আবেগগুলো চাপা পড়ে থাকে, রাতের নীরবতায় সেগুলোই যেন সবচেয়ে বেশি জেগে ওঠে।

‘আর পাঁচ মিনিট’ থেকেই শুরু

ঘুমানোর আগে ফোন হাতে নেওয়া এখন অনেকের রাতের অভ্যাস। ‘আর পাঁচ মিনিট’—এই ভেবেই শুরু হয় স্ক্রলিং।

ফেসবুক, ইউটিউব শর্টস বা টিকটকে একটার পর একটা ভিডিও দেখতে দেখতে কখন যে রাত গভীর হয়ে যায়, তা অনেকেই টের পান না।

আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের সাবেক সভাপতি ড. জেমস রাওলি বলেন, ঘুমের আগে ফোন ব্যবহার কমানো উচিত। বিশেষ করে মানসিক চাপ তৈরি করে—এমন কনটেন্ট ঘুমকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে।

প্রেম, অপেক্ষা আর রাত জাগার গল্প

দিনের ব্যস্ততায় যে কথাটি বলা হয়নি, রাতে সেটিই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। কেউ পুরোনো মেসেজ পড়েন, কেউ প্রিয় মানুষটির শেষ ‘অনলাইন’ সময়টুকু দেখেন।

আবার কেউ হয়তো জানেন, ওপাশ থেকে আর কোনো মেসেজ আসবে না। তবু অভ্যাসের টানে রাত জেগে ফোন হাতে নেন।

আরও পড়ুন:  বিভ্রাটের পর সচল হচ্ছে ফেসবুক-মেসেঞ্জার, যে তথ্য জানাল মেটা

কখনো ঘুম না আসার কারণ ফোন নয়—মনের ভেতর জমে থাকা কিছু কথা। যে কথাগুলো কাউকে বলা হয়নি, রাতের নীরবতায় সেগুলোই যেন সবচেয়ে বেশি শব্দ করে।

এক পর্ব থেকে রাতভর গল্প

অনলাইন সিরিজও রাত জাগার অন্যতম কারণ। একটি পর্ব শেষ হয়, কিন্তু গল্প শেষ হয় না। পরের পর্বের কৌতূহল মানুষকে আটকে রাখে।

‘আরেকটা পর্ব দেখি’—এই ছোট্ট সিদ্ধান্তই কখনো পুরো রাত কেড়ে নেয়। একে বলা হয় ‘বিঞ্জ ওয়াচিং’

ফোনের আলোতেও পিছিয়ে যায় ঘুম

মোবাইল, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনের আলো ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দে সমস্যা হতে পারে।

ফলে শরীর ক্লান্ত থাকলেও চোখে ঘুম আসে না। ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমানোর আগে ফোনের ব্যবহার কমানো এবং মানসিকভাবে উত্তেজক কনটেন্ট এড়িয়ে চলা ভালো।

তাহলে কি শুধু স্মার্টফোনই দায়ী?

উত্তরটা এত সহজ নয়।

কখনো ফোন, কখনো কাজের চাপ, কখনো মানসিক অস্থিরতা—আবার কখনো কারো জন্য অপেক্ষা। সব মিলিয়েই রাত জাগার অভ্যাস তৈরি হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, কম ঘুমের সঙ্গে উদ্বেগ, বিরক্তি ও মন খারাপের মতো সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে। অর্থাৎ ঘুম কমলে মনের ওপর চাপ বাড়ে, আবার মনের অস্থিরতা বাড়লে ঘুমও আরো দূরে সরে যায়।

আরও পড়ুন:  ইতিহাস বিকৃতি এই দেশের মানুষ কখনো মেনে নেবে না: সোহেল তাজ

ঘুমের কাছে ফিরতে হবে

ঘুম ফেরাতে প্রথমেই রাতের সঙ্গে একটু বন্ধুত্ব করতে হবে। ঘুমানোর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে ফোন ও ল্যাপটপ দূরে রাখার অভ্যাস করা যেতে পারে।

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে ওঠা, রাতে অতিরিক্ত চা-কফি কমানো ও বিছানায় শুয়ে ফোন না চালানোর অভ্যাসও ঘুম ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।

১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মনের কথাগুলোকে সবসময় রাতের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না।

কারণ সব রাত কারো অপেক্ষায় কাটানোর জন্য নয়। কিছু রাত শুধু নিজের জন্যও রাখা দরকার। শরীর আর মন—দুটোই তো একটু বিশ্রাম চায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *