স্বপ্নের শহর ভ্যাংকুভার-কানাডার ডায়েরি- ১০

মোহীত উল আলম
কানাডা ভ্রমণের ওপর আগে ৯টি কিস্তি লিখেছি। এরপর ১৫ দিনের জন্য আমেরিকা ঘুরতে যাওয়ায় কানাডার সিরিজে গ্যাপ পড়েছিল। আমেরিকা ভ্রমণের ওপর ইতিমধ্যে ১০টি কিস্তি লেখা হয়েছে। এখন গত ৫ জুলাই পুনরায় কানাডা ঢুকি। সে জন্য এই লেখাটার ক্রম হলো “কানাডা – ১০”।
ভ্যাঙ্কুভার শহরটা প্রকৃতির দান। যদি এ আই-কে বলে কাপ্তাই শহরটাকে জলমগ্ন একটি রূপসী নগরীর রূপ দান করতে বলতাম, সেটা হতো ভ্যাংকুভার।
ভ্যাংকুভারের সঙ্গে কাপ্তাইএর তুলনা মনে আসার একটা ঐতিহাসিক কারণ আছে। যে ভাগ্নে আর তার পরিবারকে দেখার জন্য ভ্যাংকুভারে ছুটে এসেছি আমি আর খুকু তার নাম ফরিয়াদ বা ফরিয়াদুল ইসলাম। বুয়েট থেকে পাশ করা ফরিয়াদ হলো পেশায় স্থপতি, কিন্তু ভ্যাংকুভারে চাকরি করছে সরকারি রাজস্ব বিভাগে। আমার তৃতীয় আপা মনিরাতুল আলম আর দুলাভাই এজাহার আহমেদ চৌধুরীর বড় ছেলে হলো ফরিয়াদ। দুলাভাই কাপ্তাই জল প্রকল্পে কাজ করতেন, সে হিসেবে ফরিয়াদদের বাল্যকাল কেটেছে কাপ্তাইয়ে।
অতি মেধাবী ছাত্র ফরিয়াদ আমার আম্মার সবচেয়ে কাছের নাতি ছিল। আম্মার শুটকি খাওয়ার সঙ্গী ছিল ফরিয়াদ। নানি-নাতি মিলে শুটকি আর আচার দিয়ে রাত্রিবেলা সবার খাওয়া হয়ে গেলে খেতে বসতো, এটা ছিল আমাদের বাসার পরিচিত দৃশ্য।
ফরিয়াদকে আমার আম্মা নানান কারণে পছন্দ করতেন। তার আরেকটা কারণ হলো নানির প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা। আমার আম্মা দাদী আর নানি হিসেবে প্রচন্ড শাসকপ্রবণ ছিলেন, আর নাতি-নাতনিগুলো তাঁর ইচ্ছার বিপরীতে আচরণ করে মজা পেত। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ফরিয়াদ। সে নানির মন মেজাজ বুঝে চলতো আর ফেভার আদায় করতো। আর আমরা মামারা ফরিয়াদকে পছন্দ করতাম তার সুপার ব্রিলিয়ান্সের জন্য। তার ছিল এনসাক্লোপিডিক নালিজ আর জীবনভোগের স্বাভাবিক স্পৃহা। একবার ফরিয়াদ সপ্তাহখানেকের জন্য হংকং বেড়িয়ে এসে এমন গ্রাফিক্যালি তার ভ্রমণের বর্ণনা করল যে আমরা যেন হংকংএর প্রতিটি স্ট্রিট, প্রতিটি সিগন্যাল বাতিকে সচক্ষে দেখতে পেলাম।
আমার ২০১৮ সালের আমেরিকা ভ্রমণের ওপর রচিত ” আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে সাঁইত্রিশ দিন” গ্রন্থটি যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন সে বইটাতে আমি কিছুটা হয়ত অযৌক্তিকভাবে এই অভিমত রেখেছিলাম যে উন্নত সমাজে বসবাস করা বাইরের দেশের মধ্যম গোছের মেধাসম্পন্ন বা মিডিয়কারদের জন্য ভালো হলেও মেধাবী, প্রতিভবান, সৃজনশীল লোকদের জন্য নিজ দেশেই বাস করা ভালো। কারণ উন্নয়নশীল সমাজের অতি মেধাবী লোকেরা উন্নত সমাজে এসে মিডিয়কারের পরিণত হবার আশংকা থাকে। সেটা ফরিয়াদ বা আমার অপর মেধাবী ভাগ্নে হোসেন তৌহিদুল আলমকে দেখে আবারও মনে হলো। অবশ্য আমি জানি আমার এই মতামত নিতান্তই ঠুনকো, সহজেই যুক্তি দ্বারা খন্ডনীয়। কারণ অনেক বাঙালী সন্তান বিদেশে নিশ্চয় ব্যক্তিগত বা/ও পেশাগত জীবনে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যাদের খবর আমি জানি না। আবার এটাও হতে পারে যে ভিশন যদি ছোট হয় বা বড় হয় সে অনুযায়ী মেধা কার্যকর হয়।
৫ জুলাই ফরিয়াদ আমাদেরকে ভ্যাংকুভার এয়ারপোর্ট থেকে তুলে নিয়ে তার রিচমন্ড এলাকায় নিয়ে আসলো। ভ্যাংকুভারে রাত দশটা। ফরিয়াদের বৌ শেলী চমৎকার চটপটে আর বাকচতুর মেয়ে, কিছুটা প্রগলভতো বটেই। সে দুষ্টামি করে নিজেকে কবি শেলী ডাকে। নানান কবিতা তার মুখস্ত। রান্না করতে করতে সে কবিতা শোনালো, কবিতা শোনাতে শোনাতে রান্না করলো। স্যামন মাছ দিয়ে ডিনার করলাম। ফরিয়াদের মেয়ে তাসমিয়া আর ছেলে জুনায়েদ। সোমত্ত বয়সের। আমি ওদের বিএফ আর জিএফ-এর খবর নিলাম। দুজনেই হেসে বলল, নেই। ফরিয়াদের বাসায় আরও পেলাম ভাগ্নী নাজনীনকে। সে ফরিয়াদদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। আমি আদর করে ডাকি লাজনীন্যে।
পরের দিন, ৬/৭/২৬, সকালে নাস্তা করার পর বের হলাম। ফরিয়াদ নিয়ে গেল উপকূল দেখতে। গ্যারি পয়েন্ট। ভ্যাংকুভারে দুর্দান্ত সামার যাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে খাঁড়ি ঢুকেছে শহরের ভিতরে। এগুলিকে ইনলেট বলে। ইনলেটগুলিকে ঘিরে রেখেছে অবশ্যম্ভাবী পাহাড়। এই পাহাড়ের গায়ে গায়ে চারদিকে উপকূল বরাবর উঁচু বিল্ডিংয়ের সমাহার। এই ইনলেটগুলো আর তাদেরকে ঘিরে নগরায়ন ভ্যাংকুভার নগরীকে পৃথিবীতে প্রথম কয়েকটি সৌন্দর্যমন্ডিত নগরীর অন্যতম করেছে।
বিকেলে বা সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় যখন তখনও সূর্য ডোবে নি, শহরের উপকণ্ঠে একটি পাহাড়ে গেলাম। বার্নাবি মাউন্টেইন। দর্শকদের জন্য ঘোরাফেরার ব্যবস্থা আছে। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপরে সূর্য পাটে নামছে সেটি উপভোগ করা যায়। দূরের সমুদ্রস্নাত দিগন্তের প্রতি আমার চিরদিনের আকর্ষণ। আমার মোবাইল ক্যামেরা সচল। দৃশ্য দেখতে দেখতে একটা তুলনামূলক দীর্ঘশ্বাস বের হবেই। এরা কেন পাহাড়, সমুদ্র, বৃক্ষ, রাস্তাঘাট, এবং নগরায়ন এত ছবির মতো নিপাট রাখতে পারে, আর আমরা কেন পারি না। কেন এমন হবে যে ভ্যাংকুভারের মতো আরও যত সুনির্মিত শহর আছে যেমন মন্ট্রিয়েল, নিউ ইয়র্ক সে সব শহরে যেখানে বাংলাদেশীদের অধিবাস সেখানে এত নোংড়া ঢুকবে! কী হতাশার কথা!
আমাদের সাথে যোগ দিলেন আরও দু’দম্পতি, মোকাররম সাহেব আর সলিম বদ্দা। সলিম বখতেয়ার চৌধুরী। চমৎকার একটা অন দ্য স্পট ডিনার হলো। মোকাররম সাহেবের বাড়ি অন্যত্র হলেও সলিম বদ্দার বাড়ি হাটহাজারীর সরকার হাটে। উনার সঙ্গে ড. ইউনূসের চেহারার অদ্ভুত মিল। কথাবার্তার টোনও একই। পরে বের হলো যে খুকুর দিক থেকে উনি আমাদের আত্মীয়। আবার আমাদের কাজীর দেউড়ির বাসার পাশের বাড়ির আনোয়ার ছফার বৌ ছিলেন তাঁর আপন খালা। সলিম বদ্দা পেশায় রসায়নবিদ, পন্চাশ বছর ধরে আছেন কানাডায়। এমন সপ্রতিভ লোক কম দেখা যায়।
কিন্তু মোকাররম সাহেবের বেলায় একটা দুঃখের কথা শুনলাম। তাঁর বড় ছেলে, যুবক ছেলে, অটোয়ায় হঠাৎ হৃদরোগে মারা যায়। আল্লাহ্ তাঁদেরকে শান্তি দিন।
৭ জুলাই ফরিয়াদ আমাদেরকে একটা স্মরণীয় ভ্রমণ করালো। গেলাম ভ্যাংকুভার আইল্যান্ডে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। ‘বিউটিফুল ব্রিটিশ কলাম্বিয়া’র রাজধানী ভ্যাংকুভার নয়, ভিক্টোরিয়া। ভ্যাংকুভার আইল্যান্ডেই ভিক্টারিয়া অবস্থিত। ভিক্টোরিয়াতে যেতে হয় ফেরি করে। ৯০ মিনিট যাওয়া, ৯০ মিনিট আসা। ফেরিগুলির পরিবেশ অতি উন্নত মানের। স্টেইট অব দ্য আর্ট। দুপাশের মনোরম ভিউ উপহার দিয়ে আমাদের ফেরিটি এগিয়ে যাচ্ছিলো। ফেরি যখন ঘাটে থামলো তখন প্রায় তিনশ সাড়ে তিনশ গাড়ি ফেরির পেট থেকে বের হয়ে সংযুক্ত ঘাটে নামছে এটি দেখতে খুব ভালো লাগলো। ভিক্টোরিয়া শহরের পার্লামেন্ট ভবনের সামনের পার্কে বসে আমরা প্যাকেট লান্চ খেলাম।
৮ জুলাই গেলাম ভ্যাংকুভারের শহরতলী ছাড়িয়ে গ্রাউস মাউন্টেইন এলাকায়। মূল সড়কের পাশে একটি স্পট থেকে গন্ডোলা বা ক্যাবল কারে করে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে হয়, ৪৩০০ ফিট। আমি, খুকু, নাজনীন আর ফরিয়াদের মেয়ে তাসমিয়া চড়লাম গন্ডোলায়। গন্ডোলা যত উপরে উঠছে ততই আমরা বিশাল বিশাল লম্বা পাইন বা পাইন গাছ জাতীয় গাছগুলির চূড়া দেখতে পেলাম। জীবনটা আসলে কম্পেয়ারাটিভ পার্সপেক্টিভসের সমষ্টি। যে গাছগুলি নীচে থেকে মনে হয় ”এক পায়ে দাঁড়িয়ে” আকাশ ছুঁয়েছে, পাহাড়ের ওপর থেকে দাঁড়িয়ে সেই গাছগুলিকে মনে হয় পায়ের তলায় নম নম করছে। প্লেনে চড়লে সেই পাহাড়গুলি হয়ে পড়ে মাটির ঢিবি। আবার সে দোর্দন্ডপ্রতাপ প্লেন ঝড়ের মুখে হাগা মুতা করে ফেলে।
গ্রাউস মাউন্টেনের ওপরে রয়েছে দুটো দর্শনীয় পাস্টটাইম। প্রথমটি হলো “দ্য লাম্বারজ্যাক শো”। সোজা বাংলায় দুই কাঠুরিয়ার মধ্যে কাঠ কাটার প্রতিযোগিতা। তবে পুরো শোটাই হচ্ছে অভিনয়, ৩০ মিনিটের স্রেফ মজা।
লাম্বারজ্যাক শো দেখার পর গেলাম ভালুকের ডেড়ায়। বন্য ভালুকের নয়, পোষ মানানো ভালুকের। দুটো গ্রিজলি বিয়ার–একটার নাম কুলার, আরেকটার নাম এ মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। সম্ভবত ডিনার। পার্কের একজন লোক গ্রিজলি বিয়ারের জীবনযাপনের ওপর বিস্তারিত বলল। যেটা এখানে উল্লেখ করব, সেটি হলো স্ত্রী গ্রিজলির গর্ভাশয় পুরুষ গ্রিজলির বীর্য নিয়ে সাথে সাথে যে প্রাকৃতিক উপায়ে প্রজননে নামবে ব্যাপারটি তেমন নয়। স্ত্রী বিয়ার বীর্য একটি আলাদা স্যাকে সংরক্ষিত রাখে। যখন সে দেখবে যে আবহাওয়ার দিক থেকে বাচ্চা প্রজননের সঠিক সময় এসেছে তখনই কেবল সে বাচ্চা গর্ভাশয়ে নেবার ব্যবস্থা করবে। গ্রিজলি বিয়ার শীতপ্রধান দেশের প্রাণি। বছরে ছয় থেকে সাত মাস হাইবারনেশনে থাকে বরফ থেকে বাঁচার জন্য। আমাদের মনোরন্জনের জন্য বিয়ার দু’টি আমাদের সামনে বেশ আয়েসী ভঙ্গিতে চলাফেরা করল।
ভালুক পর্ব সেরে ফেরার পথে নামলাম শ্যানন ফলসে। অনেক উঁচু থেকে জলপ্রপাত পড়ছে, দেখে যেন আঁশ মেটে না। ক্যামেরার চোখে এটার সৌন্দর্য ধরা পড়ে না। শ্যানন ফলসের সমতলে নেমে আমরা বাসা থেকে নিয়ে আসা রোল্ড কাবাব, শেলীর ভাষায়, কুচকুচ করে খেলাম।
৯ জুলাই নাজনীন চলে গেল তার কর্মস্থল টরোন্টোত। সকালে ফরিয়াদ নিয়ে গেল স্ট্যানলি পার্কে। উঁচু উঁচু বৃক্ষের বনের সাড়ি। প্রকৃতির বিশালত্ব।
আর সন্ধ্যায় তাসমিয়া সহ গেলাম একটি স্থানীয় নাট্যমন্চে। নাম Bard on the Beach. ওরা সারা গ্রীষ্মকাল ধরে শেক্সপিয়ারের বিভিন্ন নাটকের মন্চায়ন করে। আমরা যেদিন গেলাম, সেদিন “ম্যাকবেথ” পরিবেশিত হলো। মজা লাগলো দেখে যে পোর্টারের “নক নক” দৃশ্যে দরজার কড়া নাড়ার বদলে ইন্টারকম ব্যবহার করা হয়েছে। আরও মজা লাগলো কেন না পোর্টার চরিত্রে অভিনয়র করেছে এক বিশাল বপুধারী ফিমেল এক্ট্রেস। এ ছাড়া আপার স্টেজের দুর্দান্ত ব্যবহার দেখলাম। আমি মুগ্ধ হলাম। আমাকে ফিসফিস করে ম্যাকবেথের লাইন আওড়াতে দেখে পাশ থেকে তাসমিয়া ফিসফিস করে বলল, দাদা, তোমার নাটকটি মুখস্ত!
১০ জুলাই সকাল সকাল নাস্তা সেরে নিলাম। ফরিয়াদ এয়ারপোর্টে নামালো না শুধু, বাক্স-প্যাটরা বুকিংএর পর আনিয়ান রিং সহকারে কফি খাওয়ালো।
টরোন্টোর পথে পোর্টার এয়ারলাইনসের বিমানটি ছাড়লো ঠিক দুপুর ১টা ১০ মিনিটে। চার ঘন্টার ফ্লাইট টাইম।
ঘটনাঃ ৫, ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *