নায়েগ্রা জলপ্রপাত-দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে!

কানাডার ডায়েরি – ১১
মোহীত উল আলম
ছোটবেলায় পড়েছি নায়েগ্রা জলপ্রপাতের কথা। ইংরেজিতে নায়েগ্রা ফলস। আমার আগে কখনও দেখা হয় নি। এবার টরোন্টো বেড়াতে আসলে সেটা সম্ভব হলো।
ভ্যাংকুভার থেকে পোর্টার এয়ারলাইনসে টরোন্টো পৌঁছালাম ১০ জুলাই বিকাল ৪টায়। আমেরিকা এবং কানাডার বিভিন্ন এয়ারলাইনসের বিমানে চড়া হয়েছে। ভীষণ কন্জুষি করে এরা খাবার দাবার নিয়ে। কোন কোন ফ্লাইটে কিছুই দেয় না, আর কোন কোন ফ্লাইটে দিলেও বা হালকা একটা কুকিজের প্যাকেট ধরিয়ে দেয়। কিন্তু পোর্টারের ফ্লাইটটা ছিল ব্যতিক্রম। চারঘন্টার ফ্লাইটে মোটামুটি দু’বার স্ন্যাক্স ও ড্রিংকস দিল। আবার যাত্রীদের জন্য পানীয় ও খাবার কেনার ব্যবস্থাও আছে।
ইকবাল করিম হাসনু এসেছিলো এয়ারপোর্টে আমাদেরকে নিতে। সে হলো আমার ভাগ্নে। ভ্যাংকুভারে যে ভাগ্নে ফরিয়াদের কথা বলেছিলাম, হাসনু ঠিক তার ছোট ভাই। অর্থাৎ মণি আপা ও এজাহার দুলাভাইয়ের দ্বিতীয় ছেলে।
হাসনু দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে টরোন্টোতে আছে। সে এখানকার সাংস্কৃতিক মহলে সুপরিচিত। প্রায় বিশ বছর ধরে “বাংলা জার্নাল” নামে একটি উচ্চ মানের দ্বি-ভাষিক (বাংলা ও ইংরেজি) সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করে যাচ্ছে।
হাসনুকে দিয়ে আমি অভিবাসন প্রক্রিয়ার ম্যাপটি সরল করতে চাই। এই অভিবাসন যাত্রাটি হলো একমুখীন। দক্ষিণ এশিয়া সহ পৃথিবীর অন্যান্য অন্চল থেকে কানাডা আর যুক্তরাষ্ট্রে আসার অভিবাসন গল্পের মধ্যে হাসনুর দৃষ্টান্তটি একান্তই প্রতিনিধিত্বমূলক। মধ্যপ্রাচ্য, ভারতবর্ষ এবং পূ্র্ব এশিয়া থেকে হাজার হাজার পরিবারের সেই একই অভিবাসন কাহিনী, যেটা হাসনুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। চল, চল, আমেরিকা চল।
হাসনুর বয়স যখন ২৮ তখন সে টরোন্টো চলে আসে পি আর বা ল্যান্ডেড ইমিগ্র্যান্ট বা স্থায়ী অভিবাসী হয়ে। এসে ভাগ্নে এখানে থেমে থাকে নি। সে কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমে মণি আপা আর দুলাভাইকে স্পন্সর করে নিয়ে আসে। সাথে ফরিয়াদ, নাসের, ও নাজনীনও চলে আসে ঐ একই স্পন্সরশিপে। হাসনুর এই অভিবাসন প্রক্রিয়া যুগ যুগ ধরে অভিভাসী পরিবারগুলোর ইতিহাস।
কিন্তু মণিবু এদেশের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে আট মাসের মাথায় দেশে ফিরে যান। হয়তো দেশে থাকা তার মেয়ে নাসরিন ও ছেলে রেজার জন্য টান অনুভব করছিলেন। দুলাভাইও ফেরত যান আড়াই বছর পর। এখানে একটা প্রশ্ন হয়তো আসবে, ছেলেমেয়েরা যখন অভিবাসী হয়ে যায়, তখন দেশে থাকা বয়স্ক বা অবসরপ্রাপ্ত মা বাবারা কী ছেলেমেয়েদের সঙ্গ পাবার জন্য বিদেশে চলে যাবেন, নাকি দেশে এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম নিয়ে দিন কাটাবেন। দু’দিকেই যুক্তি আছে, সমাধানটা খুব সহজ নয়। বেশিরভাগ বয়স্ক মা বাবা করেন কি তাঁরা বছরটাকে ভাগ করে কিছুদিন বিদেশ, কিছুদিন স্বদেশে কাটান। এই আসা যাওয়ার ফ্যাকড়ার সঙ্গে আর্থিক সংগতি বা অসংগতির সম্পর্ক নিকট।
অবসরপ্রাপ্ত কিন্তু কর্মজীবন অব্যাহত আছে এমন বয়স্ক মা বাবাদের জন্য প্রশ্নটি আরও জটিল। তাঁরা নিজের কর্মক্ষেত্র ছেড়ে জবুথবু হয়ে ঠান্ডাভারী দেশে কোন কর্মসম্পৃক্ত না থেকে দিন গুজরান করবেন এটা প্রায় অসম্ভব। যদি ধরে নিই যে বয়স্কা নারী, যিনি একাধারে মা, নানি, কিংবা দাদী, যিনি দেশে ছিলেন একান্ত গৃহকর্ত্রী, কিন্তু কোন উপার্জনে ছিলেন না, তিনি হয়তো টরোন্টো, নিউইয়র্ক বা এমন কোন শহরে ছেলে বা মেয়ের বাসায় অভিবাসী হয়ে থেকে যেতে পারেন, কিন্তু বয়স্ক কর্মক্ষম কিংবা চাকরিরত পুরুষের জন্য বিদেশে অভিবাসন নিয়ে থাকার চয়েসটি মে বি আ ব্যাড চয়েস।
আবার আরও স্পেসিফিক্যালি বললে, যে কথাটি আমি আমার ২০১৮ সালে আমেরিকা ভ্রমণের ওপর ২০২১ সালে প্রকাশিত “আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে সাঁইত্রিশ দিন” গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলাম সেটি হলো এ কথা যে মানুষ তার জীবন পরিক্রমায় পন্চাশ ষাট বছর পর্যন্ত সংসার গঠনে, ছেলেমেয়েদেরকে বড় করাতে, কিংবা বাড়িঘর তৈরি করাতে নিতান্ত উপার্জনশীল জীবনযাপন করতে ব্যস্ত থাকায় নিজের প্রতি সমাজের কী অভিব্যক্তি সেটা সম্পর্কে সচেতন হয় না, কিন্তু ষাট পেরুলেই সামাজিক মানুষ চায় সমাজে তার উপস্থিতির একটি প্রতিফলন। লোকে তার কথা বলুক, তাকে সালাম করুক, তার কথা শুনুক, তাকে নিয়ে চিন্তা করুক, এরকম একটা রিফ্লেক্টেড ইমেজ সে নিজের জন্য কামনা করে। সমাজকে সে নিজের জন্য আয়না হিসেবে দেখতে চায়। নামগোত্রহীনভাবে কোন মানুষ আসলে বাঁচতে চায় না। সে প্রাথমিকভাবে নিজের পরিবারের চৌহদ্দির মধ্যে এর আঁশ মেটাতে চায়। কিংবা তার পরিচিতি যদি সৃজনগত ও/বা পেশাগত কারণে পরিবারের চৌহদ্দির বাইরে ছড়িয়ে থাকে, তখন সে সমাজের মধ্য থেকে সে আয়নাটা খুঁজতে থাকে।
তবে ওপরের সব কথা হলো যুক্তি নির্ভর কজালিটি বা কারণ-ফলাফল নির্ভর কথা, কিন্তু মানুষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি একটি রহস্যময় ভিতরগত চাপ থেকে নেওয়া হয়ে থাকে যেগুলি বোধগম্য যুক্তির ফলাফল নয়, বরন্চ অবোধ্য যুক্তির ফসল, যার মূল ভিত্তি হলো ভিতরগত গভীর এক আবেগ, যা মোটামুটি সন্তানাদিকেন্দ্রিক। আমাদের নিজস্ব পারিবারিক প্রেক্ষাপট থেকে একটি উদাহরণ দিলে আমার ওপরের চিন্তাটি পরিস্কার হবে।
আমার অতি শ্রদ্ধেয় বড় ভাই সাংবাদিক মঈনুল আলম, যিনি এখন প্রয়াত, যাঁকে আমি সবসময় মিস করি, অত্যন্ত প্রতিভাবান ও যশস্বী লোক ছিলেন। ছিলেন সমাজে সর্বোতভাবে প্রতিষ্ঠিত। আমাদের ভাতিজি মোতাহেরার বিয়ে হবার পর সে স্বামীসহ প্রবাস জীবন শুরু করে। কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই সে কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়। মঈনদা আর নার্গীসভাবী কালক্ষেপণ না করে মেয়েকে দেখাশোনা করার জন্য বিদেশে স্থায়ীভাবে অভিবাসন নিয়ে চলে আসেন। বলা যায় মঈনদা দেশে তাঁর সমস্ত খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠাকে বিসর্জন দিয়ে প্রবাসী হিসেবে বাস করার কঠিন সিদ্ধান্তটি নেন মেয়ের কঠিন সময়ে মেয়ের কাছে থাকার জন্য। মঈনদার অনেক বন্ধু যেমন “পিপলস ভিউ”-র প্রয়াত সম্পাদক নূরুল ইসলাম সাহেব এবং গ্যাস ফিল্ডের গিয়াস ভাই আমাকে সবসময় জিজ্ঞেস করতেন “মঈন কেন চলে গেল, ঠিক আছে মেয়ের অসুখের জন্য গেছে, তো গিয়ে আবার চলে আসতো।”
এখানে বাইরে থেকে আমরা যতই না যুক্তির কথা বলি, তার সবই সন্তানের জন্য বাবা-মা’র অসীম অপত্য স্নেহের কাছে ধূসর হয়ে যাবে। এটার কোন বাহ্যিক যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা নেই।
আমি জীবন সম্পর্কে যতটা বুঝি, তাতে আমার মনে হয়েছে মানুষের জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্তগুলি খুব যে দীর্ঘসময়ের সাসটেইন্ড একটা চিন্তা থেকে উদ্গত হয়, তা হয়ত নয়, বরন্চ যুক্তির ওপরের স্তরের নীচে আরেকটা যে যুক্তির স্তর আছে, যেখানে ব্যক্তি তার আবেগের গভীরতার মধ্যে আরেকটি যুক্তি খুঁজে পান, সেটিই মানুষের সিদ্ধান্ত নেবার নিয়ামক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী কারণে ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি না নিয়ে দেশে ফিরে আসলেন, সেটি আজকে আমরা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারব যে তিনি কবি হতে চেয়েছিলেন বলে ব্যারস্টারি নেন নি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ১৭ বছর বয়সে তিনি জানতেন না তিনি আদৌ কবি হবেন কিনা, কিন্তু কবিতা তাঁকে অমোঘভাবে টানছিলো, যে ভাবে মায়ের স্নেহ সন্তানাদিকে টানে। তাঁর কাছে তখন নিশ্চয় মনে হয়েছিল, কবিতার কাছে আত্মসমর্পণ না করলে তাঁর জীবন অর্থহীন। রবার্ট ফ্রস্টের “দ্য রোড নট টেইকেন” কবিতাটার কথা মনে পড়ছে। যে রাস্তা দিয়ে সকলে হেঁটেছে, কবিতার কথক সে রাস্তা দিয়ে হাঁটেন নি। তারপর বলছেন, সেটাই সবকিছুর পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি বাইরের যুক্তি বা ওপরের স্তরের যুক্তি থেকে আসেনি, এসেছে ভিতরের আবেগসিদ্ধ যুক্তি থেকে।
সপ্তদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনতত্ত্বের চর্চায় এমন একটা আলোচনা স্থান পেয়েছিল যে যুক্তি আগে না প্যাশন বা আবেগ আগে। তখন এ সিদ্ধান্তে আসা হয়েছিল যে সাধারণভাবে যুক্তি হলো আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী একটি অভীপ্সা। কিন্তু বৃহত্তর প্যাশনের কাছে যুক্তি পরাভূত হয়। এই বৃহত্তর প্যাশনকে আমি ভিতরগত যুক্তির সহোদর মনে করছি। যেমন কলম্বাস যদি তাঁর উপদেশকদের যুক্তিসিদ্ধ কথাগুলি শুনতেন, তা হলে তাঁর জাহাজগুলি এখনও ডকে পড়ে থাকতো।
ওপরের যুক্তি আর আবেগ নিয়ে আলোচনাটির সঙ্গে নায়েগ্রা জলপ্রপাতের সঙ্গে মিল আছে। বলছি, কী ভাবে।
১১ জুলাই, শনিবার, হাসনু দুই ঘন্টার মতো ড্রাইভ করে আমাদেরকে নায়েগ্রা জলপ্রপাতের নাকের ডগায় পৌঁছানোর আগেই গর্জনশীল চল্লিশার মতো আমাদের কানে পৌঁছালো জলপ্রপাতটির ঝাঁঝ। তারপর যখন সামনাসামনি দাঁড়ালাম বহু বছর আগে প্রথমবার তাজমহল দেখে আমার যে অনুভূতি হয়েছিল, সেরকম অনুভূতি হলো।
তাজমহল সচক্ষে দেখার আগে তাজমহল সম্পর্কে বহুরকমের বই আমি পড়েছিলাম, বা সিনেমাও দেখেছিলাম। কিন্তু যে মাত্র চোখের সামনে তাজমহল দেখলাম, বুঝলাম যে এই দেখার কাছে আমার আগের অধিত বিষয় কোন ব্যাপার নয়। আমার এই দেখার আবেগ আমি কোন যুক্তি দিয়ে কোয়ালিফাই করতে পারব না। আমি মনকে বোঝাতে পারব না যে আগেতো অনেক ছবি দেখেছি, এটাতো কেবলই তার মূর্ত প্রকাশ। এমন কি রবীন্দ্রনাথের “কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল এ তাজমহল”-এর চিত্রকল্পের চেয়েও আমার কাছে এই আবেগসর্বস্ব দেখা বিস্ময়কর মনে হলো।
ঠিক সেরকম নায়েগ্রা জলপ্রপাত দেখে হলো। নায়েগ্রা সম্পর্কে বহু পড়েছি, বহু সিনেমা আর ছবি দেখেছি, কিন্তু যখন এর সামনাসামনি দাঁড়ালাম আমার সমস্ত আবেগ দিয়ে অনুভব করলাম প্রকৃতির বিশালত্ব। কানাডার প্রান্ত থেকে দেখলাম। লেইক ইরির ব্যাপক জলরাশি অনবরত ঝাঁপ দিচ্ছে লেইক অন্টারিওর ওপর। বিশাল পতন। প্রতিক্রয়ায় বিক্ষুব্ধ ফেনিল জলরাশি সাদা একটা বিরাট স্তম্ভসম দেয়াল তুলেছে। চিকন বৃষ্টির ধারার মতো পানির কণা ছিটেফোঁটা আমাদের গায়েও পড়ছে।
প্রধান জলপ্রপাতটি একটু অর্ধ গোলাকার ধরনের। এজন্য এটাকে হর্স সু ফলস বলা হয়। কানাডিয়ানরা তাদের মালিকানা বোঝাতে কানাডা ফলসও বলে। মজার ব্যাপার হলো জলপ্রপাতটির পতনের চেয়েও আমি আকৃষ্ট হচ্ছিলাম যে পানির ঢল ক্রমশ পতনোন্মুখ অবস্থায় আসছিলো। পতনের আগে পানির ঢলের যে যৌবনমদমত্ত চেহারা, যেটা তার জলপ্রপাতের ধারে এসে আচমকা পতন কোথায় যেন জীবনের উঠানামার সঙ্গে মিলে যায়।
মূল জলপ্রপাতটির বেশ খানিকটা বাম দিকে আরেকটা ছোট আকারের জলপ্রপাত দেখলাম। জলপ্রপাতের খাঁড়ির মাঝখানে উৎসুক পর্যটকেরা জাহাজে করে ঘুরছে।
কানাডা আমেরিকার আইসক্রিম কালচার খুব উর্বর। বেশ মজা। জলপ্রপাত দেখে আমরা গাড়িতে ওঠার আগে মন ভরে আইসক্রিম খেলাম।
নায়েগ্রা দেখার আমার বহুদিনের সাধ ছিল। হাসনুর মাধ্যমে সেটা পূরণ হলো। তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
আর নায়েগ্রার ওপর রংধনুর দৃশ্যটা বুকের কোটরে সেইভ করলাম।
একটা ভিডিওতে ধারাবিবরণী করেছে হাসনু।
ঘটনা: ১১/৭/২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *