২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও ২০ হাজার কিমি নদী-খাল পুনঃখননের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

বিশ্ব পরিবেশ দিবস, পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স সেন্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা শুধু প্রকৃতির জন্য নয়, মানবজাতির অস্তিত্ব, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত। তিনি বলেন, উন্নয়ন ও পরিবেশকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রেখেই একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আল্লাহ পৃথিবীর সবকিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। নদী-নালা, গাছপালা, কীটপতঙ্গ, বন্য ও গৃহপালিত প্রাণীসহ পরিবেশ ও প্রতিবেশের সবকিছুই মানুষের উপকারে আসে। তবে এই সৃষ্টির সুফল ভোগ করতে হলে মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহর সব সৃষ্টির যথাযথ যত্ন ও পরিচর্যা করা মানবসমাজের কর্তব্য।

তিনি বলেন, বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এখন প্রমাণিত হয়েছে যে বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের সঙ্গে মানবসমাজের সম্পর্ক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। নিরাপদ বাস্তুতন্ত্র ছাড়া মানুষের নিরাপদ ভবিষ্যৎ সম্ভব নয়। এ কারণে পরিবেশ মেলা ও বৃক্ষমেলার মতো উদ্যোগ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ বলে তিনি মন্তব্য করেন। আয়োজকদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণকে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।

বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁদের বিচক্ষণতা ও অংশগ্রহণই একটি সবুজ বাংলাদেশ গঠনে নেতৃত্ব দিতে পারে।

বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য সবুজায়নের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আহ্বান জানান, প্রতিটি শিশুর জন্ম উপলক্ষে অন্তত একটি করে গাছ লাগিয়ে সেই নতুন প্রাণের আগমন উদ্‌যাপন করা হোক। তাঁর ভাষায়, নবজাতকের পাশাপাশি একটি গাছও বেড়ে উঠুক এবং এভাবেই সবুজায়ন একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হোক।

আরও পড়ুন:  ময়মনসিংহের স্থগিত কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলছে

তিনি বলেন, সামাজিক উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারও পরিবেশ সংরক্ষণে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্লাইমেট ইয়ুথ ফেলোশিপ এবং এনভায়রনমেন্ট স্টার্ট-আপ ফান্ড চালুর মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সবুজ বাংলাদেশ গঠন সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবে তিনি বলেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না, বরং কোন পরিবেশে, কী ধরনের মাটিতে, কোন আবহাওয়ায় কোন প্রজাতির গাছ রোপণ করা উচিত, সে বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির মতো গাছ দ্রুত বেড়ে উঠলেও সেগুলো দেশের পরিবেশের জন্য কতটা উপযোগী, তা গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

নতুন বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রজাতির ঔষধি, অর্কিড, বাঁশজাতীয়, বনজ, ফলদ, অর্থকরী এবং বিপন্ন প্রজাতির গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বৃক্ষরোপণই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। বনায়ন এমন হতে হবে যাতে পশু-পাখি, বন্য প্রাণী এবং কীটপতঙ্গের নিরাপদ আবাস ও খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়। এ ক্ষেত্রে পরিবেশবিদ ও বনবিদদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গাছপালা, প্রাণী, মাটি, পানি ও বায়ু মিলিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র বজায় রাখাই সরকারের লক্ষ্য বলে তিনি জানান।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নতুন গাছ লাগানো জরুরি হলেও তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো লাগানো গাছগুলো নিরাপদে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বহু দিন ধরে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের অংশ হয়ে থাকা পুরোনো গাছ অযথা কেটে না ফেলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বন বিভাগ এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

আরও পড়ুন:  জুনে চীন বা ভারত সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী

তিনি বলেন, সরকার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে বন উজাড়, পাহাড় কাটা, ম্যানগ্রোভ ধ্বংস এবং বন্য প্রাণী নিধনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মানবসমাজের স্বার্থেই মাটি, নদী, বন, জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, নদীকে রক্ষা করা না গেলে কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা কিংবা পানির নিরাপত্তা কোনোটিই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

সরকার ছাদবাগান, নগর বনায়ন, জিআইএসভিত্তিক বৃক্ষরোপণ, নদীতীর ও খালের দুই পাশ সবুজায়ন এবং ইকো-ট্যুরিজমকে অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে তুলতে চায় বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততা দেশের কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও জনজীবনকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তাই পরিবেশকে আলাদা কোনো খাত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। লক্ষ্য হচ্ছে একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন, জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশ সংরক্ষণ পাশাপাশি এগিয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি সরকার সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এই কর্মসূচি শুধু কৃষকদের সারা বছর সেচ সুবিধা নিশ্চিত করবে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে তিনি বলেন, পরিবেশের উন্নয়ন শুধু বৃক্ষরোপণ কিংবা খাল খননের ওপর নির্ভর করে না। রাজধানীসহ দেশের সব নগর, বন্দর ও শহরতলীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি।

আরও পড়ুন:  নয়াপল্টনে মে দিবসের সমাবেশে শ্রমিকদের ঢল

প্লাস্টিক বর্জ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সরকার ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি জৈব সার উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং Reduce, Reuse, Recycle (3 Rs) নীতির বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সুশৃঙ্খল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু নগর প্রশাসন বা পুলিশের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এ জন্য প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। তিনি সবাইকে যেখানে-সেখানে বর্জ্য না ফেলে নির্ধারিত স্থানে ফেলার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নদী ও জলাভূমি ভরাট এবং বন উজাড়ের কারণে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এর ফলে বন্যপ্রাণী, জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থলও সংকটের মধ্যে রয়েছে।

তিনি বলেন, বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের মাধ্যমে বন্য প্রাণী, পোষা প্রাণী এবং সব ধরনের প্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে মানবসমাজও নিরাপদ থাকতে পারবে না। তিনি বন্য প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর না হওয়া এবং কুকুর-বিড়ালের মতো প্রাণীর প্রতিও মানবিক আচরণ করার আহ্বান জানান। সরকারের পাশাপাশি প্রাণী সংরক্ষণে নাগরিক উদ্যোগের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী এ বছরের জাতীয় বৃক্ষরোপণ পুরস্কার, বন্য প্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার এবং সামাজিক বনায়নের লভ্যাংশপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে বিশ্ব পরিবেশ দিবস, পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০২৬-এর সার্বিক সাফল্য কামনা করে তিনি বলেন, ‘দেশ হোক সকল প্রাণী ও প্রাণের নিরাপদ আবাসস্থল।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *