জুমাবারে আশুরায় কিয়ামত প্রসঙ্গ

কিয়ামত ইসলামের মৌলিক আকিদাসমূহের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি এমন এক অবশ্যম্ভাবী সত্য, যার মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনের সমাপ্তি ঘটবে এবং আখিরাতের অনন্ত জীবনের সূচনা হবে। কিয়ামত হলো সেই মহাদিবস যেদিন মহান আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টিজগত্ ধ্বংস করে পুনরায় জীবিত করবেন এবং মানুষের দুনিয়ার সকল কাজের হিসাব-নিকাশ গ্রহণ করবেন। কিয়ামতের দিনে সব মানুষ পুনরুত্থিত হবে এবং তাদের আমল অনুযায়ী বিচার করা হবে। নেককাররা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং পাপীরা তাদের কর্মফল ভোগ করবে।

এককথায়—কিয়ামত পৃথিবী ও মহাবিশ্বের সমাপ্তি এবং পরকালের বিচার দিবস। এটি ইসলামের মৌলিক আকিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আল্লাহ বলেন, ‘মহা বিপর্যয়! মহা বিপর্যয় কী? তুমি কি জানো মহা বিপর্যয় কী? সেদিন মানুষ হবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পতঙ্গের মতো। আর পাহাড়গুলো হবে ধুনিত রঙিন পশমের মতো।’ (সুরা কারিয়া, আয়াত : ১-৫)

কিয়ামতের দিনক্ষণ : কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে, তার সুনির্দিষ্ট সময় একমাত্র মহান আল্লাহই জানেন। কোনো মানুষ, ফেরেশতা বা নবী-রাসুলও এর নির্দিষ্ট সময় জানেন না। তবে কোরআন ও হাদিসে কিয়ামতের অনেক আলামত (নিদর্শন) বর্ণিত হয়েছে। এসব আলামতের কিছু প্রকাশ পেয়েছে, কিছু ভবিষ্যতে প্রকাশ পাবে। কিয়ামত-আখেরাতের ভাবনা দিয়ে মানুষকে ঈমান ও সত্কাজে উদ্ধৃদ্ধ করা উদ্দেশ্য না হলে মহান আল্লাহ কিয়ামত আসবে—একথাও প্রকাশ করতেন না।

কোরআনে কিয়ামত ও মৃত্যুর সময়-তারিখ গোপন রাখার রহস্য বর্ণিত হয়েছে। তা হলো—মানুষ কর্ম-প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকুক এবং ব্যক্তিগত কিয়ামত তথা মৃত্যু আর বিশ্বজনীন কিয়ামত তথা হাশরের দিনকে দূরে মনে করে গাফেল না হোক। আল্লাহ বলেন, ‘তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে যে, তা কখন সংঘটিত হবে। বলো, এর জ্ঞান তো একমাত্র আমার প্রতিপালকের কাছেই আছে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ১৮৭)

আরও পড়ুন:  গ্রিন কার্ড লটারি স্থগিত করলেন ট্রাম্প

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে—‘কিয়ামত তো অবশ্যম্ভাবী, আমি এটা গোপন রাখতে চাই যাতে প্রত্যেককে নিজ কাজ অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া যায়।’ (সুরা ত্ব-হা, আয়াত : ১৫)

জুমার দিনে কিয়ামত : কিয়ামত অবশ্যই হবে, কিন্তু কবে হবে—এর সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই রয়েছে। তবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামত জুমার দিন সংঘটিত হবে। তবে কোন জুমার দিন, কোন মাস বা কোন বছরে হবে— তা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। আবু লুবাবা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘জুমার দিন সপ্তাহের সব দিনের সর্দার এবং আল্লাহর কাছে অতি মর্যাদাসম্পন্ন। দিনটি আল্লাহর কাছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এ দিনে পাঁচটি বিষয় রয়েছে। (১) এ দিনে আল্লাহ আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন, (২) এদিনেই আল্লাহ্ তাকে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নামিয়ে দিয়েছেন, (৩) এ দিনেই আল্লাহ তাকে মৃত্যু দান করেছেন, (৪) এ দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে যদি কোন বান্দা সে সময়ে আল্লাহ্র কাছে কোন কিছু প্রার্থনা করে আল্লাহ্ তাকে অবশ্যই তা দান করেন যদি না তা অমূলক হয় আর (৫) এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। প্রত্যেক সম্মানিত ফিরেশতা, আকাশ, জমিন, বাতাস, পাহাড়-পর্বত ও সমুদ্র সব কিছুই জুমার দিন কিয়ামতের আশংকায় ভীত-সন্ত্রসত্ম থাকে।’ (ইবনু মাজাহ, হাদিস : ১০৮৪)

আশুরা জুমাবার হলে কিয়ামত প্রসঙ্গ : আশুরার দিন (১০ মহররম) জুমাবারে পড়লে কিয়ামত সংঘটিত হবে—সমাজে এ ধরনের ধারণা প্রচলিত থাকলেও এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য ইসলামী দলিল পাওয়া যায় না। কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে, তবে এর সুনির্দিষ্ট সময়, দিন, মাস বা বছর একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। এছাড়া হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামত জুমার দিনে সংঘটিত হবে; কিন্তু কোনো হাদিসে বলা হয়নি যে তা আশুরার দিনই হবে। ইতিহাসে বহুবার ১০ মহররম জুমাবারে এসেছে, কিন্তু কিয়ামত সংঘটিত হয়নি। সুতরাং আশুরা ও জুমা একই দিনে হওয়াকে কিয়ামতের নিশ্চিত আলামত বা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে মনে করা সঠিক নয়। যে বর্ণনায় আশুরার দিন কিয়ামত হওয়ার কথা এসেছে তা হাদিস বিশারদদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভিত্তিহীন। আল্লামা আবুল ফরজ ইবনুল জাওযি ওই বর্ণনাকে মাওযু বলেছেন। আল্লামা সুয়ুতি ও ইবনুল আররাক (রাহ.) ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়েছেন। (কিতাবুল মাওজুআত ২/২০২; আল-লাআলিল মাসনুআ ২/১০৯; তানযিহুশ শরিআতিল মারফুআ ২/১৪৯)

আরও পড়ুন:  পহেলা বৈশাখের ইতিহাস ও উৎপত্তি

কিয়ামতের প্রস্তুতি: কিয়ামত কবে হবে তা জানা কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তাই আল্লাহ তাআলা তা জানাননি। আল্লাহ তাআলা যে বিষয়ে জানাননি, তার পেছনে পড়ার কোন প্রয়োজন নেই। কিয়ামত কবে হবে— তা জানার কোন ফায়দাও নেই। প্রয়োজন হলো—কিয়ামতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। কেননা কিয়ামতের পর সকলকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। সেদিন প্রত্যেককে তার কর্মের প্রতিদান দেওয়া হবে। কর্ম ভালো হলে ভালো প্রতিদান পাওয়া যাবে, মন্দ হলে মন্দ প্রতিদান। তাই কর্ম ভালো করা ও বেশি বেশি নেক আমলে যত্নবান থাকাই আসল কাজ। সেটাই উপকারে আসবে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামত কবে সংঘটিত হবে? তিনি বলেন, তুমি কিয়ামতের জন্য কি পাথেয় সঞ্চয় করেছ? সে বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই তুমি তার সঙ্গে উঠবে যাকে তুমি ভালবাস। আনাস (রা.) বলেন, ইসলাম গ্রহণের পরে কোন কিছুতে আমরা এত বেশি খুশি হইনি যতটা নবী (সা.) এর বাণী, ‘তুমি তার সঙ্গেই (থাকবে) যাকে তুমি ভালোবাস’— দ্বারা আনন্দ লাভ করেছি। আনাস (রা.) বলেন, আমি আল্লাহ, তার রাসুল, আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) কে ভালবাসি। সুতরাং আমি আশা করি যে কিয়ামত দিবসে আমি তাদের সঙ্গে থাকব, যদিও আমি তাদের মত আমল করতে পারিনি। (মুসলিম, হাদিস : ৬৪৭২)

আরও পড়ুন:  খাবার পরিবেশনে দেরী হওয়ায় বিয়ে ভেঙে দিলেন বর

পরিশেষে বলা যায়, কিয়ামত একটি অনিবার্য সত্য, যা একদিন অবশ্যই সংঘটিত হবে। এর সঠিক সময় ও দিনক্ষণ একমাত্র আল্লাহ তাআলার জানা। যদিও হাদিসে কিয়ামত জুমার দিনে সংঘটিত হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে, তথাপি আশুরার দিন জুমাবারে পড়লেই কিয়ামত হবে—এমন ধারণার কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি নেই। একজন মুমিনের জন্য কিয়ামতের সময় জানার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কিয়ামতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান, নবী করিম (সা.)-এর অনুসরণ, নেক আমল, তাওবা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই আখিরাতের সফলতা অর্জন সম্ভব। আর এটাই হওয়া উচিত প্রত্যেক মুসলমানের জীবনের প্রধান লক্ষ্য।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *