বাজেট ২০২৬-২৭: নতুন সরকারের জন্য বড় সুযোগ ও কঠিন পরীক্ষা বলছে সিপিডি

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে নতুন সরকারের জন্য একটি বড় সুযোগ এবং একই সঙ্গে কঠিন পরীক্ষা হিসেবে দেখছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, দীর্ঘ চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর দশার মতো বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে ঘোষিত এই বাজেটটি বাস্তবায়নের ওপরই এর সাফল্য নির্ভর করছে।

আজ শুক্রবার রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় সিপিডির ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহকারী তামিম আহমেদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে প্রথম বাজেট

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন উল্লেখ করেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসের সাধারণ নির্বাচনের পর নবগঠিত বিএনপি সরকারের এটিই প্রথম বাজেট। এই বাজেট এমন একসময় পেশ করা হলো যখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি চরম চাপের মুখে রয়েছে।

অর্থনীতির বর্তমান দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গত প্রায় চার বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। এর পাশাপাশি আমরা দেখছি প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়েছে, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে, কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান হচ্ছে না এবং রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।’

আরও পড়ুন:  আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস বিএনপি একা সরকার গঠন করবে: তারেক রহমান

ফাহমিদা খাতুন আরও যোগ করেন, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট দেশের উৎপাদন খাতকে ব্যাহত করছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ থাকলেও তা বর্তমানে একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে বাজেটকে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার যে দর্শন নেওয়া হয়েছে, তাকে স্বাগত জানায় সিপিডি।

ইশতেহারের প্রতিফলন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রশ্ন

সিপিডির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটে মানব উন্নয়ন, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করার যে কৌশল নেওয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকারগুলোর সঙ্গে এই বাজেটের সামঞ্জস্য রয়েছে।

তবে বাজেটের বিশাল আকারের চেয়ে তা বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপরই বেশি জোর দিয়েছে সংস্থাটি। ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাজেটের সাফল্য আকারের ওপর নির্ভর করে না, বরং এর বাস্তবায়নের মানের ওপর নির্ভর করে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না।’

আরও পড়ুন:  ‘যত টাকা লাগে দেব, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষায় বাংলাদেশ গড়বো’

বাজেট বাস্তবায়নের লক্ষ্য অর্জনে দেশের কর প্রশাসন, ব্যাংকিং খাত ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত এবং কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করে সিপিডি।

একনজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামো

গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট পেশ করেন। বাজেট প্রস্তাবনার মূল আর্থিক হিসাবগুলো নিচে দেওয়া হলো:

বাজেটের মোট আকার: ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা: ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।

সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি: ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা: ৬.৫ শতাংশ (জিডিপির প্রাক্কলিত আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা)।

প্রস্তাবিত মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা: ৭.৫ শতাংশ (বর্তমানে যা ৯.৪২ শতাংশ)।

ঘাটতি অর্থায়ন ও ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ

বাজেটের ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকারের অর্থায়ন পরিকল্পনার বিষয়ে বিশ্লেষণ করেছে সিপিডি।

ঘাটতি মটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

আরও পড়ুন:  ট্রাম্পের অধিকাংশ শুল্ক আরোপ অবৈধ : মার্কিন আদালত

সিপিডি মনে করে, ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত করতে পারে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

পরিশেষে সংস্থাটি জানায়, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শনের এটিই সরকারের জন্য প্রথম বড় সুযোগ। বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার যদি কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তবেই দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *