রূপপুরে বিকাল থেকে শুরু হচ্ছে জ্বালানি লোডিং

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্লাবে নাম লেখাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকাল থেকে ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম ও ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ শুরু হচ্ছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম ঘিরে প্রকল্প এলাকা ও আশপাশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রশাসনিক পর্যায়েও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে রূপপুরে পৌঁছেছেন।

ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম উপলক্ষে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য, মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের মহাপরিচালকসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। চলতি বছরের শেষ বা আগামী বছরের শুরুতে ইউনিটটি পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারে।

আরও পড়ুন:  রূপপুরে আরও দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ ইউনিট চায় বাংলাদেশ

জানা যায়, রিয়্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শেষ করতে ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগবে। এ সময় বিভিন্ন ধাপে নিরাপত্তা পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ চলবে।

ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে। এই কেন্দ্র পুরোপুরি চালি হলে এখান থেকে জাতীয় গ্রিডে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে।

এদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গণমাধ্যমকে বলেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হবে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে ফুয়েল লোডিং বা জ্বালানি স্থাপনের কাজ শুরু হবে। ওই বছরে সেপ্টেম্বরে রূপপুরের দুটি ইউনিট থেকে মোট ২২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ হয়েছে গত বছরের মে মাসে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য সঞ্চালন লাইনের কাজ চলছে পুরোদমে। এবছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তা শেষ হতে পারে বলে মন্ত্রণালয় জানায়।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবরও জানান, জ্বালানি লোড করার পর রিয়্যাক্টরের ভেতরে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত ও টেকসই চেইন রিঅ্যাকশন বা ‘ফিশন বিক্রিয়া’ শুরু করা হয়। একে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি। শুরুতে রিয়্যাক্টরকে তার পূর্ণ ক্ষমতার মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ স্তরে রেখে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের প্যারামিটারগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

আরও পড়ুন:  ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই ৮ দিন ছুটি পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা

জ্বালানি লোডিং ও বিদ্যুৎ উৎপাদন

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর রিঅ্যাক্টর। এখানেই ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করা হবে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা নিউক্লিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে।

পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। এই তাপশক্তি দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলে।

জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্ট আপ। এ পর্য়ায়ে ডিজাইন অনুযায়ী নিউক্লিয়ার ফিশান রিয়্যাকশন ঘটানো হয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে যার জন্য প্রায় ৩৪ দিন সময় প্রয়োজন হবে। পরীক্ষা শেষে রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে পর্যায়ক্রমে ৩, ৫, ১০, ২০ ও ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৪০ দিন।

আরও পড়ুন:  ডিসেম্বরেই জাতীয় গ্রিডে মিলবে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রীডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চলবে নিরাপত্তা বিষয়ক নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা। সবমিলে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।

কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। ফলে অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার কোনও ঝামেলা নেই। দেড় বছর পর এক তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে।

নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। এরপর বাংলাদেশকে ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি ২ বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *