২০২৫ সালে বাংলাদেশে ‘তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায়’ ছিল দেড় কোটিরও বেশি মানুষ

২০২৫ সালে বাংলাদেশে দেড় কোটিরও বেশি মানুষ ‘তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার’ মধ্যে ছিল। এ ছাড়া বন্যা এবং মানবিক সহায়তা হ্রাসের কারণে বাংলাদেশের দুটি জেলায় আশ্রিত মায়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের খাদ্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে এই সময়ে।

জাতিসংঘ, বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি), ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আরো কয়েকটি মানবিক সহায়তা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে গ্লোবাল নেটওয়ার্ক এগেইনস্ট ফুড ক্রাইসিস শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে।

‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস (জিআরএফসি) শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যহীনতায় ছিল; যা এই গবেষণার আওতাভুক্ত জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ।

এর মধ্যে ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ছিল ‘সংকটজনক পর্যায়-৩’-এর ঘরে। অন্যদিকে ৪০ লাখ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ছিল ‘জরুরি পর্যায়-৪’-এর স্তরে।২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ‘উচ্চমাত্রার তীব্র খাদ্যহীনতায়’ থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭৬ লাখ (৩২ শতাংশ) কমেছে। তবে ‘চরমভাবাপন্ন’ আবহাওয়াসহ নানা কারণে এ পরিস্থিতি ধরে রাখা চ্যালেঞ্জ হবে বলে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

আরও পড়ুন:  সংস্কার তিন মাসের মধ্যে ড. ইউনূস
খাদ্য নিরাপত্তার অভাব যে ১০ দেশে তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। এই তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলো হলো আফগানিস্তান, কঙ্গো, মায়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেন।

‘সংঘাত ও চরমভাবাপন্ন’ আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে অনেক দেশে সংকট অবচ্যাহত থাকবে বা আরো খারাপ হবে বলে প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়েছে।

জিআরএফসিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও সিরিয়ার মতো কিছু দেশে খাদ্য পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেও আফগানিস্তান, কঙ্গো, মায়ানমার ও জিম্বাবুয়ের মতো দেশগুলোতে অবনতি হয়েছে ‘উল্লেখযোগ্যভাবে’।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে একটি ‘মাঝারি’ মানের ‘পুষ্টি সংকটের’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ‘পুষ্টি সংকটে’ থাকা ৫ দেশ হলো ফিলিস্তিন (গাজা), সাউথ সুদান, সুদান, আফগানিস্তান ও সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক।

আরও পড়ুন:  দেশগুলোকে জলবায়ু পরিকল্পনা জমা দিতে চাপ দিচ্ছে জাতিসংঘ

খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতিতে উন্নতি হলেও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির সূচকে অবনতি হয়েছে বাংলাদেশের।

জিআরসি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্বিকভাবে সর্বাধিক সংখ্যক ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির’ শিকার হওয়া ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বাংলাদেশের উপরে রয়েছে শুধু সুদান ও সিরিয়া।

বাংলাদেশের পরের তিন অবস্থানে আছে কঙ্গো রিপাবলিক, নাইজেরিয়া ও মায়ানমার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের ৪৭টি দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ২৬ কোটি ৬৬ লাভ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ছিল। এর মধ্যে ১৪ লাখ মানুষ চরম অনাহার বা দুর্ভিক্ষের সমতুল্য ‘বিপর্যয়কর’ (পর্যায়-৫) স্তরে পৌঁছেছে।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই বছরে দুটি দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা, অন্যটি সুদান। এ ছাড়া দক্ষিণ সুদান ও ইয়েমেনের কিছু অংশেও দুর্ভিক্ষের উচ্চ ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে খাদ্য ও পুষ্টি সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সাহায্য দ্রুত কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এসব সংকট আরো ‘গভীর’ করে তুলতে পারে বলে করতে পারে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ, একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে চাষের মৌসুমে সার উৎপাদনের খরচ বেড়েছে।

আরও পড়ুন:  তহবিল সংকটে শান্তিরক্ষী কমাচ্ছে জাতিসংঘ

জিআরএফসিকে এখনই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাহীনতা, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতির মতো বিষয়গুলোতে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিবেদন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

প্রতিবেদনের মুখবন্ধে তিনি বলেন, “এই প্রতিবেদন জীবন রক্ষাকারী সহায়তায় বিনিয়োগ দ্রুত বৃদ্ধির জন্য ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’ জাগ্রত করার এবং সংঘাতের অবসান ঘটাতে কাজ করার একটি আহ্বান; যা অগণিত মানুষের জীবনে সীমাহীন ‘দুর্ভোগ’ বয়ে আনছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *