মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির আবহে বিশ্ব পুঁজিবাজারে বড় উত্থান

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সাত সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাত অবসানের ইতিবাচক সংকেত আসায় বিশ্ব পুঁজিবাজারে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং লেবাননের মধ্যে চলমান সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা কাটিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে—এমন জোরালো প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীরা আবারও বাজারমুখী হয়েছেন। এর ফলে শুক্রবার লেনদেন শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে সূচকের উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শান্তি আলোচনার এই খবর বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছে।

বাজারের এই চাঙ্গা ভাবের নেপথ্যে বড় ধরণের ভূমিকা রেখেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আশ্বাসবাণী। গত বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাম্প জানান যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন খুব শীঘ্রই একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি সম্পন্ন করতে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি ইসরায়েল এবং লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে ১০ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়াকে বিনিয়োগকারীরা অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষ থেকে হিজবুল্লাহকে এই যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বানের পর থেকেই বিশ্ববাজারে এক ধরণের স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রতিফলন দেখা গেছে ওয়াল স্ট্রিটের সূচকগুলোতে।

আরও পড়ুন:  ভিসা সাক্ষাৎকারের আগে বন্ড পরিশোধ নয় : মার্কিন দূতাবাস

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, লেনদেন শুরুর আগেই প্রধান তিনটি সূচকই ছিল উর্ধ্বমুখী। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ফিউচার দশমিক ৭৫ শতাংশ বা ৩৬৭ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং প্রযুক্তি খাতের প্রধান সূচক নাসডাক ১০০ প্রায় দশমিক ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতির আশায় বিনিয়োগকারীরা এখন আবারও প্রযুক্তি ও সফটওয়্যারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু লাভজনক খাতগুলোতে বিনিয়োগ শুরু করেছেন। তবে আইফোরেক্সের মতো কিছু প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে, এই উত্থান অনেকটা আবেগপ্রবণও হতে পারে। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনা কোনো কারণে ব্যর্থ হলে বাজারে পুনরায় তীব্র অস্থিরতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

শান্তি আলোচনার এই ইতিবাচক প্রভাব কেবল শেয়ারবাজারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও এক ধরণের নাটকীয় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। সংঘাতের ঝুঁকি কমে আসায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলার ১৫ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল, বর্তমান পরিস্থিতির ফলে তাতে বড় ধরণের লাগাম পড়েছে। তবে সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে এখনো কিছুটা উদ্বেগ রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকায় হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি সচল হয়নি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইএএ) সতর্ক করেছে যে, দ্রুত পরিস্থিতির পূর্ণ সমাধান না হলে ইউরোপে বিমানের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।

আরও পড়ুন:  শূন্যপদে ১৩ হাজার ৫৯৯ শিক্ষক নেবে এনটিআরসিএ

ব্যক্তিগত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ক্ষেত্রে শুক্রবার এক মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। জনপ্রিয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সের বাজার মূল্যে প্রায় ১০ শতাংশ ধস নেমেছে। প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা রিড হেস্টিংসের দীর্ঘ ২৯ বছর পর পদত্যাগের ঘোষণা এবং ভবিষ্যৎ আয়ের দুর্বল পূর্বাভাস বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে। অন্যদিকে, এশীয় বাজারে জাপানের নিক্কেই এবং হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক কিছুটা নিম্নমুখী থাকলেও হংকংয়ের বাজারে একটি নতুন এআই সফটওয়্যার কোম্পানি ‘ম্যানিকোর টেক’ তাদের প্রথম দিনের লেনদেনেই ১৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। সপ্তাহের শেষ দিকে এসে বিনিয়োগকারীরা এখন মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেয় কি না, সেদিকেই তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *