রমনা বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে করা মামলার রায় ২৫ বছরেও আসেনি।
বিচার শেষ হতে আরো কতদিন লাগবে, সেই ধারণাও দিতে পারছেন না মামলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চার বছর আগে মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এ যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর্যায়ে ছিল। ২০২২ সালের ২৮ জুলাই সেটি পাঠানো হয় ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এ।
সেখান থেকে ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি পাঠানো হয় মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫ তে। তখন থেকে তিন বছরের বেশি সময় ধরে আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানির জন্য মামলাটি সেখানেই পড়ে আছে।
সর্বশেষ গত ৩১ মার্চ আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আসামিরা না আসায় শুনানি হয়নি।
বিচারক তাওহীদা আক্তার ৯ জুলাই শুনানির নতুন দিন নির্ধারণ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারি তানজীল হোসেন ভূঁইয়া জানিয়েছেন।
২০০১ সালে ঢাকার রমনার বটমূলে ছায়ানটের বৈশাখ বরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়; তাতে প্রাণ যায় ১০ জনের।
দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে আঘাত হানতে মৌলবাদী গোষ্ঠী সেই হামলা চালিয়েছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে।
হামলার দিনই নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ রমনা থানায় দুটি মামলা করেন। একটি মামলা হয় হত্যার অভিযোগে; আরেকটি বিস্ফোরক আইনে।
হামলার প্রায় আট বছর পর ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর ঢাকার আদালতে দুই মামলায় ১৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
আসামির তালিকায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানও ছিলেন।
বিস্ফোরক আইনের মামলায় আসামির তালিকায় ১১ জনের নাম রয়েছে। তারা হলেন— আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, মাওলানা আকবর হোসাইন ওরফে হেলাল উদ্দিন, শাহাদাতউল্লাহ ওরফে জুয়েল, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, আলহাজ্ব মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, মাওলানা সাব্বির ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আ. হাই।
আসামিদেরমধ্যে আলহাজ্ব মাওলানা মো. তাজউদ্দিন ও হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম পলাতক। আকবর ও আবু তাহের জামিনে রয়েছেন; বাকি সাত আসামি কারাগারে।
মামলার অগ্রগতি জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আদালতের অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর মাহফুজ হাসান বলেন, “কারাগারে থাকা ৭ আসামি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন মামলায় আটক রয়েছেন। আত্মপক্ষ শুনানিতে আসামিদের উপস্থিত থাকতে হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের আদালতে হাজির করতে পারছে না। এজন্য আত্মপক্ষ শুনানি হচ্ছে না। তাদের আদালতে হাজির করলে আত্মপক্ষ শুনানি হয়ে যাবে।”
রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, “আমরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত। রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে যথেষ্ট আন্তরিক।”
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, “এ ঘটনায় করা দুটি মামলার মধ্যে হত্যা মামলার রায় হয়েছে। বিস্ফোরক মামলাটি উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত ছিল। এ কারণে নিষ্পত্তি হতে বিলম্ব হয়েছে। মামলাটি আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানির পর্যায়ে রয়েছে।
“আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে নিয়ে যাব। ইনশাআল্লাহ, জাতি রায় দেখতে পাবে।”
আগামী ‘দুই-তিন মাসের মধ্যে’ মামলাটি নিষ্পত্তি হয়ে যাবে বলে বিশ্বাস এই আইনজীবীর।
আসামি আকবর ও আবু তাহেরের আইনজীবী জসিম উদ্দিন বলেন, “মামলায় কিছুই নাই। জোর করে একজনের জবানবন্দি নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার মামলাটি সাজিয়েছিল। এই দুজন (আকবর ও তাহের) কোনোভাবেই জড়িত না, তারা নির্দোষ। সঠিক বিচার হলে তারা খালাস পাবেন, এটাই প্রত্যাশা করছি।”
দুটি মামলার মধ্যে হত্যা মামলার রায় হয় ২০১৪ সালের ২৩ জুন। সেদিন ১৪ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ঢাকার দায়রা জজ রুহুল আমিন।
রায়ের পর কারাগারে থাকা আসামিরা খালাস চেয়ে উচ্চ আদালত আপিল করেন। অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) জন্য নিয়ম অনুযায়ী মামলাটি আসে হাই কোর্টে।
বেশ কয়েকটি বেঞ্চ ঘুরে গত বছর বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়।
আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলিদের শুনানি শেষে গত বছরের ৮ মে রায় পড়া শুরু করেন বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরিন আক্তারের হাই কোর্ট বেঞ্চ।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডের এক আসামিকে হাই কোর্ট যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। যাবজ্জীবনের এক আসামির সাজা বহাল রাখা হয়। বাকি নয়জনের সাজা কমে হয় দশ বছরের কারাদণ্ড।







