স্লোগান—একটি শব্দ, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি পারে ইতিহাস বদলে দিতে, পারে অশ্রু ভেজা রাতকে পরিণত করতে বিজয়ের প্রভাতে। মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ, স্বপ্ন আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা একসময় স্লোগান হয়েই ঝড় তোলে রাস্তায়, শহরে, গ্রামে। স্লোগান কখনও কেবল উচ্চারিত শব্দ নয়। স্লোগান হলো সময়ের ভাষা, ইতিহাসের স্পন্দন, একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ঘোষণাপত্র। কখনও এটি প্রতিবাদের আগুন জ্বালায়, কখনও স্বাধীনতার স্বপ্নকে কণ্ঠে তুলে দেয়, কখনও রাজনৈতিক দর্শনের পরিচয় বহন করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে তিনটি স্লোগান বিশেষভাবে আলোচিত কখনও প্রশংসিত, কখনও সমালোচিত। এই স্লোগানগুলোর পেছনে আছে ভিন্ন ভিন্ন সময়, প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক দর্শন।
ইতিহাসের আলোকে সংক্ষেপে স্লোগানগুলো নিয়ে কিছু আলোচনা করছি-
“ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানটির উৎপত্তি ১৯২১ সালে। ভারতের উত্তর প্রদেশে জন্ম নেয়া ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী ও উর্দু কবি মাওলানা হাসরাত মোহানি এই স্লোগানের প্রবর্তক।
পরবর্তীতে ভারতের বিপ্লবী নেতা হিন্দুস্তান সোশ্যলিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA) এর অন্যতম কর্ণধার ভগত সিং তাঁর বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে এই স্লোগানকে জনপ্রিয় করে তুলেন। ভগত সিং ছিলেন একজন স্বঘোষিত নাস্তিক বিপ্লবী। তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “Why I Am an Atheist”এ তিনি নাস্তিকতা ও যুক্তিবাদের পক্ষে নিজের অবস্থান খোলামেলা ব্যাখ্যা করেন।
“ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগান মূলত ব্রিটিশবিরোধী ভারতীয় উপমহাদেশের বিপ্লবী আন্দোলনের অংশ ছিল। পাকিস্তানেও বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে এ স্লোগান ব্যবহৃত হয়েছে।
বাংলাদেশে ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই স্লোগান শুনা গেলেও মূলত ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ (বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক) স্লোগানটি ভারতীয় উপমহাদেশীয় বিপ্লবী ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা।
“ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানের সাথে বাংলার জনপদের কৃষ্টি- কালচার, ধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীন বাংলাদেশের কোন ঐতিহাসিক সম্পর্ক বা যোগসূত্র ইতিহাসের পাতা থেকে আমি খুঁজে পাইনি।
১৯৭০ সালের ভয়াবহ ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের পর ঢাকার পল্টন ময়দানে ভাষণ দিতে গিয়ে মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী “পাকিস্তান জিন্দাবাদ”এর পরিবর্তে উচ্চারণ করেন “পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ” এবং এখান থেকেই “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” স্লোগানের রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি ধারা স্পষ্ট হতে শুরু করে।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” ও “শেখ মুজিব জিন্দাবাদ” ধ্বনিও শোনা যায়।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খন্দকার মোস্তাক আহমেদ এর আমলে “জয় বাংলা”র পরিবর্তে “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” রাষ্ট্রীয় স্লোগান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে বীর উত্তম শহীদ প্রেসিডেন্ট মেজর জিয়াউর রহমান “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”এর দর্শনের অংশ হিসেবে এই স্লোগানকে গুরুত্ব দেন।
“বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” স্লোগানটি স্বাধীনতার পরবর্তী রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস তথা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
“জয় বাংলা” দুটি শব্দ, অথচ এক বিস্তীর্ণ আবেগভূমি। এই দুটি শব্দে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও জাতীয় আবেগ যেন একসূত্রে গাঁথা।
১৯২২ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ভাঙার গান কাব্যের “পূর্ণ-অভিনন্দন” কবিতায় “জয় বাঙলা” শব্দযুগল ব্যবহার করেন। একাত্তরে এসে এই শব্দই হয়ে ওঠে বাঙালির মুক্তির স্লোগান।
একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে এবং শরণার্থী শিবিরে, রণাঙ্গনে, বিজয়ের উল্লাসে বজ্রকন্ঠে ধ্বনিত হতো “জয় বাংলা” স্লোগান।
এটি শুধু একটি যুদ্ধের স্লোগান ছিল না, এটি ছিল একাত্তরে আমাদের আত্মপরিচয়ের ঘোষণা।
মুক্তিযুদ্ধকালীন বাঙালির প্রধান প্রেরণার উৎস ও ঐক্যের ডাক “জয় বাংলা”। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় চেতনার অন্যতম ভিত্তি এই “জয় বাংলা” স্লোগান।
বাংলাদেশের জন্ম ও লাল সবুজ পতাকার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ “জয় বাংলা” স্লোগান।
স্লোগান নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। ইতিহাসের পাঠ ভিন্ন হতে পারে। রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও আলাদা হতে পারে। কিন্তু এই সত্য সবাইকে স্বীকার করতেই হবে-
“স্লোগান জাতির ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।”
আপনার স্লোগান কোনটি ? এর উত্তর আপনার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের উপর নির্ভর করবে। কিন্তু ইতিহাস জানাটা সবার দায়িত্ব। কারণ ইতিহাস না জানলে আমরা শব্দের ভেতরের শক্তিকে বুঝতে পারি না।
মত-পথের ও স্লোগানের পার্থক্যের মধ্যেও পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকুক, এই প্রত্যাশা রেখেই লেখাটি শেষ করছি।
ধন্যবাদ।
লেখক-শামছুল আরেফিন শাকিল। কবি, সংগঠক ও অনলাইন এক্টিভিটিস।







