ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানী ঢাকার রাজপথে শুরু হয়েছে একুশের পদযাত্রা। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেমেছে অগণিত মানুষের ঢল। হাতে ফুলের তোড়া আর হৃদয়ে গভীর আবেগ নিয়ে সর্বস্তরের মানুষ আজ সারিবদ্ধভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই জনস্রোত আরও বিস্তৃত হয়েছে, যার ফলে শহীদ মিনারের মূল বেদি এখন নিপুণ কারুকাজের ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে।
অমর একুশের এই মহতী আয়োজনে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় বিএনসিসি ও স্কাউটস সদস্যরা নিরলস দায়িত্ব পালন করছেন। একে একে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, সরকারি দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাঁদের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করছেন। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোর মধ্যে আজ সকালে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে ইডেন মহিলা কলেজ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ও উদীচী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, টিআইবি এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। প্রত্যেকের উপস্থিতিতে শহীদ মিনার চত্বর এক অনন্য জাতীয় সংহতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক শ্রদ্ধার বাইরেও ব্যক্তিগতভাবে অসংখ্য মানুষ এই আয়োজনে শামিল হয়েছেন। অনেক অভিভাবককে দেখা গেছে নিজেদের ছোট শিশুদের হাত ধরে কিংবা কোলে করে শহীদ মিনারে নিয়ে এসেছেন। নতুন প্রজন্মের কাছে বায়ান্নর উত্তাল দিনগুলোর ইতিহাস ও ভাষা শহীদদের বীরত্বগাথা হাতে-কলমে তুলে ধরছেন তাঁরা। কেউ কালো ব্যাজ ধারণ করে শোক প্রকাশ করছেন, আবার কেউবা বাসন্তী সাজে বসন্ত আর একুশের চেতনাকে একই সুতোয় গেঁথেছেন। একুশের ভোরে নগ্নপদে হেঁটে আসা এই মানুষের ভিড় প্রমাণ করে দেয় যে, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আজও বাঙালির হৃদয়ে কতটা অম্লান।
শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা শফিকুল ইসলাম নামের এক নাগরিক তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, একুশ আমাদের চিরন্তন প্রেরণার উৎস। এই আন্দোলন থেকেই আমাদের স্বাধীনতার প্রকৃত পথচলা শুরু হয়েছিল। যখন তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছিল, তখন ছাত্ররা নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল—যা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল ও গর্বের দৃষ্টান্ত। ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার মনে করেন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর এখানে এসে শ্রদ্ধা জানালে সেই বীরত্বপূর্ণ ইতিহাসকে নতুন করে অনুভব করা যায়।
অন্যদিকে, শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত স্কাউট সদস্য মাহদি হাসান মানুষের গভীর আবেগ দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, জনসমুদ্র সামাল দিতে কষ্ট হলেও মানুষের নিয়ম মেনে শ্রদ্ধা জানানোর মানসিকতা দেখে তাঁরা উৎসাহিত বোধ করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিশ্ছিদ্র নজরদারিতে পুরো এলাকা এখন উৎসবমুখর অথচ ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। বিকেলের দিকে জনসমাগম আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, তিয়াত্তর বছর আগের সেই ফাগুনের আগুন আজও বাঙালির রক্তে ও চেতনায় নতুন করে দোলা দিয়ে যাচ্ছে।







