প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সচিবালয়ের মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সরকারের নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে বেরিয়ে একথা জানান অর্থ প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।
জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন, নির্বাচনি ইশতেহারে যেসব অঙ্গীকার দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সবাইকে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে। এই যে সর্বাত্মক চেষ্টা— এটা এমনভাবে তিনি উপস্থাপন করেছেন, এটা আসলে কেবল একটা কথার কথা নয়। মানে অপ্রয়োজনীয় সময় যাতে ব্যয় না হয়, এবং মূল কাজগুলো যাতে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা আরম্বর ধরনের কর্মসূচি যথাসম্ভব পাশে সরিয়ে— মূল যে কাজগুলো বিশেষত নির্বাচনি অঙ্গীকার ইশতেহার আছে, সেগুলো পালনে সচেষ্ট হতে হবে, ভূমিকা রাখতে হবে।’’
সাকি বলেন, ‘‘দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির বিষয়ে উনি খুব স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন এবং তার সরকারের যে একটা ‘ক্লিন গভর্নমেন্ট’ হিসেবে তিনি তার যে অবস্থানটা রাখতে চান, সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন। যেকোনও মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রিপরিষদের সদস্য কেউ যাতে ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনোভাবেই দুর্নীতির কোন জায়গায় যেতে না পারেন, সেটা খুবই কঠোরতার সঙ্গে তিনি তার অবস্থান জানিয়েছেন।’’
তিনি জানান, মূলত আজকে যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার মধ্যে আগামীকাল থেকে রমজান শুরু হচ্ছে, মানুষকে কিভাবে স্বস্তিতে রাখা যায়, দ্রব্যমূল্য থেকে শুরু করে মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা, অন্যান্য সব পরিবেশ যাতে ঠিক রাখা যায়, সে বিষয়টা এখন সবারই প্রায়োরিটি, সবার অগ্রাধিকার। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী, দীর্ঘমেয়াদী যে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতি এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জায়গাতে পৌঁছানোর বিষয় রয়েছে। কিছু বিষয় যেমন- নির্বাচনি অঙ্গীকারে ছিল কৃষকের ফ্যামিলি কার্ড, সঙ্গে ইমাম সাহেবসহ অন্যান্য ধর্মের পুরোহিতদেরকে বিশেষ ভাতা দেওয়া, সেটাও কিভাবে এই রোজার মধ্যে শুরু করা যায়— সেসব বিষয় নিয়েও তিনি আলাপ-আলোচনা তুলেছেন। সবাই তাদের মতামত দিয়েছেন। স্থানীয় নির্বাচনের বিষয় নিয়েও বৈঠকে উঠেছে, কত দ্রুততম সময় স্থানীয় নির্বাচনের দিকে যাওয়া যায়। তো এই বিষয়েগুলোতে খুব দ্রুতই হয়তো সিদ্ধান্ত আসবে।
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সরকারের নতুন মন্ত্রিসভায় রয়েছেন মোট ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। তাদের মধ্যে তিনজন টেকনোক্র্যাট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) তাদের দায়িত্ব বণ্টন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এতে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রিত্বের পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের দায়িত্বও পালন করবেন তারেক রহমান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘‘প্রাথমিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নতি রাখা, রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, সরবরাহ চেইন কঠোরভাবে মনিটর করার কথা বৈঠকে বলেছেন। আমরা এবার ১৮০ দিনের একটা অগ্রাধিকার পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কথা বলেছি, সেটা পরে জানানো হবে। প্রাথমিক অগ্রাধিকারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ চেইন এবং বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে যাতে কোনও সমস্যা তৈরি না হয়। ’’
‘‘এছাড়া সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জনগণ আমাদের ইশতেহারের ওপর ম্যান্ডেট দিয়েছেন। সুতরাং, জনগণের ইচ্ছা প্রাধান্য পাবে। সংবিধান, আইন এবং রুল অব বিজনেস অনুযায়ী সেগুলো বাস্তবায়নের নির্দেশ তিনি দিয়েছেন। সভায় বলা হয়েছে, কে কোন দলের আমরা দেখবো না, আমরা মেরিট ভিত্তিতে যাচাই করবো।’’
বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে শ্রম প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, ‘‘বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের যে এত বিপুল জনসমর্থন—সেটার জায়গা থেকে প্রধানমন্ত্রী আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, জনগণ আমাদের কাছ থেকে যে সুশাসন এবং জবাবদিহি চায়, সেক্ষেত্রে আমরা স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ের যারা দায়িত্বে আছি, তারা যেন যেকোনও ধরনের প্রভাব এবং স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করি এবং বিশেষ করে দুর্নীতির প্রশ্নে যেন আমাদের একটা শক্ত অবস্থান থাকে।’’’
নূর বলেন, ‘‘আগামীতে যে রমজান শুরু হচ্ছে, এই রমজানকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা, প্লাস সেহরি, ইফতার, তারাবির সময়টা যেন বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন থাকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন স্বাভাবিক থাকে এবং সরকারের যে কমিটমেন্ট, বিশেষ করে নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় জনসভায় যে বিষয়গুলো বলেছেন— ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, সেগুলো কীভাবে ইমিডিয়েটলি আসলে কিছু দৃশ্যমান কাজ করা যায়, সেই বিষয়গুলো নিয়েও তিনি আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন, আলোচনা করেছেন।’’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর একটি ঘোষণা ছিল যে, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বিষয়ে সরকারের একটি উদ্যোগ থাকবে। সেটি নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন— ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের বিষয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে কী করা যায়। সামগ্রিকভাবেই সমস্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে।’’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘যেহেতু আমি দুটো নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছি, আমাদের জায়গা থেকে আমরা একটা বিষয় তার দৃষ্টিতে আনার চেষ্টা করেছি— আমাদের শ্রমবাজারের বড় একটা অংশ মিডল ইস্ট-বেজড। মিডল ইস্টের সঙ্গে কিন্তু শ্রমবাজার ওপেনের ক্ষেত্রে সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময় সেটার একটা ধারাবাহিকতা ছিল। কিন্তু মাঝখানে নানাবিধ কারণে সেটার একটা ছন্দপতন হয়েছে, বন্ধ হয়েছে অনেক জায়গার শ্রমবাজার। সেখানে শ্রমবাজার ওপেন করার জন্য যদি প্রধানমন্ত্রী একটি সফর দেন মিডল ইস্টে, সেটা আমাদের জন্য একটা সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে। আমাদের জায়গা থেকে এটিও বলেছি, তার জায়গা থেকেও আরও কিছু পরামর্শ আমাদের দিয়েছেন যেগুলো কাজের ক্ষেত্রে আমরা মেনে চলব।’’






