দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে অডিও বার্তায় ইউনূসকে তীব্র আক্রমণ শেখ হাসিনার

দিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও বার্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইউনূসকে বারবার ‘খুনি ফ্যাসিস্ট’, ‘মহাজন’, ‘অর্থপাচারকারী’ ও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে তিনি সরব হন।

ক্ষমতা হারানোর পর ভারতে নির্বাসিত জীবনে কোনো অনুষ্ঠানে দেওয়া প্রথম বক্তৃতায় আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

এনডিটিভি জানিয়েছে, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ‘অবৈধ ও সহিংস’ শাসন পরিচালনার অভিযোগ এনে হাসিনা বলেছেন, ইউনূসের নেতৃত্বে দেশ ‘ভয়, নৈরাজ্য ও গণতন্ত্রের নির্বাসনের এক যুগে’ প্রবেশ করেছে।

বাংলাদেশে আন্দোলন দমাতে ১,৪০০ মানুষকে ‘হত্যার নির্দেশ’ দেওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসক’ বলে থাকেন তার বিরোধীরা।

সেই হাসিনাই তার বক্তব্যে ইউনূসকে বার বার ‘খুনি ফ্যাসিস্ট’, ‘মহাজন’, ‘অর্থপাচারকারী’ ও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যায়িত করে তীব্র আক্রমণ চালিয়েছেন।

শুক্রবার দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও বার্তার মাধ্যমে এই বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা, যিনি বাংলাদেশের আদালতের দৃষ্টিতে একজন ‘পলাতক ফাঁসির আসামি’।

দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের’ অস্তিত্বের সংকট হিসেবে বর্ণনা করে তিনি তার সমর্থকদের উদ্দেশে “বিদেশি স্বার্থে পরিচালিত পুতুল সরকারকে উৎখাতের” আহ্বান জানান।

এনডিটিভি লিখেছে, ‘সেইভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের এই সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক একাধিক মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের দেখা যায়।

আরও পড়ুন:  ‘সরকার পতনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল না’, সিএনএন-নিউজ এইটিনকে হাসিনা

শেখ হাসিনা সেখানে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন না। অনেকের আলোচনার মধ্যে তার ওই অডিও বার্তা সংবাদ সম্মেলনে প্রচার করা হয়। উপস্থিত আওয়ামী লীগ নেতারা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, “বাংলাদেশ আজ এক গভীর খাঁদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে।”

দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে শেখ হাসিনা বর্ণনা করেন ‘এক বিশাল কারাগার, এক মৃত্যুকূপ, এক মৃত্যুপুরী’ হিসেবে। ঠিক একই অভিযোগ তার শাসনামলে বিএনপি নেতারা করতেন।

“উগ্রপন্থি শক্তি ও বিদেশি শক্তি দেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে” বলেও অভিযোগ করেন সবচেয়ে বেশি সময় বাংলাদেশ শাসন করা এই রাজনৈতিক নেত্রী।

তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাকে ‘পরিকল্পিত এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে’ ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে।

তার ভাষায়, সেই দিন থেকেই “দেশ ভয়াবহ সন্ত্রাসের যুগে প্রবেশ করেছে। গণতন্ত্র এখন নির্বাসনে।” মানবাধিকার “ধুলায় পদদলিত”।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ‘ধ্বংস’ এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘নির্বিঘ্নে সহিংসতা চলতে দেওয়া হচ্ছে’ বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত দেশজুড়ে ‘গণপিটুনি, লুটপাট ও চাঁদাবাজি’ হচ্ছে অভিযোগ করে শেখ হাসিনা বলেন, “জীবন ও সম্পত্তির কোনো নিরাপত্তা নেই। আইনশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।”

তবে তার সবচেয়ে তীব্র আক্রমণ ছিল ব্যক্তিগতভাবে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে।

হাসিনা অভিযোগ করেন, ইউনূস দেশকে “নিঃস্ব” করে দিচ্ছেন এবং ভূখণ্ড ও সম্পদ “বিদেশি স্বার্থের কাছে বেচে” দিয়ে বাংলাদেশকে “বহুজাতিক সংঘাতের অগ্নিকুণ্ডের দিকে” ঠেলে দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন:  ২১ দিনে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স

তিনি বলেন, “দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে খুনি ফ্যাসিস্ট ইউনূস আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”

মুহাম্মদ ইউনূসের তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে’ ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।”

তিনি আওয়ামী লীগকে দেশের ‘গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের একমাত্র বৈধ ধারক’ হিসেবে দাবি করেন, যদিও তাদের বিরুদ্ধে ‘একদলীয় শাসন’ চালুর অভিযোগ করে থাকেন বিরোধীরা।

আওয়ামী লীগকে “স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল” হিসেবে বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, “জনগণকে সঙ্গে নিয়ে” তার দল “ছিনিয়ে নেওয়া সমৃদ্ধ স্বদেশ পুনর্গঠনে” ভূমিকা রাখবে।

দেশকে “সারিয়ে তুলতে” পাঁচ দফা দাবিও অডিও বার্তায় তুলে ধরেন চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা।

এর মধ্যে ইউনূস সরকারকে সরিয়ে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ এবং ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির’ দাবি করেছেন শেখ হাসিনা, যদিও তার আমলে গত তিনটি নির্বাচনেই ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ছিল।

দ্বিতীয় দাবিতে শেখ হাসিনা ‘সহিংসতা ও নৈরাজ্যের’ অবসানের কথা বলেন; তার ভাষায় স্থিতিশীলতাই হল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও নাগরিক সেবার পূর্বশর্ত।

তৃতীয় দাবিতে তিনি ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার নিশ্চয় চেয়ে তাদের ওপর ‘হামলা’ বন্ধ করতে বলেন।

আরও পড়ুন:  আগারগাঁও ও বিমানবন্দর রেলস্টেশনে ককটেল বিস্ফোরণ

আইনি প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে’ সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও বিরোধীদের ‘হয়রানি ও গ্রেপ্তারের’ অবসান চাওয়া হয় তার চতুর্থ দাবিতে।

পঞ্চম ও শেষ দাবিতে শেখ হাসিনা গত এক বছরের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের অধীনে ‘নিরপেক্ষ তদন্ত’ চেয়ে বলেন, “সত্যের পরিশুদ্ধি” ছাড়া জাতির পুনর্মিলন সম্ভব নয়।

“আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পাশে আছে” দাবি করে তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের কণ্ঠ শুনতে ব্যর্থ হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমরাও শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।”

এনডিটিভি লিখেছে, শেখ হাসিনার এই বক্তৃতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গভীর বিভাজনের’ চিত্রই তুলে ধরেছে। শেখ হাসিনা বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনো সাধারণ রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং ‘মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বনাম চরমপন্থা, বিশৃঙ্খলা ও বিদেশি প্রভাবের’ মধ্যে এক লড়াই হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন।

‘বিশ্বাসঘাতকতা’, ‘দখল’ ও ‘প্রতিরোধের’ মত শব্দচয়ন করে স্পষ্টতই তিনি সমর্থকদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন। আর আওয়ামী লীগের এখনকার সংগ্রামকে দলীয় নয়, বরং ‘দেশপ্রেমিক দায়িত্ব’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *