সরকারি কর্মচারীদের বেতন আড়াই গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন প্রায় আড়াই গুণ ধার্য করার সুপারিশ করেছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান নিয়মেই সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি বেতন গ্রেড রাখা হয়েছে। 

নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রায় একই হারে পেনশন, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ভাতাও বাড়বে।

সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গতকাল বুধবার যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বেতন কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেয়। এ সময় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সর্বশেষ বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। সে সময় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ২০০৯ সালের বেতন স্কেলের তুলনায় ১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। ১ নম্বর গ্রেডে বেতন ৪০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৮ হাজার টাকা করা হয়েছিল। আর সর্বনিম্ন ২০ নম্বর গ্রেডে বেতন চার হাজার ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে আট হাজার ২৫০ টাকা করা হয়। পরবর্তী বাজেটগুলোতে এই বৃদ্ধির বড় ধরনের চাপ পড়ে।

গতকাল জমা দেওয়া প্রতিবেদনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকার পরে প্রজ্ঞাপন জারি করবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে এ সরকারের আমলে প্রজ্ঞাপন জারি না হলে ধারাবাহিকতা অনুযায়ী নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী দেখার পর আন্তঃমন্ত্রণালয়ে এ কাঠামো নিয়ে পর্যালোচনা হতে পারে। এরপর মন্ত্রিপরিষদে যাবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য। নির্বাচিত সরকার এ প্রস্তাব পরিবর্তনও করতে পারে। প্রস্তাবিত নতুন বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে বর্তমানে প্রদত্ত ১০ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ বিশেষ ভাতা প্রচলিত নিয়মে সমন্বয় করা হতে পারে।

কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান জানান, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রেস উইং জানায়, নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ আগেই বুধবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন পেশ করেছে।

আরও পড়ুন:  দুই ধাপে টানা ৬ দিন ছুটি পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা

প্রধান উপদেষ্টা প্রতিবেদন গ্রহণ করে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি মস্ত বড় কাজ। মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। রূপরেখা দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।’ বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ কথা জানায়।

প্রেস উইং আরও জানায়, কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় বলেছেন, সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার দরকার পড়বে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান বলেন, গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়োপযোগী ও যথাযথ বেতন কাঠামো নির্ধারণ না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণপূর্বক বিদ্যমান বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিশন কাজ করে।

প্রেস উইং জানিয়েছে, নির্ধারিত কার্যপরিধি অনুসরণ করে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে কমিশন বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে অনলাইন ও অফলাইনে ১৮৪টি সভা করেছে। মতামত নিয়েছে দুই হাজার ৫৫২ জনের। পাশাপাশি বিভিন্ন সমিতি ও অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা সভার আয়োজন করে ব্যাপক মতবিনিময় করা হয়েছে। কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান নির্ধারণ এবং এর বাস্তবায়নযোগ্যতা পর্যালোচনা করা।

গত ২৭ জুলাই সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে। পরে সময় বাড়িয়ে এর জন্য আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে তিন সপ্তাহ আগে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিশন। ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হয়।

আরও পড়ুন:  "বঙ্গবন্ধু শান্তি পদক" চালু করছে বাংলাদেশ

কাঠামোর ভিত্তি
সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বা সম্পদ সঞ্চালন পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ ও সার্বিক বিশ্লেষণ শেষে প্রচলিত ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫ বেতন স্কেলের সুপারিশ করেছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশন জানায়, বাবা-মাসহ ছয় সদস্যের পরিবার এবং দুই সন্তানের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বাবদ ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এবারের সুপারিশ করা হয়েছে। আগের কাঠামোতে পরিবারের সদস্য সংখ্যা ধরা হয়েছিল ৬। এ ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরকারের সম্পদ পরিস্থিতি, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য সম্পদের প্রয়োজনীয়তা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থা/প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয়ের অবস্থা বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত কাঠামোতে বেতন
বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা ও বাড়ি ভাড়া ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে সর্বমোট বেতন-ভাতা হয় ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা। প্রস্তাবিত বেতন স্কেল অনুযায়ী ২০তম গ্রেডের উল্লিখিত কর্মচারীর মূল বেতন ২০ হাজার টাকা ও ভাতা মিলে মোট বেতন-ভাতা হবে ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা। একইভাবে ১৯তম গ্রেড থেকে ১ নম্বর গ্রেড পর্যন্ত ভাতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। তবে যুক্তিসংগত বিবেচনা ও সমতা বিধানের স্বার্থে এই বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম হবে। কিছু কিছু ভাতা আছে, যা দশম বা ১১তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা পেয়ে থাকেন। যেমন– যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা, ঝুঁকি ভাতা (যার যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। তাছাড়া এই ভাতা বৃদ্ধির হারের ক্ষেত্রে, গাড়ি সেবা নগদায়ন (পঞ্চম গ্রেড থেকে তদূর্ধ্ব) ভাতা বিবেচনায় আনা হয়নি। এ জন্য শতকরা হারে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ভাতা বৃদ্ধির হার কম পরিলক্ষিত হবে।

প্রস্তাবিত নতুন বেতন স্কেলের অনুপাত ১:৮। প্রথম বেতন কমিশনে (১৯৭৩) সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন অনুপাত যেখানে ছিল ১:১৫.৪, সেখানে পূর্ববর্তী অর্থাৎ সর্বশেষ বেতন কমিশনে (২০১৫) তা ছিল ১:৯.৪। বর্তমান জাতীয় বেতন কমিশন (২০২৫) বিগত সময় থেকে অনেক কম অনুপাত (১:৮) সুপারিশ করছে, যা আগের থেকে সর্বনিম্ন।

আরও পড়ুন:  ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা ধরে বেতন কাঠামো দাবি

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বেতনের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের জন্য বাংলা নববর্ষ (বৈশাখী) ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া আগে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা পরিবহন ভাতা পেতেন। নতুন পে কমিশন এই ভাতা ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুপারিশ করেছে।

নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদিত হলে সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য হারে পেনশন বৃদ্ধি পাবে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগীদের জন্য ১০ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বয়সকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বয়স্ক পেনশনভোগীদের জন্য ৮ হাজার এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এখনই বাস্তবায়ন হচ্ছে না 
পে কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করবে না সরকার। সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। প্রতিবেদন হস্তান্তরের সময় গতকাল অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নই এখন পরবর্তী কাজ। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে, যে কমিটি বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *