ড. সালেহা কাদের
২০১৭ সালের ২৫ শে আগষ্ট মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের প্রবেশ করে। মানবিক কারণে তাদেরকে আশ্রয় দেয় বিগত সরকার। তাদেরকে প্রথমের টেকনাফে কুতুপালং এ রাখা হয় পরবর্তীতে তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনুরোধে সরকার সন্দ্বীপের সাগর গর্ব থেকে জেগে উঠা ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বিগত সরকার। স্থানীয়ভাবে ঠেঙ্গারচর অর্থাৎ সাবেক নামস্তি ইউনিয়ন যা কালক্রমে ভাসান চরে নামকরণ করা হয়। এরপরে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে সন্দ্বীপের এই ইউনিয়নটি। রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ন এবং জেগে ওঠা ভূমির উপর চোখ পড়ে নোয়াখালীর। সন্দ্বীপের এই ইউনিয়নকে নোয়াখালীর দাবি করে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গরা। এরমধ্যে ভাসান চরকে হাতিয়া একটি থানা হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে ২ জেলার মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে উঠে। ইতোমধ্যে সরকার ভাসান চরের ছয়টি মৌজা নোয়াখালীর হাতিয়া নয়, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্গত হবে বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ শাখা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কাছে চিঠি দিয়েছে।
সন্দ্বীপের মানুষের আন্দোলন:
২০১৭ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় সর্বপ্রথম সীমানা বিরোধ নিয়ে আলোচনায় বসে সন্ধিপিরা। এরপর পর্যায়ক্রমে মিটিং মিছিল আন্দোলন, মানববন্ধন দেশে-বিদেশে অনুষ্ঠিত হয়। আমিও এই আন্দোলনের সঙ্গে ছিলাম। এইভাবে ভালো লাগছে দীর্ঘদিন আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে। এটা প্রতিটি সন্দ্বীপবাসীর জয়। এর সঙ্গে যুক্ত সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই।
চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সাবেক ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন বর্তমান ভাসানচরকে সীমানা নির্ধারণ ব্যতীত হাতিয়া-নোয়াখালীর থানা ঘোষণার প্রতিবাদ ও সন্দ্বীপের মূল ৬০ মৌজা জরিপের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রী ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০১৯ সালের (১০ নভেম্বর) সকাল ১১টায় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া অডিটোরিয়ামে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। সন্দ্বীপের সাবেক ইউনিয়ন নেমস্তি বর্তমান (ভাসানচর) সহ জেগে উঠা সব ভূমি এবং ৬০ মৌজার মালিকানা স্যাটেলাইট জরিপের মাধ্যমে সন্দ্বীপবাসীকে বুঝিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম।
‘গত ১৩ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া নির্দেশনায় বলা হয়, “আন্তঃজেলা সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গঠিত কারিগরি টিম যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তার আলোকে ছয়টি মৌজা সন্দ্বীপ উপজেলায় অর্ন্তভুক্ত করতে প্রয়োনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হলো।”
২০১৬-১৭ সালের দিয়ারা জরিপ অনুসারে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের অদূরে বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা চর ‘ভাসানচরকে’নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায় অধিভুক্ত করা হয়। জেগে ওঠা ওই চরকে সন্দ্বীপের বলে দাবি করেন সেখানকার লোকজন। তারা আরএস ও সিএস জরিপের ভিত্তিতে ভাসানচরের বেশির ভাগ অংশ অতীতে দ্বীপটির ভেঙ্গে যাওয়া অংশ বলে দাবি করেন। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদনও হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর দুই পক্ষের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকে দায়িত্ব দেয়। এরপর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. নুরুল্লাহ নুরীকে প্রধান করে ১৯ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। কমিটি বিভিন্ন সময়ে উভয়পক্ষের যুক্ত-তর্কও শোনে। এ নিয়ে গঠিত কারিগরী কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন এবং সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে ভাসানচরের ছয়টি মৌজা সন্দ্বীপের অর্ন্তগত বলে প্রতিবেদন দেয়।
ঢাকায় যারা ভূমিকা রেখেছে:
বিদ্যুৎ জ্বালানি উপদেষ্টা ড. ফওজুল কবির খান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোশারফ হোসেন, নুরুল আক্তার, আলী হায়দার চৌধুরী বাবলু, মনিরুল হুদা বাবন, এড. মোশাররফ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব তপন বণিক, সাবেক সচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল, এডভোকেট আনোয়ারুল কবির, লে. জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, সাবেক দায়রা জজ আবু সুফিয়ান, গ্রামীণ ব্যবসা বিকাশের সাবেক এমডি সালেহা বেগম, শিক্ষাবিদ ড. সালেহা কাদের, সাংবাদিক ও সংগঠক কাজী ইফতেখারুল আলম তারেক, এ আর সোহেল, কাজী মঞ্জু, প্রফেসর হান্নানা বেগম, সাংবাদিক কানাই চক্রবর্তী, শামসুল কবির খান, মাইনুর রহমান, ব্যাংকার মোস্তফা কামাল পাশা, তাহের আহমেদ চৌধুরী বাদল, সেলিনা চৌধুরী,
এস এম যাহেদুল আলম সুমন, আনোয়ারুল আলম মঞ্জু, সাংবাদিক শাহাদাৎ হোসেন আশরাফ। এছাড়াও হাজারো মানুষ আমাদের সাথে মিটিং মিছিলে আন্দোলনে ছিলেন।
ঢাকায় যে দশটি সংগঠন সংগ্রামে লেগেছিল:
সন্দ্বীপ ডেভেলপম্যান্ট ফোরাম ঢাকা, সন্দ্বীপ সমাজ উত্তরা ঢাকা, বৃহত্তর মিরপুর সন্দ্বীপ সমাজ ঢাকা, সোনালী মিডিয়া ফোরাম ঢাকা, হরিশপুর ইউনিয়ন নদী সিকস্তি পুনর্বাসন কমিটি ঢাকা, সন্দ্বীপ ষ্টুডেন্ট ফোরাম ঢাকা, সন্দ্বীপ ফ্রেন্ডস সার্কেল এসোসিয়েশন, সন্দ্বীপ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, মুছাপুর বদিউজ্জামান হাই স্কুল প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ ও সাউথ সন্দ্বীপ হাই স্কুল প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ এর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, জাতীয় প্রেসক্লাব সহ চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, আরব আমিরাত ও নিউইয়র্কে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম সহ বিদেশেও সন্দ্বীপের প্রবাসী ভাইয়েরা এ আন্দোলনকে বেগবান করেছে সকলের প্রতি আমার সমান শ্রদ্ধা।







