সাকরাইনে রঙিন পুরান ঢাকা: কবে ও কীভাবে শুরু

আজ ১৪ জানুয়ারি পৌষ মাসের শেষ দিনে পুরান ঢাকায় পালিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব। কবে ও কীভাবে এই উৎসব শুরু হয়েছিল? কেন পুরান ঢাকায় পালিত হয়?

পৌষ মাসের শেষ দিনটি পঞ্জিকায় একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। গ্রাম বাংলায় দিনটি পালিত হয় ‘পৌষ সংক্রান্তি’ হিসেবে, যেখানে পিঠা-পুলির আয়োজনই মুখ্য। কিন্তু ঢাকার চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশেষ করে পুরান ঢাকার অলি-গলিতে এই দিনটি আসে এক মহাউৎসবের আমেজ নিয়ে, যার নাম ‘সাকরাইন’। গবেষকরা বলছেন, সাকরাইন মূলত ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব।

কুয়াশাভেজা শীতের আকাশ যখন হাজারো রঙিন ঘুড়িতে ঢেকে যায়, তখন বোঝা যায় সাকরাইন এসেছে। প্রতি বছর জানুয়ারির ১৪ তারিখ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গোটা পুরান ঢাকা মেতে ওঠে ঘুড়ি ওড়ানোর এক বর্ণিল আনন্দে।

‘সংক্রান্তি’ শব্দের অর্থ শেষ। সূর্য তার অক্ষ পরিক্রমায় মকর রাশির অংশে প্রবেশ করে বলে এটি ‘মকরসংক্রান্তি’ নামেও পরিচিত। ধারণা করা হয়, ‘সংক্রান্তি’ ঢাকাইয়া অপভ্রংশে সাকরাইন রূপ নিয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই এ উৎসব ভিন্ন ভিন্ন নামে উদযাপন করা হয়। বাংলায় দিনটি পৌষ সংক্রান্তি ও ভারতীয় উপমহাদেশে মকর সংক্রান্তি হিসেবে পরিচিত।

আরও পড়ুন:  দেশে দেশে মার্কিন আগ্রাসনের নজিরবিহীন যত ঘটনা

যেভাবে পালিত হয় সাকরাইন উৎসব

সাকরাইনের দিন সকাল থেকেই পুরান ঢাকার বাড়ির ছাদগুলোয় শুরু হয় এক অন্যরকম ব্যস্ততা। সাকরাইনের প্রধান আকর্ষণই হলো ঘুড়ি উড়ানো। কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী এমনকি বয়োবৃদ্ধরাও ঘুড়ি উড়ানোর এ উৎসবে শামিল হন। দিনভর ঘুড়ি উড়িয়ে সন্ধ্যায় বিভিন্ন আয়োজনে সবাই আনন্দে মেতে ওঠেন।

সাকরাইনের ঘুড়ি তৈরিতে রয়েছে শৈল্পিক নিদর্শন। বাহারি রঙের ঘুড়ি তৈরি করা হয় সাকরাইন উৎসবে। সেগুলোর মধ্যে গোয়াদার, চোকদার, মাসদার, গরুদান, লেজলম্বা, চারভুয়াদার, পানদার, লেনঠনদার, গায়েল ঘুড়িগুলো অন্যতম।

ঘুড়ি ওড়ানোর চেয়েও বড় উত্তেজনা হলো ‘সুতা মাঞ্জা’ দেওয়া। ঘুড়ি কাটাকাটির লড়াইয়ে জেতার জন্য সাধারণ সুতা যথেষ্ট নয়। কাঁচের মিহি গুঁড়ো, আঠা এবং রঙের মিশ্রণে সুতাকে ধারালো করা হয়, যাকে বলা হয় ‘মাঞ্জা’। যার মাঞ্জা যত ধারালো, আকাশে তার ঘুড়ির রাজত্ব তত বেশি। এই মাঞ্জা দেওয়া সুতা দিয়ে অন্যের ঘুড়ির সুতায় ঘষা দিলেই তা কেটে যায়।

সাকরাইনের কয়েকদিন আগে থেকেই অলি-গলিতে সুতা মাঞ্জা দেওয়ার ধুম পড়ে যায়। রঙিন সুতা শুকানো হয় রাস্তার ধারের খুঁটি বা ছাদের কার্নিশে। সাকরাইনের মূল আনন্দই হলো এই ‘ঘুড়ি কাটাকাটি’। একে অপরের ঘুড়ি কাটার জন্য চলে তুমুল প্রতিযোগিতা। যখনই কারো ঘুড়ি কাটা পড়ে, তখন চারপাশ থেকে সমস্বরে ভেসে আসে ‘ভোকাট্টা’ বা ‘বাকাট্টা’ ধ্বনি। এই চিৎকারের সাথে মিশে থাকে বিজয়ের আনন্দ। ঘুড়ি ওড়ানোর পাশাপাশি চলে সাউন্ড সিস্টেমে গান-বাজনা।

আরও পড়ুন:  ঢাকায় ভূমিকম্প অনুভূত

দুপুরের পর থেকে উৎসবের রঙ আরও গাঢ় হতে থাকে। তবে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে পুরান ঢাকা রূপ নেয় এক আলোকজ্জ্বল এলাকায়। অন্ধকার আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে আতশবাজির ঝলকানিতে। মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুনের খেলা বা ‘ফায়ার ব্রিদিং’ দেখায় তরুণরা। রঙিন ফানুস ওড়ানো হয় আকাশে। আতিথেয়তায় সেরা পুরান ঢাকার মানুষ সেদিন যেন মেহমানদারিতে আরও উদার হয়ে উঠে। পিঠা-পুলি, মোরগ পোলাও আর বিরিয়ানির গন্ধে ম ম করে পুরান ঢাকার অলি-গলি ।

সাকরাইন কেন পুরান ঢাকায়

প্রশ্ন আসতে পারে, সাকরাইন উৎসবটি কেন শুধু পুরান ঢাকাতেই এত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়? এর পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কারণ।

সাকরাইন উৎসব। স্ট্রিম ছবি

ঠিক কবে থেকে এই উৎসব পালন হয়ে আসছে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। তবে উৎসবটি শত বছরের পুরোনো বলে ধারণা করেন গবেষকরা। গবেষকরা দাবি করে, মুঘল আমল থেকেই ঢাকায় এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। তবে গবেষকদের কারো কারো মতে, ব্রিটিশ আমলে খান বাহাদুর আহসানউল্লাহর সময়েও উৎসবটি পালিত হতো।

আরও পড়ুন:  ভারতের স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

পুরান ঢাকায় সাকরাইন উদযাপনের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, সেখানের বাড়িগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা লাগোয়া। এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে সহজেই কথা বলা যায়, এমনকি লাফ দিয়ে যাওয়াও যায়। পুরান ঢাকায় দাঁড়ালে মনে হয় পুরো এলাকার ছাদ মিলে একটি বিশাল মঞ্চ তৈরি হয়েছে। এছাড়া, পুরান ঢাকার মানুষ বা ‘ঢাকাইয়া’রা তাদের ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখতে ভালোবাসে। তাই যুগ যুগ ধরে এখনো সাকরাইনের রঙে মেতে ওঠে পুরান ঢাকার আমেজপ্রিয় মানুষ। পুরান ঢাকায় এই বর্ণিল আয়োজন আমাদের ঐতিহ্যকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঁচিয়ে রেখেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *