বাংলাদেশে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এখনও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। শিক্ষাসামগ্রীর উচ্চমূল্য, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব এবং সমাজে বিদ্যমান নানা কুসংস্কার অনেক শিশুকেই তাদের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। একই সঙ্গে এসব শিশুর অভিভাবকেরাও প্রায়ই মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অন্যায়ের দায় চাপানোর মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। এই বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে সামাজিক উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম ‘শেখার সাথী’, যা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য সাশ্রয়ী, সহজলভ্য এবং আনন্দমুখর শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে।
‘শেখার সাথী’ মূলত বিশেষ শিশুদের জন্য নানা ধরনের শিক্ষাসামগ্রী তৈরি ও বিতরণ করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে সেন্সরি বুক, দৈনন্দিন কাজ শেখানোর উপকরণ (Activities of Daily Living), ভিজ্যুয়াল কার্ড, কমিউনিকেশন বোর্ড, আকৃতি ও রং মিলানোর কিটসহ আরও নানা কিছু। এসব উপকরণ বিশেষ করে অটিজম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা ও শেখার সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের উপযোগী করে তৈরি করা হয়। এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সাশ্রয়ী মূল্য। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর সামর্থ্যের মধ্যে রেখে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয়, যাতে আর্থিক অক্ষমতা শিশুদের শেখার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, আগে যেসব উপকরণ তাদের পক্ষে কেনা সম্ভব ছিল না, এখন ‘শেখার সাথী’র কারণে তা সংগ্রহ করা সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে ‘শেখার সাথী’র কার্যক্রম টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)–এর সঙ্গেও সরাসরি সংযুক্ত।
বিশেষ করে— এসডিজি ৪: মানসম্মত শিক্ষা — সকল শিশুর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, এসডিজি ১০: বৈষম্য হ্রাস — প্রান্তিক পরিবারগুলোর বাধা কমানো, এসডিজি ৩: সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ — অভিভাবকদের মানসিক চাপ কমানো ও শিশুর সামগ্রিক বিকাশে সহায়তা, এবং এসডিজি ৮: শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি — শিক্ষার্থীদের সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা— এসব দিক এই উদ্যোগে প্রতিফলিত হয়েছে। শুধু শিক্ষাসামগ্রী নয়, বিশেষ শিশুদের পরিবারগুলোর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতেও কাজ করছে ‘শেখার সাথী’। বাংলাদেশে এখনও অনেক অভিভাবক অবমাননাকর মন্তব্য ও সামাজিক দোষারোপের মুখে পড়েন। এসব নেতিবাচক মনোভাব বদলাতে উদ্যোগটি নিয়মিতভাবে অভিভাবকদের গল্প ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। এর মধ্য দিয়ে সমাজকে বোঝাতে চাওয়া হয়— প্রতিবন্ধিতা কোনো ব্যর্থতা নয়, এটি মানব বৈচিত্র্যেরই অংশ।
ঢাকার বিভিন্ন খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের সাতজন শিক্ষার্থীর হাত ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে এই সামাজিক উদ্যোগটি। তারা হলেন তাওফিক এলাহী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় রাবাবা হুমা বিস্বাস, প্রয়াস ইনস্টিটিউট অব স্পেশাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ মো. ফাইজুল কাবির রাব্বি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চৈতী রানী ঘোষ – ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় সাঈদ আনোয়ার শাহ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস সাদিয়া আখতার, ইডেন মহিলা কলেজ ফামিদা ফাইজ়া ত্রিবী , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘শেখার সাথী’র একজন প্রতিনিধি বলেন, “আমরা শুধু শিক্ষাসামগ্রী বিক্রি করি না, আমরা বিশ্বাস গড়ে তুলি শিশুদের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস এবং অভিভাবকদের প্রতি সমাজের বিশ্বাস। এই দুটো ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়া সম্ভব নয়।” বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘শেখার সাথী’র মতো শিক্ষার্থীনির্ভর সামাজিক উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে সহমর্মিতা, পরিকল্পিত পদক্ষেপ এবং সাশ্রয়ী সমাধান একত্র হলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জীবন বদলাতে পারে, পাশাপাশি বদলায় পুরো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও। সচেতন নাগরিকের দৃষ্টিতে এটি পরিষ্কার—ভালবাসা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ই পারে বিশেষ শিশুদের জন্য এক অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে।







