আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সমগ্র আমেরিকা মহাদেশের সঙ্গে ইউরোপের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সূচনা ঘটে ইতালীয় নাবিক ও অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলম্বাস–এর (আনুমানিক ৩১ অক্টোবর ১৪৫১ – ২০ মে ১৫০৬) অভিযাত্রার মাধ্যমে। তার ১৪৯২ সালের সমুদ্রযাত্রাই আমেরিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইতালির বন্দরনগরী জেনোয়াতে জন্মগ্রহণ করা কলম্বাস অল্প বয়সেই সমুদ্রযাত্রায় যুক্ত হন। আনুমানিক ১৪৭৭ সালের দিকে তিনি পর্তুগালের লিসবন শহরে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই তিনি আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পশ্চিম দিক দিয়ে এশিয়ায় পৌঁছানোর পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন।
১৪৮৩ সালে তিনি পর্তুগালের রাজা জন দ্বিতীয় (৩ মে ১৪৫৫ – ২৫ অক্টোবর ১৪৯৫) –এর কাছে তার পরিকল্পনা পেশ করেন। তাতে ছিল আটলান্টিক হয়ে পশ্চিমের দিকে ইন্ডিজে (এশিয়া) যাওয়ার পরিকল্পনা। রাজা পরিকল্পনাটি গ্রহণ না করায় কলম্বাস স্পেনের রাজা ফার্দিনান্দ (১০ মার্চ ১৪৫২ – ২৩ জানুয়ারি ১৫১৬) ও রানি ইসাবেলার (২২ এপ্রিল ১৪৫১– ২৬ নভেম্বর ১৫০৪) দ্বারস্থ হন। স্পেনের রাজদরবার শেষ পর্যন্ত তার প্রস্তাব অনুমোদন করে এবং তাকে অভিযানের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে এবং তাকে ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের ভাইসরয় হিসাবে নিয়োগ দেন।
✦ নতুন বিশ্বের দ্বারপ্রান্তেঃ
কলম্বাসের আটলান্টিক অভিযাত্রায় ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর পৃথিবীর মানচিত্রে এক নতুন ভূখণ্ডের আবির্ভাব ঘটলো। কলম্বাসের বহর আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে বর্তমান বাহামা দ্বীপপুঞ্জ–এর একটি দ্বীপে তাইনোতে পৌঁছায়। স্থানীয় জনগণ দ্বীপটিকে “গুয়ানাহানি”নামে ডাকত (যার অর্থ আনুমানিক “অগভীর জলের ভূমি/দ্বীপ)। কলম্বাস দ্বীপটির নামকরণ করেন সান সালভাদর (‘পবিত্র ত্রাণকর্তা’) ।
এই ঘটনাই ইউরোপীয়দের কাছে “নতুন বিশ্ব”(লাতিন: Mundus Novus)–এর আবিষ্কার হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। যদিও কলম্বাস নিজে আজীবন বিশ্বাস করতেন যে তিনি এশিয়ার উপকূলে পৌঁছেছেন।
১৪৯২ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি কিউবা দ্বীপে পৌঁছান এবং অঞ্চলটিকে স্পেনের অধীন বলে ঘোষণা করেন। তার দ্বিতীয় অভিযাত্রায়, ১৪৯৩ সালে, তিনি ক্যারিবীয় সাগরের ডোমিনিকা দ্বীপ দেখতে পান। রবিবারে দ্বীপটি প্রথম দেখার কারণে লাতিন শব্দ Dominicus থেকে এর নামকরণ করা হয় ডোমিনিকা।
হাজার বছর ধরে সভ্য পৃথিবীর আড়ালে থাকার পর সেদিন তা ধরা দিলো এক ইতালীয়-স্প্যানিশ নাবিকের চোখে। এক অসম্ভবের আহ্বানে তিনি ইউরোপ থেকে পাড়ি দিয়েছিলেন অসীম সমুদ্র। তার অদম্য অভিসারের নিকট সেই অসীম পরাজিত হয়েছে। তিনি আবিষ্কার করেছেন পশ্চিমের এক বিশাল মহাদেশ। সেই মহাদেশের নাম আমেরিকা। সেদিনের নতুন ভূখণ্ড আজ কালের আবর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর মহাদেশে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খাতে তারা রাজত্ব করছে পুরো পৃথিবীর উপর।
✦ কেন ‘আমেরিকা, ‘কলম্বিয়া’নয়?
যদিও ইউরোপীয়দের মধ্যে আমেরিকায় প্রথম স্থায়ী যোগাযোগ স্থাপনকারী ছিলেন কলম্বাস, মজার ব্যাপার হলো, পঞ্চদশ শতাব্দীতে কলম্বাসের আবিষ্কৃত মহাদেশটির নামকরণ করা হয় আরেক ইতালীর ফ্লোরেন্সের এক ধনী পরিবারে জন্ম নেয়া এবং পরবর্তীতে স্পেনীয় নাগরিক ও অভিযাত্রী আমেরিগো ভেসপুচি (৯ মার্চ ১৪৫৪ – ২২ ফেব্রুয়ারি ১৫১২)–এর নামে।
✦ এর প্রধান কারণ হলো—
আমেরিগো ভেসপুচি আমেরিকা মহাদেশের আবিষ্কর্তা নন। তার পূর্বে কলম্বাসসহ বেশ কজন অভিযাত্রিক আমেরিকার বুকে পদার্পণ করেছেন।
কিন্তু ভেসপুচিই প্রথম স্পষ্টভাবে দাবি করেন যে এই ভূমি এশিয়া (ভারত) নয়, বরং সম্পূর্ণ একটি নতুন মহাদেশ। ১৫০৭ সালে জার্মান মানচিত্রকার মার্টিন ভাল্ডজেমুলার তার মানচিত্রে এই ভূখণ্ডের নাম দেন “America”, যা ভেসপুচির নামের লাতিন রূপ থেকে নেওয়া।
✦ কলম্বাসের আগেও আমেরিকাঃ
যদিও আমেরিকা আবিষ্কারের কৃতিত্ব সাধারণত ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে দেওয়া হয়, কারন তিনি প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছান এবং ইউরোপীয়দের জন্য নতুন বিশ্বের পথ উন্মোচন করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, কলম্বাসের প্রায় ৫০০ বছর আগে, আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টাব্দে, ভাইকিং অভিযাত্রী লেইফ এরিকসন (Leif Erikson) উত্তর আমেরিকার নিউফাউন্ডল্যান্ড অঞ্চলে পৌঁছেছিলেন।
এছাড়া কিছু মুসলিম ও আরব নাবিকের আমেরিকায় আগমন সংক্রান্ত তত্ত্ব রয়েছে, তুর্কীয় ইতিহাসবিদ ইউসেফ ম্রুয়েহের মতে, ক্রিস্টোফার কলম্বাসেরও ৩০০ বছর আগে আরব মুসলিমদের আমেরিকায় পদার্পণ ঘটেছিল, তবে এগুলো এখনও মূলধারার ইতিহাসে প্রামাণ্যভাবে স্বীকৃত নয়।
✦ আমেরিকায় ভারতীয় অভিবাসন ✦
✦ বাঙালি মুসলিম ব্যবসায়ীরাঃ
উনিশ শতকের শেষভাগে (প্রায় ১৮৯০ সাল থেকে) বাংলার হুগলি ও আশপাশের অঞ্চল থেকে বহু বাঙালি মুসলিম ব্যবসায়ী যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তারা মূলত নিউ অরলিন্স শহরকেন্দ্রিক ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। সূচিকর্ম করা শাল, রুমাল ও বিছানার চাদর ছিল তাদের প্রধান পণ্য।
✦ পাঞ্জাবি কৃষিশ্রমিকরাঃ
১৯০৪ সালের পর থেকে ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চল থেকে বহু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে কৃষিশ্রমিক হিসেবে আসেন। আজও ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন পিচ এপ্রিকটের বাগানে গুরদ্বারাগুলো সেই অভিবাসনের স্মারক।
✦ হারলেমে বাঙালি পাড়াঃ
বিশ শতকের প্রথমার্ধে নিউইয়র্কের হারলেম এলাকায় বাঙালি মুসলিমদের একটি উল্লেখযোগ্য বসতি গড়ে ওঠে। হারলেম হল নিউ ইয়র্ক সিটির আপার ম্যানহাটনের একটি এলাকা। মূলত একটি ডাচ গ্রাম, আনুষ্ঠানিকভাবে ১৬৫৮ সালে সংগঠিত, নেদারল্যান্ডসের হারলেম শহরের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। এটি মোটামুটিভাবে পশ্চিমে হাডসন নদী; উত্তরে হারলেম নদী এবং ১৫৫তম স্ট্রিট; পূর্বে পঞ্চম অ্যাভিনিউ; এবং দক্ষিণে ১১০তম স্ট্রিট দ্বারা বেষ্টিত। বৃহত্তর হারলেম এলাকাটি আরও বেশ কয়েকটি এলাকাকে ঘিরে রেখেছে এবং পশ্চিম এবং উত্তরে ১৫৫তম স্ট্রিট, পূর্বে পূর্ব নদী এবং দক্ষিণে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বুলেভার্ড, সেন্ট্রাল পার্ক এবং পূর্ব ৯৬তম স্ট্রিট পর্যন্ত বিস্তৃত।
নোয়াখালীর নাবিক হাবিব উল্লাহ–এর মতো অনেক বাঙালি মুসলিম ১৯২০–৩০-এর দশকে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
✦ আমেরিকায় সন্দ্বীপের কলম্বাসঃ
আমেরিকায় ব্রিটিশ ভারতের চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের কে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন সে বিষয়ে নানা মত থাকলেও গাছুয়া ইউনিয়নে আনুমানিক ১৯১৬ সালের দিকে জন্ম নেয়া আব্দুল হাদিকে অগ্রগামী ভাবা হয়। বলা হয়ে থাকে তিনিই আমেরিকায় “সন্দ্বীপের কলম্বাস”। মার্কিন মুল্লুকে পা ফেলে বাঙালিদের যারা অভিবাসনের দিগন্ত উন্মোচিত করেছেন, আব্দুল হাদি তাদের মধ্যে তখন জীবন্ত কিংবদন্তি।
কাজের সূত্রে কোলকাতায় এসে জানতে পারেন আমেরিকায় সোনা পাওয়া যায়। সেই সোনার খোঁজে আমেরিকায় এসেছিলেন জাহাজে চেপে। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া আব্দুল হাদি জীবিকার তাগিদে প্রথম চাকরি নেন বিদেশি জাহাজে। সে জাহাজ নিউইয়র্কে পৌছালে তিনি ভিন্ন ভাষা,ভিন্ন চেহারার অপরিচিত মানুষের ঐ দেশে সাহস করে নেমে পড়েন। তার পর শুরু করেন টিকে থাকার লড়াই। বাস্তবে নিজে টিকে থেকেছেন এবং হাজারো বাংগালী নিয়ে ঐ মাটি জয় করেছেন। আব্দুল হাদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম পাড়ি জমানো বাংগালীদের অন্যতম ছিলেন। তরুন বয়সে অর্থ বিত্তের খোঁজে প্রথম পা রেখেছিলেন আমেরিকায়। এরপর, হয়ে গেছেন ইতিহাসের অংশ। উন্নত জীবনের খোঁজে যুক্তরাষ্ট্রের পথ দেখানো মানুষদের অন্যতম তিনি। বাংলা ভাষী মানুষ দিয়ে ঐ মাটি জয় করার চিন্তা করতেন তিনি। বাংগালীদের নিকট তিনি এ যুগের কলম্বাস হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
আব্দুল হাদি ১৯৩৭ সালের দিকে আমেরিকায় এসে আবার দেশে ফিরে যান এবং আবার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের (১৯৩৯ – ১৯৪৫) পর আমেরিকায় পুনরায় ফিরে আসেন। তিনি ও তার সমসাময়িক আবদুর রহমান সারেং (সন্দ্বীপ পৌরসভার সাবেক মেয়র জাফর উল্লাহ টিটুর দাদা), নির্মাণ শিল্প কিংবদন্তী গাছুয়ার নুরুল হক সুকানি, বাউরিয়ার তাহের আহমদ সারেং (সন্দ্বীপ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ শাহজাহান বি.এ. এর পিতা), রহমতপুরের কালামিয়া সুকানি সহ সমসাময়িকদের ব্ৰুকলিনে অবস্থানের কারণে সন্দ্বীপের অভিবাসীদের বিশাল অংশ জড়ো হতে থাকেন এখানে নিউইয়র্কে এবং এরই ধারাবাহিকতায় এক বৃহৎ সন্দ্বীপ কমিউনিটি গড়ে উঠে এখানে। আমেরিকায় তার আগমনের পর হতে যারা বৈধ- অবৈধ ভাবে কোন বাংগালী পৌছালে তাকে দিয়েছেন আশ্রয়। তার পর দিয়েছেন চাকরি অথবা জীবিকার খোঁজ। নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে গড়ে তোলেন বাংলা ভাষাভাষীদের আস্তানা। উন্নত জীবন আর বিত্ত বৈভবের জন্য বাংগালীদের আমেরিকায় পথ দেখিয়েছেন আব্দুল হাদি।
যুক্তরাষ্ট্রে তার সন্তান, নাতি নাতনী ও পরবর্তী প্রজন্ম সহ ১০০ জনের অধিক পরিবারের সদস্যরা করছেন, এদের সবাইকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান।
আমেরিকায় সন্দ্বীপের এই কলম্বাস ২০২০ সালের ২২ই মার্চ বার্ধক্যজনিত কারণে আনুমানিক ১০৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
তথ্য সূত্রঃ
* উইকিপিডিয়া
* Bengali Harlem and the Lost Histories of South Asian America – অধ্যাপক বিবেক বাল্দ, এমআইটি (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি), কেমব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
* সোহেল মাহমুদ, প্রবাসী সাংবাদিক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
* প্রবাসী টিভি
ছবিঃ সোহেল মাহমুদ ও প্রবাসী টিভি।







