২০২৬ সালে বিশ্বে ক্ষমতার মোড় ঘোরাতে পারে সন্ত্রাসবাদ-এআই

সন্ত্রাসবাদ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে তেমন উদ্বেগ ছিল না। কিন্তু চলতি বছরের শেষ দিকের কয়েকটি ঘটনা বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে, যা ২০২৬ সালে গিয়ে ফের বৈশ্বিক ভীতির কারণ হতে পারে।

দ্রুত বাড়তে থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতাও আগামী বছর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে পারে। নতুন বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম নির্ধারক হতে পারে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকারী তাইওয়ান। যেখানে চীন, রাশিয়ার সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের।

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণে এমন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। লিখেছেন গণমাধ্যমটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ব্রেট এইচ ম্যাকগর্ক। তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প (২০১৭-২১) ও জো বাইডেনের অধীনে জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কাজ করেছেন। ম্যাকগর্কের মতে, ওপরে উল্লিখিত বিষয়গুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সাল হতে যাচ্ছে বৈশ্বিক ক্ষমতার মোড় ঘোরানোর বছর।

সন্ত্রাসবাদ ফিরছে
বৈশ্বিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলো পুনরায় সক্রিয় হচ্ছে। গত মাসে অস্ট্রেলিয়ায় হানুক্কা উৎসব উদযাপনের সময় ইহুদিদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রে লস অ্যাঞ্জেলেসে ইংরেজি নববর্ষের রাতে ভিড়ের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণের একটি পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

২০১৯ সালের পর গত সপ্তাহে সিরিয়ায় প্রথমবারের মতো দুই আমেরিকান সেনাকে হত্যা করেছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সদস্যরা। জবাবে সিরিয়ায় আইএসের ৭০টির বেশি অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিষয়ক প্রধানও সম্প্রতি আইএসকে তাদের দেশে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারাও বলেছেন, সদস্য দেশগুলোতে গোষ্ঠীটি ফের গুরুতর হুমকি হয়ে উঠছে।

আরও পড়ুন:  পৃথিবীর সব মাকে আমার এই পুরস্কার উৎসর্গ করছি : রানি মুখার্জি

এসব ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী বছর সন্ত্রাসবাদ ঘিরে উদ্বেগ ফের চাউর হতে পারে।

এআই বিপ্লব

এআই বর্তমানে এমন অবস্থানে পৌঁছেছে, যা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নীতিতে পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রাখে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এআইকে অস্তিত্ব রক্ষার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছে। এটিকে তুলনা করা যেতে পারে স্নায়ুযুদ্ধের সময় মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর মতো প্রতিযোগিতার সঙ্গে।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল চীনের ‘ডিপসিক আর১’ নামের এআই মডেল। যদিও পরে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেনি। কিন্তু ডিপসিকের ঝাঁকুনির পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। যে প্রতিযোগিতা বছরের বাকি সময় ধরে দেখা গেছে।

এআইয়ের প্রভাব যেভাবে বাড়ছে, তাতে ২০২৬ সালে নীতি-সংক্রান্ত বিতর্ক এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে সংঘাত দেখা দিতে পারে। এটি হতে যাচ্ছে আগামীর বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করার অন্যতম প্রধান শক্তি।

‘মেন্যুতে’ তাইওয়ান
নতুন বিশ্বব্যবস্থার একটি সম্ভাব্য চিত্র দেখা গেছে সম্প্রতি চীনে হওয়া সম্মেলনে। যেখানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের শি জিনপিং ও উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন একে অপরকে আলিঙ্গন করছিলেন। পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এই চারটি দেশের লক্ষ্য একটি বিভক্ত বিশ্ব, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের তেমন প্রভাব থাকবে না।

কিন্তু এই সম্ভাব্য বিশ্বব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে তাইওয়ান। চীন অঞ্চলটিকে নিজেদের অংশ দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইপের (রাজধানী) প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছে। গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহ অনুমোদন দিয়েছেন। এর মধ্যে আছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। একই সঙ্গে এমন খবরও শোনা যাচ্ছে, ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ানে সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন।

আরও পড়ুন:  যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলে সরবরাহ বন্ধ: চীন

আগামীতে বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি বৈঠকের পরিকল্পনা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে আলোচনার প্রধান বিষয় হতে পারে তাইওয়ান। তাদের তৈরি সেমিকন্ডাক্টর চিপকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি খাতের প্রাণ বলা হয়। ফলে তাইপে ঘিরে অশান্তি তৈরি হলে, তা কেবল বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের ক্ষতিই ডেকে আনবে না; ঘুরিয়ে দেবে ক্ষমতার মোড়।

ইরানের জন্য কঠিন সময়
দেশটির জন্য ২০২৫ বছর ছিল ভয়াবহ। ২০২৬ আরও কঠিন হতে পারে। এতদিন তারা মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি ও প্রভাব দেখাত ‘প্রক্সি নেটওয়ার্কের’ মাধ্যমে (হিজবুল্লাহ, হামাস, ইরাকি মিলিশিয়া ও হুতি)। তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিও ছিল এর মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া ইসরায়েলকে মোকাবিলায় সিরিয়ার নেতা বাশার আল-আসাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখত তেহরান। কিন্তু ২০২৫ সালে প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো দুর্বল ও আসাদের পতনের মাধ্যমে হিসাবনিকাশ বদলে গেছে।

ইরান বর্তমানে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাজধানী তেহরানে সুপেয় পানির সংকটের কারণে বাসিন্দাদের স্থানান্তর ঘটছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি (৮৬) বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত। তিনি প্রায়ই অসুস্থ থাকেন, জনসমক্ষেও কম দেখা যায়। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরিও নেই। ফলে ২০২৬ সালে বিশ্ব রাজনীতিতে ইরানের উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। পারমাণবিক কর্মসূচি পুনঃস্থাপনের চেষ্টা হলে ইসরায়েল উল্টো হামলা চালাতে পারে।

ইসরায়েলের নির্বাচন
বর্তমান ইসরায়েল পরিচালিত হচ্ছে তাদের ইতিহাসের অন্যতম সংকীর্ণমনা জোট সরকারের অধীনে। ডানপন্থিদের আধিপত্য আরব দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ হাতছাড়া করছে। খুব কম সংখ্যক ইসরায়েলিই এমন সংকীর্ণ শাসকদের ভবিষ্যতে ক্ষমতায় রাখার পক্ষে।

২০২৬ সালে পরিস্থিতি বদলানোর একটি সুযোগ আসতে পারে। নির্বাচন হতে পারে ২৭ অক্টোবরের মধ্যে। তবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চাইলে এর আগে নির্বাচন দিতে পারেন। আগাম নির্বাচন নির্ভর করছে নতুন বাজেট পাসে সরকারের সফলতা ও ব্যর্থতার ওপর। এই নির্বাচনের ফলাফল দেশটির অনেক নীতির বদল আনতে পারে।

আরও পড়ুন:  গাজায় ইউএনআরডব্লিউএ’র ৮৯ কর্মী নিহত

ইউরোপে যুদ্ধের ক্লান্তি
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ পঞ্চম বছরে পা দেবে। সাধারণত এত দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধের পর দুই পক্ষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতি রূপান্তরের মুহূর্ত বা শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে নিয়ে যায়।

আগ্রাসনের শুরুতে ভ্লাদিমির পুতিনের লক্ষ্য ছিল কিয়েভ দখল করা। লক্ষাধিক মানুষ হতাহতের পর তাঁর সেনারা এখনও পূর্ব ইউক্রেনের সীমান্তের কাছে আটকে আছে। এ অবস্থায় পুতিন ও জেলেনস্কির কেউই যুদ্ধ শেষ করার ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছেন না। অন্যদিকে, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তাদের এই উদ্যোগ ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে যে ফলাফল বয়ে আনুক না কেন, তা আগামীতে ওয়াশিংটনের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ভেনেজুয়েলা ও ট্রাম্পের ভাবমূর্তি
বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য নানামুখী চাপের পরিবেশ তৈরি করছে। হোয়াইট হাউসের ধারণা, মাদুরো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে রাশিয়া বা অন্য কোথাও আশ্রয় নেবেন। কিন্তু বাস্তবে এমন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

কেবল অর্থনৈতিক চাপ ও হুমকি দিয়ে মাদুরোর মতো নেতাদের উৎখাতের উদাহরণ বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। তবে তাঁর ক্ষমতায় থাকা না-থাকাটা ২০২৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাবমূর্তি নির্ধারণ করে দিতে পারে। মাদুরো ক্ষমতায় থাকলে ‘কাজের চেয়ে কথার জোর বেশি’ এমন উপাধি পেতে পারেন ট্রাম্প। আর ক্ষমতা হারালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রভাব নিয়ে খুব কম মানুষই সন্দেহ প্রকাশের সুযোগ পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *