চন্দন কুমার লাহিড়ী
২……
গাড়িয়াল ভাই এর কথা কী আপনাদের মনে আছে। ওকি গাড়িয়াল ভাই, কত রবো আমি পন্থের পানে চায়া রে। হ্যাঁ, “গাড়িয়াল ভাই” এর বিখ্যাত সেই গান অনেকেরই হৃদয়ে থাকার কথা, বিশেষ করে ভাওয়াইয়া গান ও লোকসংগীতের ভক্তদের কাছে এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও আবেগঘন গান। যা গাড়িয়ালের (গাড়িয়াল মানে হচ্ছে যে ব্যক্তি গরুর গাড়ির চালক) দুঃখ, বিচ্ছেদ ও জীবনের গভীর অনুভূতি প্রকাশ করে। তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবনে- জলে নৌকা, আর স্থলে ছিল গরুর গাড়ির আধিক্য। আঁকাবাঁকা গ্রামীণ সড়ক, এবড়োথেবড়ো, উচু নিচু। হেলে দুলে পাল্কির মত রিদম তুলে চলে গরুর গাড়ি। সেইসাথে উদাসী মনে গাড়িয়ালের উদাস করা, হেড়ে গলার গান। বিখ্যাত সংগীত শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের গাওয়া এই গানটি এবং এর সাথে জড়িত গল্পগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষকে নাড়া দিচ্ছে, যা আজও ভাওয়াইয়ার সুরের মাধ্যমে ফিরে আসে। এই গানটি শুধু একটি গান নয়, এটি উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতি ও জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আজও মানুষকে সেই দিনের অনুভূতি ফিরিয়ে দেয়। লোকায়ত বা তিস্তাপাড়ের নারীর মন যেমন গাড়িয়ালের জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠে ঠিক তেমনি সেই নারীর জন্য প্রেমিক হৃদয় গানের অন্যসুরে ঝড় তোলে।
তিস্তা নদীর চিকন বালা রে, জলপাই ধরে ঝোকা ঝোকা,
আমার পরাণ ভরি, ধরি রে, (আহা) ধরি রে, (আহা) ধরি রে,
তিস্তা নদীর চিকন বালা রে, জলপাই ধরে ঝোকা ঝোকা
তিস্তা নদীর চিকন বালা হচ্ছে- তিস্তা নদীর পাড়ের সুন্দরী বা লাজুক মেয়েকে বোঝানো হচ্ছে, যার রূপ নদী ও জলপাইয়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে। অন্যদিকে
জলপাই ধরে ঝোকা ঝোকা হচ্ছে – জলপাই গাছের ডাল যেমন ঝুঁকে থাকে, তেমনি এই বালাও যেন ভালোবাসার ভারে বা লাজে ঝুঁকে আছে। এই প্রেমময়তার যে মনন তা গড়ে উঠেছে তিস্তা পাড়ের জীবন ঘিরে। আর এই তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবন মানেই নদীর সঙ্গে এক অবিচ্ছিন্ন সহাবস্থান। ভাঙন, বাঁচা,মরা, হারানো আর নতুন করে দাঁড়ানোর দীর্ঘ ইতিহাস বয়ে চলে তিস্তার স্রোতের সঙ্গে সঙ্গে। এই নদী শুধু জলধারা নয়—এ এক চলমান জীবনকথা। বছরের পর বছর ধরে ইতিহাসের ভার কাঁধে নিয়ে সে বয়ে চলে নির্ভরতার ঘানি টেনে, কখনো আশীর্বাদ হয়ে, কখনো অভিশাপ হয়ে। তিস্তা দেখেছে প্রেমের জন্ম, দেখেছে বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস। দেখেছে মানুষের হাহাকার, মৃত্যুর নীরব ছায়া, আর জনপদের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় স্বপ্নগুলো। বানের পানির মতোই তার আসা-যাওয়া—হঠাৎ, প্রবল, অবাধ। নদী ঘিরে জনপদের জীবন, আবার সেই জনপদকেই গ্রাস করার নির্মম ক্ষমতাও তার আছে। যে অর্থে নদীর গতি, সে অর্থে আজ তাকে প্রায় মৃতপ্রায় বললেও ভুল হবে না; তবু তার ধারা এখনো বহমান—নিস্তব্ধ নয়, নিঃশেষও নয়। নদীর দুই পাড়ে গড়ে ওঠা বসতি, অস্থায়ী আবাস, ভাঙা ঘর আর নতুন স্বপ্ন—সবকিছুই তিস্তাকে ঘিরে।
মানুষের জীবনযাপন, জীবিকার ব্যস্ততা, আশা-নিরাশার হিসাব—সবই নদীমুখী। ঘাট, মোহনা, বাঁক আর চর আজও নানা ব্যঞ্জনায় মানুষের জীবনে গল্পের স্বপ্নালোক তৈরি করে। পাল তোলা নৌকা হয়তো বাস্তব থেকে হারিয়ে গেছে, কিন্তু স্মৃতিতে, গল্পে, কবিতায় আর তিস্তা পাড়ের মানুষের মননে সে এখনো জীবিত। শচীন কর্তার গানের সুরে আজও ভেসে আসে, সেই ডাক— “কে যাসরে ভাঁটি গাঙ বাইয়া?” এই গানের ভেতরেই যেন তিস্তার পাড়ের মানুষের দীর্ঘশ্বাস, তাদের যাত্রা, আর নদীর সঙ্গে অমোচনীয় এক আবেগী বন্ধনের ইতিহাস লেখা থাকে। তিস্তার পাড়ের মানুষের জীবনে নদী যেমন শ্রম, ক্ষুধা আর টিকে থাকার অনিবার্যতা, তেমনি তা স্পর্শ, উষ্ণতা আর সম্পর্কের ভাষাও। নদীর পার যেমন ভাঙে–গড়ে, তেমনি মানুষের শরীর ও আবেগেও জাগায় এক আদিম টান—যেখানে জীবনের ধারাবাহিকতা প্রেমে, আকাঙ্ক্ষায় ও সংলগ্নতায় প্রকাশ পায়। দেবেশ রায়ের তিস্তা যেমন মানুষকে ইতিহাসের সঙ্গে বেঁধে রাখে, অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস তেমনি নদীকেন্দ্রিক জীবনের সংকট সম্ভবনার পাশাপাশি শরীরী অনুভবকে সামনে আনে—নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে মানুষ শুধু বাঁচে না, অনুভব করে; জল, মাটি আর মানুষের শরীর সেখানে একে অন্যের সঙ্গে মিশে যায়। সেই ধারাবাহিকতায় অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাস একটি নদীর নাম উন্যাসের উপমা দিলেন এভাবে- –
কিশোরের জালে অনেক মাছ উঠিয়াছে।
বাঁশের গোড়ায় পা দিয়া, জলের হাতায় টান মারিয়া সে বুক চিতাইল, তার পিঠ ঠেকিল বেদিনীর বুকে। বেদিনী তরুণী, স্বাস্থ্যবতী। তার স্তন দুটি দুর্বিনীতভাবে উচাইয়া উঠিয়াছে। তার কোমল উন্নত স্পর্শ কিশোরের সর্ব শরীরে বিদ্যুতের স্পর্শ তুলিল। … … বেদিনী এক হাত ডান বগলের তলায় ও অন্য হাত বাম কাঁধের উপরে দিয়া বুক পর্যন্ত বাড়াইয়া কিশোরকে নিজের বুকে চাপিয়া ধরিল। অবলম্বন পাইয়া কিশোর পড়িয়া গেল না, কিন্তু দিশা হারাইল …







