ঢাকা-দিল্লির মধ্যে উত্তেজনা প্রশমন চায় বন্ধু রাষ্ট্র জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। বর্তমানে তা এযাবৎকালের সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পার করছে। এখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন বন্ধু রাষ্ট্রগুলো। তারা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার উত্তেজনার অবসান চায়। তবে এখন পর্যন্ত এ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছে জাপান ও রাশিয়া। বাকি দেশগুলো আলোচনা ও প্রশ্নের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাশা জানিয়েছে।

গত বছরের ২২ ডিসেম্বর ঢাকায় জাপানের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি ঢাকা ও দিল্লির উত্তেজনায় টোকিওর অস্বস্তির কথা ইঙ্গিত করেন। গত সোমবার ঢাকায় রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন বলেছেন, ঢাকা-দিল্লির মধ্যে যে কোনো ধরনের উত্তেজনা যত দ্রুত সম্ভব কমাতে হবে।

কানেক্টিভিটির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নিয়ে ইওয়ামা কিমিনোরি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধু হিসেবে জাপান বিশ্বাস করে, অভিন্ন বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে দুই দেশের সম্পর্ক স্থাপন জরুরি, যাতে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি তৈরি করা যায়।

গত সোমবার বাংলাদেশ-ভারত উত্তেজনাপূর্বক সম্পর্ক নিয়ে ঢাকায় রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন বলেন, এটি শুধু দুই দেশের নয়; পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলপ্রসূ সমাধান না এলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে পুরো অঞ্চলে। তিনি বলেন, রাশিয়ার অবস্থান পরিষ্কার– যে কোনো ধরনের উত্তেজনা যত দ্রুত সম্ভব কমাতে হবে।

সম্প্রতি রাশিয়া ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে আলেকজান্ডার খোজিন বলেন, ‘মস্কো-দিল্লির বৈঠকে শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ নিয়ে কথা হয়েছে। আমরা দুই দেশের উত্তেজনা কমানোর পক্ষে।’

গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে উভয় দেশ পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছে, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং সীমান্তে লোক ঠেলে দেওয়াসহ সংঘাতেও লিপ্ত হয়েছে। ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে অসত্য খবর প্রকাশের জেরে আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এরপর দেশটির গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে ছড়ানো অপতথ্যের কিছুটা লাগাম টানে দিল্লি।

আরও পড়ুন:  বিয়ে করলেন উপস্থাপিকা মৌ

গত বছরের ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের ঢাকা সফর দিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়। কিন্তু চীন দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সফর শুরু করেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এর পর থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আর কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।

চায়ের আড্ডায় প্রায় সব বন্ধু রাষ্ট্রই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক চায় বলে জানিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। সমকালকে তিনি বলেন, সবাই বুঝতে পারছে, সম্পর্ক এভাবে চলতে থাকলে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। তাই সমাধানকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশ। এখানে অস্থিতিশীলতা পুরো ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত উস্কানি দিলে তারাও চায় বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকুক। একাধিক বিবৃতিতে তারা এ কথা বলেছেও।

ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষণা অনুযায়ী, নয়াদিল্লির বেশির ভাগ ক্ষোভ ব্যক্তি ড. ইউনূসের ওপর। এর কারণ, পশ্চিমাদের সঙ্গে ইউনূসের দীর্ঘ সুসম্পর্ক এবং সেই পরিসরে ভারতের বিরুদ্ধাচরণ। ফলে দূরত্ব আর কমেনি। ইউনূস-মোদি বৈঠকের জন্য বারবার ঢাকার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান হয়েছে। নিরাপত্তার অজুহাতে বাংলাদেশিদের ভিসা স্থগিত করায় ক্ষোভ বাড়ে জনমনে। আন্তঃসীমান্ত ট্রেন সংযোগ স্থগিত করায় দুই দেশের বাণিজ্য এবং জনগণের সম্পর্কে ভাটা পড়েছে।

ভারতীয় সাবেক এক কূটনীতিকের নাম প্রকাশ না করে গবেষণায় ক্রাইসিস গ্রুপ জানায়, হাসিনা-যুগ সমাপ্তির পর বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া নিয়ে দ্বিধায় ছিল ভারত। নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা বললেও শক্তি দেখানোর পক্ষে ছিল সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। চেষ্টা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা ক্ষুণ্ন করার।

দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে গবেষণা সংস্থাটি বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক সম্ভবত স্বাভাবিক করবে না ভারত। তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে ভারতের। এ ক্ষেত্রে এখন থেকে বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোটার আকৃষ্ট করতে ভারত বিরোধিতা পরিহার করতে হবে। আর ভারতকে আওয়ামী লীগ নির্ভরশীলতা থেকে সরে আসতে হবে।
ঢাকায় কর্মরত একজন পশ্চিমা রাষ্ট্রদূত নাম না প্রকাশের শর্তে সমকালকে বলেন, ক্রাইসিস গ্রুপের দেওয়া গবেষণাগুলো ইউরোপ গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। বলা যায়, তাদের গবেষণায় আমাদের মতামতের প্রতিফলনও থাকে। নিঃসন্দেহে ঢাকা-দিল্লির বৈরী সম্পর্ক আমাদের মাথাব্যথার কারণ। ভূরাজনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি এখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত।

আরও পড়ুন:  ড. ইউনূসের সঙ্গে সপরিবারে সাক্ষাৎ করলেন তারেক রহমান

উদাহরণের প্রসঙ্গ টেনে ওই কূটনীতিক বলেন, ধরা যাক, বাংলাদেশে আমার দেশের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ রয়েছে। তারা ভারত থেকে কাঁচামাল আমদানি করত। এখন দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনে শুধু তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, উভয় দেশই অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হারাচ্ছে। আবার ধরা যাক, আরেক ব্যবসায়ী বাংলাদেশে বিনিয়োগই করেছিল দক্ষিণ এশিয়ার জনবহুল বাজারকে মাথায় রেখে। বাংলাদেশ-ভারত বৈরী সম্পর্কের কারণে ওই বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সম্পর্কগুলো দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বড় না হলেও এর প্রভাব ইউরোপে পড়েছে, পড়ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। ট্রাম্প প্রশাসন অন্য দেশে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে হস্তক্ষেপের নীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। গণতন্ত্র রপ্তানি করার বদলে এখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার ওপর মনোযোগ দিচ্ছে তারা। ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের এ নীতির পরিবর্তনের কারণে দেশগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব গড়তে হিমশিম খেতে হচ্ছে মার্কিন কূটনীতিকদের। বাংলাদেশেও একই সংকটে রয়েছে তারা। ফলে বাংলাদেশ বিষয়ে আগের নীতিতে ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে ওয়াশিংটন। আগে তারা দিল্লির চোখে বাংলাদেশকে দেখত। ফলে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের উন্নয়ন চায়।

ঢাকায় কর্মরত আরেকজন রাষ্ট্রদূত সমকালকে বলেন, বাংলাদেশ-ভারত বৈরী সম্পর্ক ভূরাজনৈতিক হিসাব পাল্টে ফেলছে। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, কী কী ঘটছে, কার কারণে কী হচ্ছে। তবে সব তর্কের অবসান ঘটিয়ে দুই দেশের সুসম্পর্ক প্রয়োজন। বিষয়গুলোতে আমরা দুই দেশকে খোলাখুলি কথা বলতে উৎসাহিত করি। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাটা বোঝা ও সমাধান করা যায়।

চরমপন্থি দলগুলো যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, এ কারণে বন্ধু রাষ্ট্রগুলো ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েনের অবসান চায় বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান। সমকালকে তিনি বলেন, নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর সম্পর্কের অবনতি হওয়া খুব খারাপ লক্ষণ। এটি দুর্ভাগ্যজনক ও উদ্বেগজনক। এ রকম চলতে থাকলে দুই দেশে চরমপন্থিদের উল্লম্ফন ঘটবে এবং নির্বাচনে এর অশুভ প্রভাব পড়বে। তখন নির্বাচিত সরকার এলেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন অব্যাহত থাকতে পারে।

আরও পড়ুন:  দেশের অর্থনীতি পাল্টাতে চট্টগ্রাম বন্দরই আমাদের ভরসা : প্রধান উপদেষ্টা

উত্তরণের উপায় সম্পর্ক সাবেক এ কূটনীতিক বলেন, এ মুহূর্তে সম্পর্কের অবনতি রোধে করণীয় হচ্ছে দায়িত্বশীলদের দায়িত্বশীল আচরণ। নিজ উদ্যোগে সম্পর্কের অবনতি কীভাবে রোধ করা যায়, তাতে সচেষ্ট হতে হবে। সর্বোচ্চ সদিচ্ছা দেখাতে হবে। আমরা যেন উস্কানিতে পা না দিই। পাশাপাশি উস্কানিমূলক পরিস্থিতিও তৈরি না করি।

সম্পর্ক যেন অস্বাভাবিক না হয়
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে অর্থ উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সরকার কাজ করছে। ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক খুব যে খারাপ হয়ে গেছে, তা নয়। তবে আমরা চেষ্টা করছি কোনোভাবে যেন অস্বাভাবিক না হয়। বাংলাদেশ কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গেই তিক্ত সম্পর্ক চায় না।

এক প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাণিজ্য ও রাজনীতিকে আলাদাভাবে দেখা উচিত। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু স্পর্শকাতর বিষয় বা বাগাড়ম্বর থাকলেও অর্থনৈতিক স্বার্থে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।

অর্থ উপদেষ্টা জানান, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছেন। তিনি নিজেও ভারতের হাইকমিশনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছে, সম্পর্ক উন্নয়নে তারাও কাজ করছে। বাইরে হয়তো শোনা যায়, কি না কি হয়ে যাচ্ছে, তবে পরিস্থিতি এতটা খারাপ পর্যায়ে যায়নি। তবে কিছু কিছু বক্তব্য আছে, এগুলো বন্ধ করা কঠিন।

কিছু শক্তি ভারতবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে– এমন প্রশ্নে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘এগুলো আমাদের জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করছে। এগুলো আমাদের জাতীয় অভিব্যক্তি নয়।’
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সরকার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে কোনো ঝামেলা চায় না। বাংলাদেশ আঞ্চলিক উন্নয়নে বিশ্বাস করে। তাই ভারত, ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।

প্রধান উপদেষ্টা কি ভারতের সঙ্গে কথা বলেছেন, এমন প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রধান উপদেষ্টার বন্ধুবান্ধব আছে, তাদের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাদের সঙ্গেও কথা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *