লন্ডন ডায়েরি: প্রথম শ্বাস, প্রথম অনুভূতি

ডা. মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান 
১ম পর্ব:
২১শে নভেম্বর ২০২৫ ইং – লন্ডনে প্রথম শ্বাস, প্রথম অনুভূতি 
আজ ভোর প্রায় চারটার দিকে গ্যাটউইক বিমানবন্দরে নামতেই হিমেল ঠান্ডা হাওয়া আমাকে আলতো ছুঁয়ে গেল। মনে হলো লন্ডন তার শীতল স্পর্শ দিয়ে আমার আগমনকে নিঃশব্দে স্বাগত জানাচ্ছে। কুয়াশায় ভেজা নিস্তব্ধ ভোরের সেই মুহূর্তে মনটা এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ভরে গেল—নতুন জায়গা, নতুন বাতাস, আর এক ধরনের অজানা উত্তেজনা।
ইমিগ্রেশন হলের দিকে হাঁটতেই আবার বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়াল। লাইন পেরিয়ে অফিসারের সামনে বসা মাত্রই শুরু হলো প্রশ্নের ঝড়। সব ডকুমেন্টস দেখালাম, যথাসাধ্য ব্যাখ্যাও দিলাম; তারপরও তার চোখে যেন সন্দেহের ছায়া ঘন হতে লাগল। হঠাৎই আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন ডিটেনশনের কাগজ। তিনি পাসপোর্ট নিয়ে কোথায় যেন অদৃশ্য হলেন।
সেই মুহূর্তে বুকের ভেতরটা হঠাৎই শূন্য হয়ে গেল—অজানা এক দুশ্চিন্তায় মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
দ্রুততার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলাম বন্ধু ডা. নজরুলের সঙ্গে। তার পরামর্শ অনুযায়ী পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে থাকলাম। অফিসারের কড়া দৃষ্টি, প্রশ্নের পর প্রশ্ন—অফিসিয়াল পাসপোর্ট, ট্যুরিস্ট ভিসা, আর চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট GO—সবকিছুই যেন আরও জটিল করে তুলছিল বিষয়টিকে। কারণ ট্যুরিস্ট ভিসায় ইংল্যান্ডে চিকিৎসা নেওয়া নিয়মবিরুদ্ধ, সেটাও তিনি বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন।
তবুও স্থির থাকার চেষ্টা করলাম। ধৈর্য ধরে বুঝাতে লাগলাম—আমি সত্যিই ট্যুরিস্ট; শুধু বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় GO সংগ্রহে NHS-এর সহযোগিতা নিয়েছি। দীর্ঘ কথোপকথন, ভদ্রতা, আর ভেতরের নীরব দোয়ায় অবশেষে অফিসারের মুখে ফুটে উঠল একরাশ হাসি।
তিনি পাসপোর্ট হাতে দিয়ে বললেন— “You may go now.”
সেই মুহূর্তে মনে হলো—লন্ডনের শীতল সকালটা যেন হঠাৎই একটু উষ্ণ হয়ে উঠেছে।
ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বন্ধুর পরামর্শে একটি কফিশপে গিয়ে বসলাম। গরম কফির ধোঁয়া আর লন্ডনের কনকনে হাওয়া—দু’য়ের মিশ্রণে প্রথম দিনের সূচনা যেন ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিল।
প্রায় আধাঘণ্টা পরে এসে হাজির হল বন্ধু ব্যারিস্টার নূরসাফা। শীত নিবারণে সে তার জ্যাকেটটা হাতে ধরিয়ে দিল—যেন বন্ধুত্বের উষ্ণতা ঠান্ডার ভেতরেও এক মমতার কম্বল হয়ে দাঁড়াল। গাড়িতে করে তার বাসায় পৌঁছাতেই অনুভব করলাম—বিদেশে বন্ধুর উপস্থিতি কত বড় আশীর্বাদ!
২য় পর্ব:
২১শে নভেম্বর — লন্ডনের প্রথম দিনের আরেকটি অধ্যায়
সকাল ঠিক ৯টা ৩০ মিনিট। গ্যাটউইক বিমানবন্দরের কাঁচঘেরা শীতল পরিবেশ থেকে বের হতেই বন্ধু নুরসাফার উষ্ণ অভ্যর্থনা। তার গাড়িতে বসে বারডেট অ্যাভিনিউ, ওয়েস্ট ক্লিফের দিকে যাত্রা শুরু হলো। জানালার ওপাশে ধূসর আকাশ আর ঠান্ডা বাতাস যেন লন্ডনের নিজস্ব ভাষায় বলছিল—“স্বাগতম।”
বাসায় পৌঁছে তাড়াহুড়া করে নাস্তা সেরে নিলাম। বিশ্রামের সময় ছিল না—দিনটিকে পুরোপুরি ছুঁয়ে দেখার তীব্র ইচ্ছে কাজ করছিল। নুরসাফা নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাকে নিয়ে বের হলেন লন্ডনের উদ্দেশ্যে। প্রায় দেড় ঘণ্টার যাত্রা শেষে আমরা পৌঁছালাম ইলফোর্ডে। গাড়ি থেকে নামতেই মনে হলো হাড়কাঁপানো ঠান্ডা শরীরের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে যাচ্ছে—মানুষ সত্যিই কি মাইনাস তাপমাত্রায় জমে যেতে পারে, সে অনুভূতি যেন বাস্তব হয়ে উঠেছিল।
তার অফিসে ঢুকতেই পরিবেশটা উষ্ণ হয়ে উঠল। সহকর্মীদের আন্তরিক হাসি আর বন্ধুর পরিচয়ে পরিচিত হওয়া—সব মিলিয়ে নতুন জায়গায়ও যেন এক ধরনের পুরোনো স্বস্তি অনুভব করলাম।
এরপর বাস নাম্বার ২৫-এ চড়ে রওনা দিলাম হোয়াইটচ্যাপেলের দিকে। বাসের জানালা দিয়ে তাকালে মনে হচ্ছিল শহরের প্রতিটি রাস্তা যেন নিজের গল্প বলছে—ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের বুকে লুকিয়ে থাকা অগণিত অভিজ্ঞতার গল্প। মাঝেমধ্যে বন্ধুর ফোন বেজে উঠছিল, যেন পথ হারিয়ে ফেললে সে পাশে থাকবে—এই আশ্বস্ত অনুভূতি ভ্রমণে বাড়তি নিরাপত্তা যোগ করছিল।
হোয়াইটচ্যাপেলে নেমে ঢুকে পড়লাম একটি সিলেটি রেস্টুরেন্টে। গরম ধোঁয়া ওঠা হালিম, সাথে তান্দুরি রুটি—ঠান্ডার মধ্যে এই খাবারের স্বাদ হৃদয় পর্যন্ত উষ্ণ করে দিল। আশপাশের মানুষের মুখে বাংলা, দোকানের সাইনবোর্ডে বাংলা লেখা—মনে হলো ব্যস্ত লন্ডনের মাঝে যেন আরেকটি ক্ষুদ্র বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে। দূরদেশে থেকেও নিজের দেশের গন্ধ পাওয়া—এ এক অদ্ভুত শান্তি।
বাজারে হাঁটার সময় ৫ পাউন্ডের হাতমোজা কিনে নিলাম। তবু হাহাকার করা ঠান্ডা বাতাস বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল—এটাই লন্ডনের প্রকৃত রূপ, নিরাবরণ কনকনে।
রেস্টুরেন্ট থেকে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম ইস্ট লন্ডন মসজিদে। রাস্তার দু’ধারে মানুষের ব্যস্ততা, দোকানের গন্ধ, আর সাঁই সাঁই করা ঠান্ডা মিলে এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করেছিল। মসজিদে এসে আসর ও মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে কুশল বিনিময়ে অবাক হয়ে দেখলাম—প্রায় ৯০% মুসল্লিই সিলেটি ভাই। মনে হলো, লন্ডনের মাঝেও যেন নিজের মানুষদেরই খুঁজে পেলাম—যেন দূরদেশেও এক টুকরো নিরাপদ আশ্রয়।
বন্ধুর পরামর্শমতো আবার বাস নাম্বার ২৫-এ চড়ে ফিরলাম ইলফোর্ডে। আকাশে তখন হালকা অন্ধকার নেমেছে, বাতাসের ঠান্ডা আরও শাণিত। তবু মনে এক ধরনের তৃপ্তি—একদিনেই এত অভিজ্ঞতা, এত মানুষের মুখ, এত অনুভূতির ভিড়।
দিনটি শেষ হয়ে গেলেও মনে রয়ে গেল এর প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি মুহূর্ত। ভ্রমণের সৌন্দর্য হয়তো এখানেই—নতুন পথ, নতুন মানুষ আর নতুন অভিজ্ঞতার নিঃশব্দ স্পর্শই তৈরি করে স্মৃতির অবিনশ্বর বুনন।
৩য় পর্ব:
ইংল্যান্ডে শীতের শুক্রবার — একদিনের ভ্রমণ ডায়েরি
লন্ডনে শুক্রবার মানেই অন্য দিনের মতোই ব্যস্ত কর্মদিবস। দিনটি শুরু হলো রিতা ভাবির আন্তরিক আপ্যায়নে। ভোরের হাড়–কাঁপানো ঠান্ডার মাঝেও তিনি সযত্নে আমার জন্য নাস্তা প্রস্তুত করেছিলেন। এখানে কাজের লোক পাওয়া গেলেও ঘণ্টাপ্রতি ১০–১২ পাউন্ড, অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দুই হাজার টাকা—তাই অধিকাংশ পরিবারই নিজেদের কাজ নিজেই করে থাকেন। তবুও সালমা ভাবির এই যত্ন আর আপন অনুভূতি সকালটিকে বিশেষভাবে উষ্ণ করে তুলল।
বাইরে তখনো তাপমাত্রা মাইনাসে। কুয়াশা খুব বেশি না থাকলেও ঠান্ডা বাতাসের তীব্রতায় সকালবেলা বের হওয়া সম্ভব হয়নি। দুপুরে আবহাওয়া খানিকটা সহনীয় হলে গোসল সেরে রওনা দিলাম এসেক্স মসজিদের উদ্দেশে। উল্লেখ্য—এখানে শীতকালের তীব্রতার কারণে অনেকে সপ্তাহে মাত্র দুই-তিন দিন গোসল করেন।
জুমার নামাজে পৌঁছে যেন নিজের মানুষের মাঝে ফিরে এলাম। দেখা হলো প্রিয় বন্ধু ডা. সবুজ, সাফার বন্ধু ব্যারিস্টার জাফর ভাই, নুরুউদ্দিন ভাইসহ আরও অনেক পরিচিত মুখের সঙ্গে। দূর দেশে পরিচিত মানুষের দেখা পাওয়া এক বিশেষ অনুভূতি—মনটা মুহূর্তেই উষ্ণ হয়ে ওঠে। নামাজের পর সবার সঙ্গে কয়েকটি স্মরণীয় ছবি তোলা হলো।
পরে ডা. সবুজের সঙ্গে গেলাম তাঁর কর্মস্থল NHS-এর একটি জিপি সেন্টারে। প্রায় ২৪ বছর পর বন্ধুকে নিয়ে এমন নির্ভেজাল আড্ডা—সময়ের চাকা যেন উল্টো দিকে ঘুরে গেল। শৈশবের স্মৃতি, কৈশোরের গল্প, বর্তমান ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সব মিলিয়ে বিকেলটা হয়ে উঠল প্রাণবন্ত।
ইংল্যান্ডের শীতে সময় চলে অন্যরকম ছন্দে। দুপুর ২টার মধ্যেই আসরের আযান, আর বিকেল ৪টার আগে-আগেই চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে যায়। এখানকার অধিকাংশ মানুষ মাগরিবের নামাজের পরেই দিনের মূল খাবার খান।
সন্ধ্যায় জাফর ভাইয়ের পরিবার এবং বন্ধু সাফার পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম টেমস নদীর মোহনার দিকে—নর্থ সি-র তীর বরাবর হাঁটার উদ্দেশ্যে। নদীর বুক থেকে আসা শীতল বাতাসের ঝাপটা হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছিল, তবুও হাঁটার অনুভূতি ছিল অপূর্ব। শহরের আলো, নদীর ঢেউ আর শীতের হালকা কুয়াশা মিলেমিশে সৃষ্টি করেছিল এক মায়াবী দৃশ্য—মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন শীতের রঙে নিজের নতুন সাজ উন্মোচন করছে।
হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম হাই স্ট্রিটের এক নিরিবিলি কফিশপে। উল্লেখ্য—ইংল্যান্ডে বেশিরভাগ দোকানই বিকেল ৫টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়; কেবল খাবারের দোকানগুলো রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তাই এখানকার মানুষ রেস্টুরেন্ট বা কফিশপে বসে রাতের খাবার ও আড্ডা সেরে নেন। আমরা-ও গরম কফির কাপ হাতে নিয়ে সেই উষ্ণতার স্বাদ উপভোগ করলাম। বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা, আর ভেতরের হাসি-আড্ডা—এই বৈপরীত্যই যেন ভ্রমণের আসল রোমাঞ্চ।
রাত গভীর হওয়ার আগেই সবাই মিলে বাসায় ফিরলাম। টেমসের হিমেল সন্ধ্যা, প্রিয়জনদের সান্নিধ্য এবং বিদেশের শীতের বিশেষ আবহ—সবকিছু মিলিয়ে শুক্রবারটি স্মৃতির পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে রইল, যেন ভ্রমণ ডায়েরির পাতায় এক উজ্জ্বল রেখা হয়ে।
৪র্থ পর্ব:
লন্ডনের হলিডে ( ২২শে ও ২৩ শে নভেম্বর ২০২৫ ইং)-
লন্ডনের হলিডে শনিবার ও৷ রবিবার শুরু হয়েছিল একটু দেরিতে ঘুম ভাঙার মধ্য দিয়ে। কর্মব্যস্ত জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তি যেন ছুটির সকালের নীরবতায় ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। জানালার ওপারে ধূসর আকাশ, শীতল বাতাস আর স্থির শহর—সব মিলিয়ে সময়টুকু ছিল অলস, তবু এক গভীর শান্তিতে ভরা।
সকাল প্রায় সাড়ে নয়টা। বন্ধু ব্যারিস্টার নুরসাফার পরিবারসহ নাজ রেস্টুরেন্টে নাস্তার টেবিলে বসা। প্রবাসের মাটিতে পরিচিত মুখ, চেনা হাসি আর দেশি স্বাদের খাবার মুহূর্তেই মনকে দেশের কাছাকাছি নিয়ে গেল। চোখে পড়ল, রেস্টুরেন্টজুড়ে কত বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রী পরিশ্রম করে কাজ করছে—নিজেদের স্বপ্ন আর সংগ্রাম বয়ে নিয়ে। গল্প আর হাসির ফাঁকে কখন যে সকাল গড়িয়ে গেল, টেরই পাওয়া গেল না।
নাস্তার পর ব্যারিস্টার নূরউদ্দিন বদ্দা ও কস্তরী ভাবির বাসায় চা–কফির দাওয়াত। ঘরের ভেতরটা ছিল আপনজনের উষ্ণতায় ভরা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আড্ডা ধীরে ধীরে গভীর হয়ে উঠল। আলোচনায় এল মানুষের মন—পজিটিভ আর নেগেটিভ চিন্তার ভারসাম্য। সেখানেই উঠে এলো এক সহজ অথচ গভীর সত্য—আল্লাহ মানুষকে শতভাগ পজিটিভ করে সৃষ্টি করেননি। জীবনের ভারসাম্যের জন্য মানুষের ভেতরে কিছুটা অন্ধকারও রেখেছেন। সেই অন্ধকারের প্রকৃত রূপ কেবল আল্লাহ আর সেই মানুষটিই জানে; স্বামী–স্ত্রীও একে অপরের সবখানি জানতে পারে না। কথাগুলো মনে নীরব ছাপ রেখে গেল।
রবিবার ভোরে হিমেল শীত উপেক্ষা করে বের হলাম সমুদ্রপাড়ে হাঁটতে। কনকনে ঠান্ডা বাতাস শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল, ঢেউয়ের শব্দ ভোরের নীরবতাকে ভাঙছিল। ফাঁকা তট, ধূসর আলো আর সমুদ্রের বিস্তার—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি নীরবে কথা বলছে। মন ভরে উঠল এক অজানা প্রশান্তিতে।
ইংল্যান্ডে আসার আগেই দাওয়াতের এক দীর্ঘ তালিকা মনে ঘুরছিল—কাকে রেখে কার বাসায় যাব, সেই ভাবনাই ছিল বড় চিন্তা। ফোনে যোগাযোগ ছিল বন্ধু মাহফুজ, ডা. সবুজ, ডা. ওবায়েদ, ডা. নজরুল, ডা. মাহিন (বিমানে পরিচয়), ডা. ফোরকান, সেবক ভাই, ছোট ভাই মনির, লাভলু, ভাগ্নে রামিম, সিলেটের সারফুর ভাই, ভাগ্নি মুমি, নিজাম ভাই ও ভাবি (নাতিন)—সবার আন্তরিক ডাক আর ভালোবাসায় মন আগেই ভরে গিয়েছিল।
এই দাওয়াতের শুরু হলো মামাতো বোন ইয়াসমিন আপার লন্ডনের বাসা দিয়ে। বন্ধু নুরসাফা প্রায় দেড় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে পরিবারসহ সবাই আপার বাসায় পৌঁছে গেলাম । পথে সাইফউদ্দীন ভাই ও মেরী ভাবির বাসায় নাস্তার ছোট্ট বিরতি। ইয়াসমিন আপার সঙ্গে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পর দেখা—সময় যেন হঠাৎ পেছনে ফিরে গেল। পুরোনো দিনের স্মৃতি আর না–বলা কথাগুলো চোখের কোণে ভিড় করছিল।
ভেবেছিলাম, ইংল্যান্ডে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আপার ছেলেরা হয়তো বাংলার টান হারিয়েছে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম—ভাষা, আচরণ আর মননে তারা পুরোপুরি বাংলাদেশী। তিনজনই ভদ্র, বিনয়ী ও অমায়িক। বিশেষ করে দুই ছেলের বউদের মিশুক ব্যবহার আর মার্জিত আচরণ মনকে আলাদা করে ছুঁয়ে গেল। খাবার শেষে অল্প কিছু মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি হলো—ছোট্ট, কিন্তু অমূল্য এক ফটোসেশন।
এই তিনটি দিন লন্ডনের মাটিতে কাটলেও মন বারবার ফিরে গেছে নিজের দেশে—মানুষের উষ্ণতা, সম্পর্কের গভীরতা আর স্মৃতির নরম আলোয়। এই হলিডে ছিল শুধু ভ্রমণ নয়; ছিল মানুষ, মন আর মুহূর্তের এক শান্ত, গভীর পুনর্মিলন।
৫ম পর্ব:
ডা. ওবায়েদ ও আমি — লন্ডনে এক ব্যস্ত সোমবার
সোমবারের সকালটি শুরু হয়েছিল এক অনাবিল প্রাণচাঞ্চল্য আর নীরব আনন্দ নিয়ে। ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই বন্ধু সাফাকে সঙ্গে নিয়ে নর্থ সি–এর সাগরপাড়ে নেমে পড়ি জগিংয়ে। শীতল বাতাস গায়ে এসে লাগছিল, আর ঢেউয়ের ছন্দময় শব্দ যেন প্রকৃতির নিজস্ব সংগীত হয়ে কানে বাজছিল। দৌড় শেষে মন ও শরীর—দুটোই হয়ে উঠল সতেজ, নতুন দিনের অভিজ্ঞতার জন্য প্রস্তুত।
নাস্তার উষ্ণতা সঙ্গে নিয়ে এরপর গাড়ি ছুটে চলে লন্ডনের পথে। প্লাস্টিন রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে পৌঁছে যাই শহরের প্রাণকেন্দ্র টাওয়ার ব্রিজ এলাকায়। হিমেল বাতাসের মাঝেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মেডিকেলের ছোট ভাই ডা. ওবায়েদ। গরম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে কিছুক্ষণ সময় যেন থেমে গেল—শীত, ক্লান্তি আর ভ্রমণের উত্তেজনা মিলেমিশে তৈরি করল এক অপূর্ব মুহূর্ত।
এরপর ধীরে ধীরে শুরু হয় লন্ডনের সঙ্গে আমাদের নিবিড় পরিচয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল লন্ডন আই, শান্ত অথচ গভীর টেমস নদী, ইতিহাসের ভার বহন করা এলিজাবেথ টাওয়ার (বিগ বেন), গর্বিত টাওয়ার ব্রিজ, ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে এবং ব্রিটিশ গণতন্ত্রের প্রতীক পার্লামেন্ট ভবন। প্রচণ্ড ঠান্ডা সত্ত্বেও চারদিকে ছিল অসংখ্য পর্যটকের ভিড়; তবে আশ্চর্যজনকভাবে স্থানীয় ইংলিশ অধিবাসীর উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম। প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে থেমে থেমে ছবি তোলা চলতে থাকে—যেন সময়কে স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি করে রাখার এক নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস।
লন্ডনকে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল—এই শহর নীরবে তার ইতিহাস আর আধুনিকতার গল্প বলে যায়। ঠান্ডা বাতাস, নদীর ঢেউ আর আলো–ছায়ার খেলায় প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠছিল গভীরভাবে অনুভব করার মতো।
আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে আমরা পৌঁছে যাই রাজকীয় বাকিংহাম প্যালেসে। রাজপরিবারের ইতিহাস আর স্থাপত্যের আভিজাত্য সেখানে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কথা বলে। সেই রাজকীয় আবহ পেছনে রেখে আমরা যাত্রা করি হেরোর দিকে, ডা. ওবায়েদের আপন নীড়ে।
হেরোর বাসায় পৌঁছে দুপুরের খাবারের টেবিলে জমে ওঠে আন্তরিক পারিবারিক আড্ডা। আত্মীয়তার এক মধুর যোগসূত্র সেখানে নতুন করে অনুভব করি—ডা. ওবায়েদের স্ত্রী যে আমার স্ত্রীর মেডিকেলের ছোট বোন। এই সম্পর্কের উষ্ণতায় দীর্ঘ দিনের ভ্রমণক্লান্তি অনেকটাই লাঘব হয়ে আসে।
দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে, মাগরিবের পর ট্রেনে করে পৌঁছে যাই লিভারপুল স্ট্রিট স্টেশনে। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিল বন্ধু সাফা। তাকে সঙ্গে নিয়ে যাই তার এক বন্ধুর বাসায়। সেখানে নুরউদ্দীন বদ্দাসহ আরও কয়েকজন বন্ধু উপস্থিত ছিলেন। রাতের খাবার, প্রাণখোলা হাসি, গল্প আর আড্ডায় সময় যেন নিজের নিয়মেই এগিয়ে চলে।
অবশেষে গভীর রাতে, সারাদিনের ব্যস্ততা আর অজস্র স্মৃতি হৃদয়ে ধারণ করে ফিরে আসি ওয়েস্টক্লিপের বাসায়। ক্লান্ত শরীরের ভেতরেও তখন এক গভীর তৃপ্তির আলো জ্বলছিল। লন্ডনের এই সোমবার—ভ্রমণ, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা আর অনুভবের মেলবন্ধনে—স্মৃতির পাতায় এক অনন্য অধ্যায় হয়ে চিরদিনের মতো লেখা হয়ে রইল।
৬ষ্ঠ পর্ব
ম্যানচেস্টার কলিং
বন্ধু মাহফুজের ডাকটা বহুদিনের। বারবার বলেছে—
“একবার ম্যানচেস্টার আসতেই হবে।”
সন্দীপের মাওলা ভাইয়ের ছেলের বিয়েতেও যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ব্যস্ততার ভারে তখন আর যাওয়া হয়নি। আজ মনে হলো, সেই অপূর্ণতার টানই বুঝি আমাকে আবার পথে নামিয়েছে।
দুপুরের দিকে নুরসাফার অফিসিয়াল কাজ শেষে গাড়িতে রওনা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু গাড়ির ডিসপ্লেতে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ সময় দেখে, সঙ্গে যানজটের শঙ্কা আর সাফার ক্লান্ত মুখ—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত বদলালাম। দীর্ঘ পথের জন্য ট্রেনই যে সবচেয়ে আরামদায়ক, তা তখন স্পষ্ট হয়ে উঠল।
সেন্ট্রাল লন্ডনে সাইফউদ্দীন ভাইয়ের বাসায় যাত্রাবিরতি। মেরী ভাবির আন্তরিক আপ্যায়নে ক্লান্ত শরীর আর মন—দুটোই খানিকটা বিশ্রাম পেল। উষ্ণ চা আর নাশতার সঙ্গে মিশে গেল আপনজনের স্নিগ্ধ ভালোবাসা। এরপর ওয়েস্ট হ্যাম হয়ে ইন্টারসিটি রেল স্টেশনের পথে যাত্রা।
স্টেশনের ব্যস্ততা, ট্রেনের ঘোষণার শব্দ আর মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে এক ধরনের রোমাঞ্চ কাজ করছিল। প্রথমে ক্রু স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনে ওঠার আগে মেরী ভাবির দেওয়া মুড়ি-মাখানো ছোলাবুট ঠান্ডার মধ্যে অমৃতের মতো লেগেছিল। পরে অবন্তী ওয়েস্ট কোস্টে উঠলাম ম্যানচেস্টার উদ্দেশ্যে।
জানালার বাইরে দ্রুত পাল্টে যেতে থাকা দৃশ্য, আর ভেতরে নীরব ভাবনার ঢেউ—বন্ধুত্ব, দূরত্ব আর সময়ের গল্প যেন পাশাপাশি চলছিল। প্রায় আড়াই ঘণ্টার যাত্রা শেষে রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে ট্রেন থামল ম্যানচেস্টারে।
স্টেশনে মাহফুজ আগেই অপেক্ষা করছিল। অনেকদিন পর দেখা—একটি আলিঙ্গনেই সব না-বলা কথা বলা হয়ে গেল। সেখান থেকে সরাসরি তার বাসায়। ঘরে ঢুকেই বোঝা গেল আয়োজনের ব্যস্ততা। মাহফুজ ভাবির হাতে তৈরি—তিন রকম মাছ, চার রকম মাংস। সত্যিকারের ভুড়িভোজ।
দেশি ছোট ভাই সেবক অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে শেষে নিজের গন্তব্যে রওনা দিল। আমরা থেকে গেলাম—আড্ডা, হাসি আর পুরোনো স্মৃতির বৃত্তে। রাত গড়িয়ে প্রায় দুইটা—তখন ঘুম।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল নাস্তার ডাক শুনে। সাফা, মাহফুজ, ছোট ভাই লাবলু আর ওসমান ভাই—সবাই একসঙ্গে। চিতই পিঠা, ভাপা পিঠা, রসের গুড় আর নারকেল—এক মুহূর্তেই ভুলে গেলাম, আমরা বিদেশে। মনে হলো, সন্দীপের কোনো এক গ্রামের সকালের নাস্তার টেবিলে বসে আছি।
নাস্তা আর আড্ডা শেষে লাবলুর ড্রাইভে বের হলাম ডারউইন পার্ক ও লেকের দিকে। কনকনে ঠান্ডা, হিমেল বাতাস—তবু ক্যামেরা থেমে থাকেনি। জমে যাওয়া হাতে বোতাম চাপা, আর জমে না যাওয়া হাসিতে ভরে উঠল মুহূর্তগুলো। প্রকৃতির নীরবতায় জমা হলো ছবি আর স্মৃতি—দুটোই।
বিকেলে সবাই মিলে নুরসাফার বেয়াইয়ের বাসায় দাওয়াতে হাজির। আয়োজন দেখে মনে হলো, আমরা বুঝি বিশেষ কোনো অতিথি। পনেরো-ষোলো রকমের খাবার, অঢেল আপ্যায়ন আর অকৃত্রিম আন্তরিকতা—প্রবাসে থেকেও আপনজনের উষ্ণতা যে কত গভীর হতে পারে, দিনটি আবার তা মনে করিয়ে দিল।
সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে অবন্তী ট্রেনে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা দিলাম। জানালার পাশে বসে মনে হচ্ছিল—যাওয়ার আনন্দের চেয়ে ফেরার সময় মনটা যেন আরও ভারী হয়ে আসে। গভীর রাতে নুরসাফার গাড়িতে ওয়েস্টক্লিফে পৌঁছাই। তখন রাত একটারও বেশি।
দিনের শেষে ডায়েরির পাতায় লিখে রাখলাম—
এই যাত্রা কেবল ম্যানচেস্টার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না,
এই যাত্রা ছিল বন্ধুত্ব, স্মৃতি আর ভালোবাসার পথে।
এটাই আমার ম্যানচেস্টার কলিং।
৭ম পর্ব:
বুধবারের লন্ডন ভ্রমণ-
শীত, বন্ধুত্ব আর শহরের গল্প
বুধবারের সকাল শুরু হলো চিরচেনা এক ছন্দে। বন্ধু নুরসাফাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম প্রাতভ্রমণে। টেমস নদীর মোহনায়, নর্থ সাগরের তীরে শীত আর কুয়াশা যেন হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে ছিল। হিমেল বাতাসে কিছুক্ষণ হাঁটা, কিছুক্ষণ থেমে থাকা, আর ফাঁকে ফাঁকে ছবি তোলা—সব মিলিয়ে সকালের সময়টা হয়ে উঠল শান্ত ও উপভোগ্য।
সকালের পর্ব শেষে আগে থেকে নির্ধারিত নাস্তার দাওয়াতে হাজির হলাম জাফর ভাইয়ের বাসায়। মুন্নী ভাবি আর জাফর ভাইয়ের আন্তরিকতা মন ছুঁয়ে গেল। সেখানে ছিলেন বাবু ভাই, নূরউদ্দিন বদ্দা, সোহেল ভাই, মাহফুজ ভাই এবং নুরসাফা ভাবিসহ আরও কয়েকজন প্রিয় মানুষ। টেবিলে সাজানো মাংস আর নান রুটি দেখে মনে হলো যেন ছোটখাটো এক ভুড়িভোজের আয়োজন। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে গল্প, হাসি আর আপনজনের উষ্ণতায় সকালটা কখন যে গড়িয়ে গেল, টেরই পাওয়া গেল না।
দুপুরের দিকে একা একা লন্ডন ঘোরার ইচ্ছে জাগল। ঠান্ডা উপেক্ষা করে রিতা ভাবি নিজে হাতে ওয়েস্ট ক্লিফ রেল স্টেশনে পৌঁছে দিলেন। বন্ধু সাফা আর রিতা ভাবি এমনভাবে পথঘাট বুঝিয়ে দিলেন, যেন ভুল করে হারিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই না থাকে। এই ছোট ছোট যত্নেই তো বন্ধুত্বের গভীরতা ধরা পড়ে।
ওয়েস্ট ক্লিফ থেকে ট্রেনে চড়ে রওনা দিলাম ওয়েস্টফিল্ডের দিকে। জানালার পাশে বসে চলমান শহরের দৃশ্য দেখতে দেখতে সময় কেটে যাচ্ছিল। এদিকে বন্ধু সাফা বারবার ফোন করে খোঁজ নিচ্ছিলেন—ঠিক পথে আছি কি না। অবশেষে স্ট্র্যাটফোর্ড স্টেশনে নেমে ঢুকে পড়লাম বিশাল ও প্রাণবন্ত মার্কেটে। রঙিন দোকান, মানুষের কোলাহল, আলো-ছায়ার মেলা—সব মিলিয়ে জায়গাটা সত্যিই চোখে পড়ার মতো।
ঠান্ডার দাপটে তখন প্রবল ক্ষিদে। তাই ঢুকে পড়লাম ইতালিয়ান কফি শপ ‘ক্যাফে নিরো’-তে। গরম কফি আর নরম ক্রুসেন্টে শরীর পেল উষ্ণতা, মন পেল আরাম। ছোট ভাই মনির (সন্দীপ গাছুয়ার) আসার আগ পর্যন্ত কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক পায়চারি করলাম।
কিছুক্ষণ পর মনির এসে পৌঁছাল। দু’ভাই মিলে শুরু হলো খাওয়া-দাওয়া আর গল্পের আসর। অলিম্পিক স্টেডিয়ামের পাশে ঘোরাঘুরি, ওয়েস্টফিল্ডে ফটোসেশান আর আড্ডা—ঠান্ডার মধ্যেও সময় যেন উড়ে যাচ্ছিল, যদিও মাঝে মাঝে জমে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল!
দিনের শেষ ভাগে দু’জন মিলে ট্রেনে করে ইলফোর্ডে পৌঁছালাম বন্ধু সাফার অফিসে। সেখানে কফি, আড্ডা, সঙ্গে সিংগারা আর জিলাপি—বাংলা স্বাদের এই আপ্যায়নে দিনটা পেল পূর্ণতা। সবশেষে আবার ট্রেনে করে ওয়েস্ট ক্লিফে ফেরা—ঠিক যেন দীর্ঘ ঘোরাঘুরির পর নিজের নীড়ে ফিরে আসা।
শীতের লন্ডন, প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য আর চলমান শহরের গল্প—এই বুধবারের ভ্রমণ তাই স্মৃতির পাতায় হয়ে রইল এক উষ্ণ, স্নিগ্ধ অধ্যায়।
লেখক-সিভিল সার্জন, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *