অর্থের বিনিময়ে ইউরোপের নাগরিকত্ব নেয়ার দিন ফুরালো!

অর্থের বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো দেশের নাগরিক হওয়ার স্বপ্ন দেখা ধনকুবেরদের জন্য দুঃসংবাদ। ইউরোপের সর্বোচ্চ আদালত সম্প্রতি ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ খ্যাত এই বিতর্কিত ব্যবস্থার শেষ কপাটটিও বন্ধ করে দিয়েছেন। মাল্টার বিরুদ্ধে আনা এক মামলার রায়ে ইউরোপীয় বিচার আদালত (ইসিজে) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শুধু আর্থিক বিনিয়োগের মাধ্যমে কোনো দেশের নাগরিকত্ব প্রদান ইইউ আইনের পরিপন্থী। এই রায়ের ফলে ইউরোপের দেশগুলোতে অর্থের বিনিময়ে নাগরিকত্ব পাওয়ার আর কোনো আইনি সুযোগ রইল না।

রায় ঘোষণার পর স্তম্ভিত মাল্টার নাগরিক সংগঠন রিপাবলিকার নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যানুয়েল ডেলিয়া। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর এই অপ্রত্যাশিত জয় যেন বিশ্বাসই হতে চায় না তার। ডেলিয়া বলেন, আমি চিৎকার করে উঠলাম। খারাপ খবরের অপেক্ষাতেই ছিলাম। 

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য মাল্টার বিতর্কিত নাগরিকত্ব কর্মসূচির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার ছিলেন তিনি। বুলগেরিয়া ও সাইপ্রাস আগেই তাদের ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ স্কিম বন্ধ করে দিলেও মাল্টা ছিল এই ব্যবস্থার শেষ ঘাঁটি।

ডেলিয়া স্মরণ করেন তার বন্ধু ও সহকর্মী, মাল্টার দুর্নীতিবিরোধী সাংবাদিক ডাফনে কারুয়ানা গালিজিয়ার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এই ধরনের কর্মসূচির বিপজ্জনক দিকগুলো প্রথম জনসমক্ষে নিয়ে আসে।

অর্থই যেখানে নাগরিকত্বের মাপকাঠি:

২০২২ সালে ইউরোপীয় কমিশন মাল্টার এই নীতির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়। কমিশনের অভিযোগ ছিল, মাল্টা আবাসন খাতে বিনিয়োগের বিনিময়ে যে নাগরিকত্ব দিচ্ছে, তা ইইউর নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ইইউর নিয়ম অনুযায়ী, নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য কেবল আর্থিক সক্ষমতাই যথেষ্ট নয়, ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের ‘প্রকৃত সংযোগ’ থাকা অপরিহার্য।

আরও পড়ুন:  প্রস্তাব অনুমোদন, বাংলাদেশিদের জন্য ইউরোপে আশ্রয় কঠিন হচ্ছে

আদালতের রায়ের পূর্বাভাসে কিছুটা হতাশ ছিলেন ডেলিয়া। কারণ, গত অক্টোবরে ইসিজের অ্যাডভোকেট জেনারেল তার মতামত মাল্টা সরকারের পক্ষেই দিয়েছিলেন। সাধারণত ইসিজে অ্যাডভোকেট জেনারেলের মতামতকে গুরুত্ব দিলেও, এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটল।

আদালত মাল্টার নাগরিকত্ব নীতিকে নিছক একটি বাণিজ্যিক লেনদেন হিসেবেই দেখেছে। রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “এই ধরনের চর্চার কারণে সদস্য দেশগুলো ও তাদের নাগরিকদের মধ্যে প্রয়োজনীয় বন্ধন ও পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয় না, যা সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও অন্তরায় সৃষ্টি করে।”

ডেলিয়ার মতে, আদালতের এই রায় তাদের দীর্ঘদিনের যুক্তিরই প্রমাণ। তিনি বলেন, “এই কর্মসূচিটি নিছক অর্থ উপার্জনের একটি মাধ্যম ছিল, যা কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত নয়। নাগরিকত্বের কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। এটি অর্থের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান।”

‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ প্রদানের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কতটা কঠোরভাবে শর্তাবলী যাচাই করত, তা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন ডেলিয়া ও অন্যান্য পর্যবেক্ষকরা। বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, বিনিয়োগকারীরা শর্ত অনুযায়ী মাল্টায় পর্যাপ্ত সময় না থেকেও নাগরিকত্ব লাভ করেছেন। ডাফনে কারুয়ানা গালিজিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, মাল্টার ‘গোল্ডেন ভিসা’র প্রায় ৯০ শতাংশই পেয়েছেন চীনা বিনিয়োগকারীরা। অথচ দেশটির জনমিতিক জরিপ অনুযায়ী, মাল্টায় বসবাসকারী চীনা নাগরিকের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম। ফাউন্ডেশনের ধারণা, এই ভিসা পাওয়া প্রায় অর্ধেক ব্যক্তিই আসলে মাল্টায় বসবাস করেন না।

আদালতের এই রায়ের পরেও মাল্টার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট আবেলা তাদের বিতর্কিত কর্মসূচির পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, গোল্ডেন পাসপোর্টের মাধ্যমে মাল্টা প্রায় ১৬০ কোটি ডলার আয় করেছে। রায়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই ব্যবস্থা চালু রাখার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। আবেলা বলেন, “মাল্টা সরকার সবসময়ের মতোই আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। এই মুহূর্তে রায়ের আইনি প্রভাব বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে, যাতে নাগরিকত্ব নিয়ন্ত্রণের কাঠামোটি রায়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।”

আরও পড়ুন:  আইএমএফের বাংলাদেশকে ৩ বিষয়ে পরামর্শ

অর্থের বিনিময়ে সরাসরি পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ বন্ধ হলেও, পাসপোর্টমুক্ত শেঙ্গেন অঞ্চলে প্রবেশের অন্যান্য পথ কিন্তু এখনও খোলা রয়েছে। ‘গোল্ডেন ভিসা’র মাধ্যমে আবাসন বা অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসের অনুমতি পাওয়া এখনও সম্ভব। মাল্টার পাসপোর্ট কর্মসূচিতে সহায়তাকারী সংস্থা হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স ৩১টি দেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে বসবাসের অনুমতি পাওয়ার পরিষেবা দিয়ে থাকে, যার অর্ধেকই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র।

বৈশ্বিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নীতি বিষয়ক কর্মকর্তা আনা টেরন বলেন, “এর মাধ্যমে আপনি এখনও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক স্বাধীনতা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।”

তবে, ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র মার্কুস লেমার্ট এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ‘গোল্ডেন ভিসা’ কর্মসূচিগুলো নিয়েও ‘গুরুতর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “এই ধরনের কর্মসূচিগুলো ইউনিয়নের নিরাপত্তা, অর্থ পাচার, কর ফাঁকি ও দুর্নীতির সামগ্রিক ঝুঁকি তৈরি করছে। সদস্য দেশগুলোর এমন কর্মসূচির ক্ষেত্রে যাতে ঝুঁকি মোকাবিলা ও ব্যবস্থা নেওয়ার যথাযথ পদক্ষেপ থাকে, তা ইইউ অর্থ পাচার আইনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।”

২০২২ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি রেজ্যুলেশনে বিনিয়োগের বিনিময়ে বসবাসের সুবিধা স্কিমের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হলেও, এক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন:  নির্বাচনে বড় পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে কমনওয়েলথ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের টেরন আশা করছেন, গোল্ডেন পাসপোর্ট বন্ধের এই সিদ্ধান্ত ‘গোল্ডেন ভিসা’র ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। আদালত যে যুক্তির ভিত্তিতে গোল্ডেন পাসপোর্ট বাতিল করেছে, একই যুক্তি গোল্ডেন ভিসার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। ইইউ দেশগুলোর সংহতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে ‘দুর্নীতিবাজ এবং অস্বচ্ছ উপায়ে সম্পদশালী হওয়াদের’ দূরে রাখা জরুরি বলে মত দেন তিনি।

অন্যদিকে, মাল্টার ডেলিয়া মনে করেন, নাগরিকত্বের বিষয়টি হওয়া উচিত ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যকার একটি পবিত্র চুক্তি, যার মূল ভিত্তি হবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং একসঙ্গে বসবাসের অঙ্গীকার ও সংহতি। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, “আপনি যখনই এর আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করছেন, তখনই এটিকে সস্তা বানিয়ে ফেলছেন।” ইউরোপের সর্বোচ্চ আদালতের এই রায় নিঃসন্দেহে অর্থের বিনিময়ে নাগরিকত্ব অর্জনের সুযোগ সন্ধানীদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। তবে, এর মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকত্বের মর্যাদা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক আস্থা আরও দৃঢ় হবে, এমনটাই প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen + 18 =