দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশজুড়ে রয়েছে কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট (সিসিপিপি)। সমান সক্ষমতার একক জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রের চেয়ে কম জ্বালানি ব্যবহার করে বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র। গ্যাস সংকটের কারণে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বেশির ভাগই এখন পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বছরের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থাকে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সাশ্রয়ী করতে বাধা সৃষ্টি করছে এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কেন্দ্র ব্যয়ও (ক্যাপাসিটি চার্জ) বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা (ইনস্টলড ক্যাপাসিটি) ২৭ হাজার ৫৪ মেগাওয়াট (জুন, ২০২৪ পর্যন্ত)। এর মধ্যে ৩২টি কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্টের সক্ষমতা ৯ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ার কারণে উচ্চ কার্যক্ষমতার এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি উৎপাদনে যেতে পারছে না। আবার গ্যাসের অভাবে নানা যান্ত্রিক ত্রুটিও দেখা দিচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) দৈনিক বিদ্যুৎ চাহিদার পূর্বাভাস ও প্রকৃত সরবরাহের তালিকা অনুযায়ী, গত ৫ জুলাই সারা দেশে কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্টগুলোর মধ্যে ১১টি গ্যাস সংকটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি। এছাড়াও, যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ১১টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে নেই।
এ প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে কম জ্বালানিতে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। বিশেষ করে শুধু গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পরিমাণ জ্বালানি লাগে, একই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট থেকে আরো বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। সেক্ষেত্রে গ্যাস ও স্টিম টারবাইন দুই ধরনের ইঞ্জিন থাকতে হয়। তবে জ্বালানি কম হলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বেড়ে যায় এবং এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুতের দামে।
বর্তমানে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় মেঘনাঘাটে সামিট ও ইউনিকের ১ হাজার ১৭৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার (ইনস্টলড ক্যাপাসিটি) দুটি কেন্দ্রই বন্ধ রয়েছে। এই দুটি বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকার ফলে সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং শুরু হয়েছে। এছাড়াও, রিলায়েন্সের ৭১৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গত মার্চে প্রস্তুত হলেও এখনও পর্যন্ত গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমতি পাচ্ছে না। বর্তমানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের জোগান না পাওয়ায় টেস্টিং-কমিশনিং শুরু করতে পারছে না।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে অত্যন্ত কার্যকর। পর্যাপ্ত গ্যাসের জোগান দেয়া গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব, যদিও গ্যাস সংকটের কারণে তা করা যাচ্ছে না। বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রস্তুত হলেও গ্যাস না থাকার কারণে সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) খন্দকার মোকাম্মেল হোসেন বলেন, ‘কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট যেগুলো উৎপাদনে এসেছে, সেগুলোয় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এগুলো অত্যাধুনিক ও উচ্চ সক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র। গ্যাস সরবরাহ বিবেচনায় বিপিডিবি এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।’
এই পরিস্থিতি সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি, নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট (সিসিপিপি) প্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী। অর্থাৎ, সমপরিমাণ জ্বালানি দিয়ে কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট থেকে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট হতে পারে কার্যকর ব্যবস্থা।
উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি সার্বক্ষণিক উৎপাদনে (বেইজ লোড) রাখাও কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের একটি লক্ষ্য ছিল। তবে, বর্তমানে এত বেশি পরিমাণে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে যে সেগুলো ব্যবহারের প্রকৃত সুযোগ নেই।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েট অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশে কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সবই বেইজ লোড। প্রকৃত হিসাব করলে দেখা যাবে, শুধু বেইজ লোডভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াট। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সার্বক্ষণিক না চালালে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এছাড়া, এসব কেন্দ্র দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কারণ দেশের তীব্র গরমে বেইজ লোড বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চাহিদা সর্বাচ্চ ১৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত থাকে, এবং শীতে তা সাত হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। ফলে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রাখা বিপিডিবির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এ অবস্থায়, বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি, বিদ্যুৎ চাহিদা ও উৎপাদন খরচের সমন্বয় সাধন করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও সাশ্রয়ী ও টেকসই করতে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।







