লেবাননে ইসরায়েলের স্থল অভিযান শুরু

দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত শহর খিয়াম ও এর আশপাশে লড়াই তীব্র হওয়ায় এই অভিযান শুরু হলো। সোমবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

আলজাজিরা আরবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল খিয়াম শহরে অন্তত তিনটি বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই শহরটি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এটি দক্ষিণ লেবাননের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তাদের ৯১তম ডিভিশনের সেনারা দক্ষিণ লেবাননের প্রধান কেন্দ্রগুলোতে অভিযান চালাচ্ছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং সীমান্ত এলাকায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা।

ইসরায়েলের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ সম্প্রতি তৎপরতা বাড়িয়েছে এবং ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে প্রতিদিন শত শত রকেট ছুড়ছে। এ ছাড়া হিজবুল্লাহর এলিট ফোর্স ‘রেদওয়ান ইউনিট’-এর শত শত সদস্য দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান নিয়েছে। শোশানি উল্লেখ করেন, ‘সেনারা এমন সব নতুন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে, যেখানে আগে আমাদের উপস্থিতি ছিল না।’

আরও পড়ুন:  বড় জয়ে সিরিজে ফিরলো টাইগাররা

খিয়ামের কৌশলগত গুরুত্ব
খিয়াম শহরটি ইসরায়েল সীমান্ত এবং লিতানি নদী থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে উঁচু ভূমিতে অবস্থিত। এখান থেকে উত্তর ইসরায়েল এবং লেবাননের বিস্তীর্ণ সমতল ভূমির ওপর নজরদারি করা সহজ। আলজাজিরা প্রতিনিধি জিনা খোদর জানিয়েছেন, খিয়াম ও এর আশপাশে বর্তমানে ‘ভয়াবহ যুদ্ধ’ চলছে। এই উচ্চতা দুই পক্ষের জন্যই সামরিক সুবিধা দিচ্ছে।

খোদর আরও জানান, খিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে অবস্থিত। এটা দক্ষিণ লেবাননের পূর্ব ও পশ্চিম খাতের সঙ্গে যুক্ত। একটি রাস্তা সরাসরি পূর্ব লেবাননের বেকা উপত্যকার দিকে চলে গেছে, সেখানে হিজবুল্লাহর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য হলো, হিজবুল্লাহর সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া, যাতে তারা লিতানি নদীর দক্ষিণে আর অস্ত্র বা যোদ্ধা পাঠাতে না পারে।

সংঘাতের পটভূমি ও মানবিক বিপর্যয়
২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতির পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে কোনো হামলা চালায়নি। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় তারা রকেট হামলা শুরু করলে গত ২ মার্চ থেকে এই নতুন যুদ্ধ শুরু হয়। ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, তারা উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং হিজবুল্লাহর হুমকি নির্মূল করতে এই অভিযান চালাচ্ছে।

আরও পড়ুন:  নিউইয়র্কে ৬ আরোহীসহ বিমান বিধ্বস্ত, কেউ বেঁচে নেই

এই সংঘাতের ফলে লেবাননে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দক্ষিণ লেবানন এবং বৈরুতের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার (ইভাকুয়েশন) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর অন্তত আট লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৮৫০ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৭ শিশু এবং ৬৬ নারী রয়েছেন।

গতকাল সকালে দক্ষিণ লেবাননের ইয়াতের, বুর্জ কালাউইয়া, সুলতানিয়া এবং চাকরা অঞ্চলেও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এ ছাড়া কান্তারা ও আস-সাওয়ানা শহরেও অভিযান চালানো হয়েছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি সেনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে এবং খিয়াম শহরে সরাসরি সংঘর্ষ মোকাবিলা করছে। গত শনিবার থেকে খিয়ামের ভেতরে ইসরায়েলি যান ও সেনাদের ওপর কয়েক দফা হামলার দাবি করেছে সংগঠনটি।

আরও পড়ুন:  নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা: সিইসি

যুদ্ধ মে পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ইয়েদিওথ আহরোনোথ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নর্দান কমান্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে খণ্ডকালীন যোদ্ধাদের জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহর সঙ্গে এই লড়াই ‘শাভুত’ উৎসব পর্যন্ত চলতে পারে। ইহুদিদের এই ধর্মীয় উৎসবটি আগামী ২১ থেকে ২৩ মের মধ্যে উদযাপিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *