মহানায়কের আবির্ভাব: বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। গোপালগঞ্জে টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নিপীড়িত মানুষের নেতা, গণমানুষের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নাম বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত সমাদৃত। বিশ্বনেতাদের চোখে তিনি হিমালয়সম। আজ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী। প্রতি বছর এ দিনটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবেও পালিত হতো।

বিবিসির জরিপে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন দেশের প্রথম রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে তার খ্যাতি ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়। তার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ডস ডকুমেন্টারি হেরিটেজের স্বীকৃতি পেয়েছে। এ ভাষণের অন্য নাম ‘বজ্রকণ্ঠ’। সার্বিকভাবে বঙ্গবন্ধু একটি আদর্শের নাম, যে আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, বিশ্বের বুকে জন্ম দিয়েছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।

তার ত্যাগ ও সংগ্রাম আজ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হয়ে ধরা দিয়েছে তরুণ প্রজন্মের সামনে। ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ, মোহ, পদ-পদবির ঊর্ধ্বে উঠে নিজের বিশ্বাসে অটল থেকেছিলেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব নয়, এদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল তার লক্ষ্য। তিনি কখনো ক্ষমতার পেছনে ছোটেননি। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য।

শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের চার কন্যা এবং দুই পুত্রের সংসারে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত এই নেতা ছিলেন তৃতীয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে মারা যান বঙ্গবন্ধু। সেদিন তার দুই কন্যা ছাড়া পরিবারের অন্য সব সদস্য প্রাণ হারান স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকদের হাতে ।

আরও পড়ুন:  বসন্তের ঝড়।। আসাদ মান্নান

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্কুলজীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। কৈশোরে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন। ম্যাট্রিক পাসের পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরেবাংলা একে ফজলুল হকসহ তৎকালীন প্রথমসারির রাজনৈতিক নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন। ওই সময় থেকে নিজেকে ছাত্র-যুবনেতা হিসেবে রাজনীতির অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করেন।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে এ জাতিকে মুক্ত করতে নতুন রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা নিয়ে অগ্রসর হন। সহকর্মীদের নিয়ে ১৯৪৮ সালে গঠন করেন ছাত্রলীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠিত হলে তরুণ নেতা শেখ মুজিব দলটির যুগ্ম-সম্পাদক নিযুক্ত হন। পরে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নামকরণ করা হয় আওয়ামী লীগ।

বঙ্গবন্ধু ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৫৮-র আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলনসহ পাকিস্তানি সামরিক শাসনবিরোধী সব আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাঙালির অধিকার আদায়ের এসব আন্দোলনের কারণে বারবার কারাগারেও যেতে হয় তাকে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন তিনি। আওয়ামী লীগ প্রধান হিসেবে ১৯৬৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি লাহোরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন তথা বাঙালির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুসহ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে কারাগারে পাঠায়। ’৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি শেখ মুজিবকে কারামুক্ত করে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করে।

আরও পড়ুন:  ডিএনএ রিপোর্টে শনাক্ত হলো অভিশ্রুতির পরিচয়

’৭০-র নির্বাচনে বাঙালি বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের ম্যান্ডেট লাভ করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির এ নির্বাচনি বিজয়কে মেনে নেয়নি। এরপর বঙ্গবন্ধু স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রথমে স্বাধিকার আন্দোলন এবং চূড়ান্ত পর্বে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ দেন।

’৭১-এর মার্চে নজিরবিহীন অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এ ভাষণে সেদিন ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার ডাক দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিক নির্দেশনা দেন শেখ মুজিবুর রহমান। যা ইউনেস্কোর ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

’৭১-সালে ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ শুরু করলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাসভবন থেকে ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর বঙ্গবন্ধুকে তার বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। অবশেষে নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে বীর বাঙালি ’৭১-সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনে। অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশভূমিতে ফিরে সদ্য স্বাধীন দেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

আরও পড়ুন:  শান্তি পুরস্কারের তথ্য ফাঁসের সন্দেহ, তদন্তে নোবেল ইনস্টিটিউট

১৯৭৫ সালে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ১৫ আগস্টের কালরাতে নিজ বাসভবনে ক্ষমতালোভী ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নিহত হন তিনি। স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর জীবনাবসান হয়। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অবিস্মরণীয় ভূমিকার জন্যও তিনি সারা বিশ্বে সমাদৃত। এসব ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ‘জুলিও কুরি’ পদকে ভূষিত হন তিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ৫ জনের ফাঁসির রায় ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর করা হয়। এর মধ্যদিয়ে জাতির ইতিহাসের অন্ধকার যুগের অবসান ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *