তওবা ছাড়া শবে কদরেও যারা ক্ষমা পাবে না

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষণ করেন। আর রমজানের শেষ দশকের সর্বশ্রেষ্ঠ রাত হলো শবে কদর (লাইলাতুল কদর)। যে রাতকে আল্লাহ তাআলা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে ঘোষণা করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি একে (কোরআন) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আর তুমি কি জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” (সুরা আল-কদর, আয়াত : ১–৩)
এই রাত আল্লাহর অশেষ রহমত ও ক্ষমার রাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদতে রাত কাটাবে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
” (বুখারি, হাদিস: ৩৫; মুসলিম, হাদিস: ৭৬০)তবে ইসলামী শিক্ষায় এমন কিছু গুরুতর গুনাহের কথা উল্লেখ রয়েছে, যেগুলোতে লিপ্ত থেকে তওবা না করলে মানুষ আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এমনকি শবে কদরের রাতেও। তাই এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।১. শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি

ইসলামে সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো শিরক।

অর্থাৎ আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা বা তাঁর একত্বে অবিশ্বাস করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না; তবে এর বাইরে যা আছে তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত : ৪৮) অতএব শিরকের গুনাহ থেকে তওবা না করলে কোনো ইবাদতই মানুষের জন্য মুক্তির নিশ্চয়তা হতে পারে না।
২. মানুষের হক নষ্টকারী (হক্কুল ইবাদ লঙ্ঘনকারী)মানুষের অধিকার নষ্ট করা ইসলামে অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা, প্রতারণা করা, অন্যায়ভাবে কারও অধিকার হরণ করা।

আরও পড়ুন:  তাপমাত্রা নামল ৭ ডিগ্রিতে, শীত নিয়ে নতুন বার্তা
এসব গুনাহ শুধু তওবা করলেই মাফ হয় না; বরং যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার কাছ থেকে ক্ষমা নিতে হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমরা কি জানো প্রকৃত নিঃস্ব কে? সাহাবারা বললেন, আমাদের মধ্যে নিঃস্ব সে, যার কাছে ধন-সম্পদ নেই। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মতের নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারও রক্তপাত করেছে বা কাউকে প্রহার করেছে। তখন তার নেক আমলগুলো তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮১)
৩. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান

ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান ও আনুগত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অবাধ্য হওয়া বা কষ্ট দেওয়া বড় গুনাহ হিসেবে বিবেচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:  “তিন শ্রেণির মানুষের দিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকাবেন না: পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, মদপানে আসক্ত ব্যক্তি এবং যে ব্যক্তি উপকার করে তা স্মরণ করিয়ে অপমান করে।” (সুনান নাসাঈ, হাদিস: ২৫৬২; মুসনাদ আহমদ)

আরও পড়ুন:  শীতে মুলা খেলে যেসব উপকার পাবেন

৪. মদপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি

মাদকাসক্তি ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কারণ এটি মানুষের বিবেক ও চরিত্র ধ্বংস করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : “যে ব্যক্তি নিয়মিত মদ পান করে, সে যদি তওবা না করে মারা যায়, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (বুখারি, হাদিস: ৫৫৭৫)

অতএব মদপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্যে আসক্ত ব্যক্তি যদি সত্যিকার তওবা না করে, তবে সে আল্লাহর বিশেষ রহমত থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

৫. বিদ্বেষ ও হিংসা পোষণকারী ব্যক্তি

মানুষের অন্তরে যদি হিংসা ও শত্রুতা থাকে, তবে তা ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়। ইসলামে মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার মানুষের আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। তখন প্রত্যেক মুমিনকে ক্ষমা করা হয়, কিন্তু সেই দুই ব্যক্তিকে নয় যারা একে অপরের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করে। তখন বলা হয়—তাদেরকে অপেক্ষা করতে দাও যতক্ষণ না তারা মিলমিশ করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৫)

৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। যারা অহেতুক কারণে আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তারা আল্লাহর অসন্তুষ্টির মুখে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৪)

শবে কদরের শ্রেষ্ঠ দোয়া

লাইলাতুল কদরের রাতে বেশি বেশি তওবা ও দোয়া করার কথা হাদিসে এসেছে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত—তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, যদি আমি লাইলাতুল কদর পেয়ে যাই তবে কী দোয়া করব? তিনি বলেন—

আরও পড়ুন:  ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ العَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

উচ্চারণ:  আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউউন তুহিব্বুল ‘আফওয়া ফা‘ফু ‘আন্নি।

অর্থঃ হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই তুমি পরম ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করতে ভালোবাসো; অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৩)

শবে কদর এমন এক মহিমান্বিত রাত, যখন আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু সেই ক্ষমা লাভের জন্য প্রয়োজন আন্তরিক তওবা, হৃদয়ের পরিশুদ্ধতা এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করা।

অতএব এই পবিত্র রাতে আমাদের উচিত;  গুনাহ থেকে ফিরে আসা, মানুষের হক আদায় করা, পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জন করা,
হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করা এবং আল্লাহর কাছে অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

কারণ যে ব্যক্তি সত্যিকারের তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে নিরাশ করেন না। কিন্তু যে ব্যক্তি গুনাহে অটল থাকে এবং তওবা করে না—সে শবে কদরের মতো মহিমান্বিত রাতেও ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *