ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত অবস্থায় কোমায় আছেন—এমন দাবি করেছে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড দ্য সান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান হামলায় গুরুতর আহত হয়ে তিনি অন্তত একটি পা হারিয়েছেন এবং বর্তমানে তেহরানের একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যায় (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।
মোজতবা খামেনি হলেন ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক হামলায় আলী খামেনির মৃত্যুর পর মোজতবাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে সামনে আনা হয়। তবে ওই হামলাতেই বা তার কাছাকাছি সময়েই মোজতবা গুরুতর আহত হন বলে দাবি করা হয়েছে।
একটি গোপন সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনিকে বর্তমানে তেহরানের ঐতিহাসিক এলাকায় অবস্থিত সিনা ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের একটি সিল করা অংশে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের ওই অংশ কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে এবং সাধারণ রোগী বা কর্মীদের সেখানে প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গোপন সূত্রটি নিজের নিরাপত্তার কারণে পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। তিনি তেহরান থেকে বার্তা পাঠিয়ে দাবি করেন, মোজতবার একটি বা দুটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর যকৃৎ বা পাকস্থলীতেও গুরুতর ক্ষতি হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে কোমায় রয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী—মোজতবার চিকিৎসার দায়িত্বে রয়েছেন ইরানের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও চিকিৎসা শিক্ষা মন্ত্রী মোহাম্মদ রেজা জাফরগজানি। তিনি একজন অভিজ্ঞ ট্রমা সার্জন এবং অতীতে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আট বছর ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। সেই যুদ্ধে তিনি নিজেও রাসায়নিক অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছিলেন।
সূত্রটি আরও দাবি করেছে, হাসপাতালের ট্রমা টিমের সদস্যদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন—মোজতবার অবস্থা ‘খুবই সংকটজনক’। চিকিৎসায় তাঁকে সহায়তা করছেন দেশটির ‘শহীদ বেহেশতি ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস’-এর জ্যেষ্ঠ সার্জন ডা. মোহাম্মদ মারাশি।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এখন মোজতবা খামেনিকে ‘রমজানের যোদ্ধা’ বা ‘যুদ্ধে আহত প্রবীণ’ হিসেবে উল্লেখ করছে। এতে তাঁর আহত হওয়ার বিষয়টি পরোক্ষভাবে স্বীকার করা হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যদি তিনি কোমায় থাকেন, তাহলে বর্তমানে ইরানের যুদ্ধ ও সামরিক কৌশল কে পরিচালনা করছেন?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এখন রয়েছে দেশটির প্রভাবশালী ‘ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ (আইআরজিসি)–এর হাতে। আলী খামেনি জীবিত থাকাকালেই সম্ভাব্য নেতৃত্ব সংকট মোকাবিলার জন্য একটি বিকল্প কাঠামো তৈরি করেছিলেন। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরানকে ৩১টি আঞ্চলিক কমান্ডে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি কমান্ডের দায়িত্ব দেওয়া হয় আইআরজিসি-এর স্থানীয় নেতৃত্বের হাতে। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দুর্বল হলেও বা নিহত হলেও সামরিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সক্ষমতা থেকেই যায়।
এই ব্যবস্থার কারণে এখন তেহরানে কোনো সক্রিয় নেতা না থাকলেও বিভিন্ন কমান্ড সেন্টার থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক নির্বাসিত ইরানি বিশ্লেষক বলেছেন, ‘মোজতবা খামেনি তার বাবার মৃত্যুর পর এখন পর্যন্ত কোনো বক্তব্য দেননি বা টেলিভিশনে উপস্থিত হননি। এতে অনেকের ধারণা হয়েছে তিনি হয়তো গুরুতর আহত বা এমনকি মৃতও হতে পারেন। কিন্তু সেটি এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে যা একজন নেতাকে ছাড়াও চলতে পারে।’
এদিকে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামলায় মোজতবা খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী জাহরা, আট বছর বয়সী ছেলে বাঘের এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য ছিলেন।
ইসরায়েলি একটি সরকারি সূত্রের মতে, মোজতবা খামেনি আহত হয়েছেন—এ বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার ওপর যুদ্ধের গতিপথ খুব বেশি নির্ভর করছে না। কারণ প্রকৃত ক্ষমতা এখন আইআরজিসির হাতে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি মোজতবা খামেনি দীর্ঘ সময় অচেতন বা অক্ষম অবস্থায় থাকেন, তাহলে ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্য আরও বেশি করে সামরিক বাহিনীর দিকে ঝুঁকে যেতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এই প্রতিবেদনের অনেক তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কারণ বর্তমানে ইরানে ব্যাপক ইন্টারনেট বিধিনিষেধ এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণ চলছে। ফলে মোজতবা খামেনির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে এখনো ব্যাপক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।







