রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উত্তাল পাকিস্তান-আফগানিস্তান

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। আফগানিস্তানের সীমান্তে এই সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ২২৮ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে তালেবান সরকারের দাবি, সংঘর্ষে ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করা হয়েছে। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র এ কথা জানান।

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘর্ষে অন্তত ৩১৪ জন তালেবান যোদ্ধা আহত হয়েছেন। আফগানিস্তানে হামলা করে তালেবানের ৭৪টি নিরাপত্তা চৌকি পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়। এছাড়াও ১৮টি চৌকি পাকিস্তান সেনাবাহিনী দখলে নিয়েছে।

আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সীমান্তে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পোস্টের বিরুদ্ধে পরিচালিত পাল্টা অভিযান শেষ হয়েছে। সেনাপ্রধান ফাসিহউদ্দিন ফিতরাতের নির্দেশে স্থানীয় সময় রাত ১২টায় অভিযান সমাপ্ত করা হয়।

বিবৃতিতে দাবি করা হয়, অভিযানে পাকিস্তানের ৫৫ জন সেনা নিহত হয়েছেন। এছাড়া আফগান বাহিনী কয়েকশ হালকা ও ভারী অস্ত্র জব্দ করেছে এবং কয়েকজন সেনাকে জীবিত আটক করেছে।

আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, অভিযানের সময় পাকিস্তান বাহিনীর দুটি সদরদপ্তর ও ১৯টি চেকপোস্ট দখল করা হয়েছে। অন্যদিকে, সংঘর্ষে আটজন আফগান সেনা নিহত এবং আরও ১১ জন আহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাব দিতেই এ অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

সীমান্তে চলছে গোলাগুলি

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি প্রধান সীমান্ত ক্রসিংয়ে গুলি ও গোলাবর্ষণের শব্দ শোনা গেছে। সংবাদমাধ্যম এএফপি এমন তথ্য জানিয়েছে। পাকিস্তানের তোরখাম শহর এবং আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশ সংযোগকারী তোরখাম ক্রসিং দুই দেশের মধ্যে বাসিন্দাদের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। গত অক্টোবরে সীমান্ত সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে স্থল সীমান্ত বেশিরভাগই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে তোরখাম ক্রসিংসহ কয়েকটি এই তালিকায় নেই।

পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার জন্য অনেক আফগান নাগরিক এই ক্রসিং ব্যবহার করেন। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার আবহে তাদের অনেকেই ক্রমবর্ধমান চাপে রয়েছেন। জীবনযাত্রার অবনতির কথাও বলেছেন।

আরও পড়ুন:  এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে অনুপস্থিত ১৯৩৫৯, বহিষ্কার ২৫

একজন প্রাদেশিক কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছেন, ক্রসিংয়ের কাছে থাকা শিবিরে বৃহস্পতিবার রাতে চালানো হামলায় বেশ কয়েকজন শরণার্থী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন গুরুতর আহত হন বলে জানা গেছে। পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে ফিরেছেন এমন এক ব্যক্তি এএফপিকে জানিয়েছেন, তিনি রক্ত দেখেছেন। আহত শিশু ও নারীদেরও দেখেছেন। অন্য এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তাড়াহুড়ো করে সবাই পালিয়েছেন।

আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আখুন্দজাদা নিহত

আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা থিঙ্কট্যাংক সংস্থা ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (ওসিন্ট)- এর ইউরোপ শাখা এক বার্তায় চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে। বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পরিচালিত ‘অপারশন গজব-লিল হক’ অভিযানে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা নিহত হয়েছেন।

এনিয়ে শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৬ টা ৩ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করেছে ওসিন্ট ইউরোপ। সেখানে বলা হয়েছে, কাবুলে সদরদপ্তর লক্ষ্য করে পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর হামলায় আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাসহ কয়েকজন সিনিয়র তালেবান কমান্ডার নিহত হয়েছেন।

আরও পড়ুন:  ভারত-পাকিস্তানকে ৩৫০ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিয়েছিলাম : ট্রাম্প

তবে তালেবান সরকারের পক্ষ থেকে এনিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া পাকিস্তানের হামলায় নিহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি আফগানিস্তানের। উল্টো আফগানিস্তান দাবি করেছে, তাদের হামলায় পাকিস্তানের অন্তত ৫৫ জন সেনা নিহত হয়েছে।

২০২১ সালে আফগানিস্তানে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা দখল করে সরকার গঠন করে তালেবান বাহিনী। এই বাহিনীর শীর্ষনেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা তালেবান সরকারের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন। তালেবান সরকার তার নির্দেশ ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ী চলে।

পাকিস্তানের তিন শহরে আফগানদের হামলা

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের তিনটি শহরে ড্রোন হামলা চালিয়েছে আফগানিস্তান। তবে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সব ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে এবং কোনো জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তাতার বলেন, আফগানিস্তান থেকে অ্যাবোটাবাদ, সোয়াবি ও নোসেরাতে ড্রোন প্রবেশ করেছিল। এসময় ড্রোন বিধ্বংসী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে সবগুলো ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

এর আগে আফগান তালেবান সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তারা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি সামরিক স্থাপনাসহ একাধিক স্থানে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়া প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলার জবাব হিসেবে এই পাল্টা আঘাত হানা হয়।

আফগান পক্ষের ভাষ্যমতে, ইসলামাবাদের ফয়জাবাদ, নোসেরার একটি সেনা ক্যাম্প, জামরুদের একটি সামরিক ঘাঁটি এবং অ্যাবোটাবাদের একটি মিলিটারি কমপ্লেক্স লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে খাইবার পাখতুনখাওয়া সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের ওপর অতর্কিত হামলার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। এরপর পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয় যা শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত চলতে থাকে।

আরও পড়ুন:  যুদ্ধ বিরতির প্রথম দিনেই ১৯৬টি ত্রাণবাহী ট্রাক ঢুকেছে গাজায়

‘ভেবেছিলাম ভূমিকম্প হয়েছে, তারপরই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শুনি’

কাবুলের ৬ নম্বর জেলার দাশতি বারচি এলাকার একজন বাসিন্দা জানিয়েছেন পাকিস্তানের হামলার সময় একটি বিস্ফোরণে তার বাড়ি প্রচণ্ডভাবে কেঁপে ওঠে। তিনি বলেন, শুরুতে আমরা ভেবেছিলাম এটা ভূমিকম্প, কারণ কয়েক দিন আগে কাবুলে ভূমিকম্প হয়েছিল। তারপরই আমরা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানানো ওই বাসিন্দা বলেন, দাশতি বারচির মানুষ বিস্ফোরণের পরপরই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে এবং পুরো রাত জেগে থাকে। এরপর আর কেউ ঘুমায়নি। সবাই ভয় পাচ্ছিল।

তিনি আরও জানান, বিস্ফোরণের অল্প কিছুক্ষণ পর কাবুলের আকাশে যুদ্ধবিমান উড়তে দেখা গেছে। যখন আমরা মাথার ওপর জেট উড়তে দেখলাম, বুঝতে পারলাম এগুলো পাকিস্তানের সামরিক বিমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *