প্রমত্ত পদ্মা নদীতে রাতভর মাছ ধরেছেন মাঝি রিপন মৃধা। ভোরে পা ধুতে ধুতে কাছাকাছি জায়গার একটি বাজারের দোকানের দেয়াল ও শাটারে চোখ বুলিয়ে নেন তিনি।
বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের রাজবাড়ী জেলার এই এলাকায় কিছুদিন আগেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের বড় বড় পোস্টার ও ব্যানার টাঙানো ছিল। সেই সব চিহ্ন এখন আর নেই।
১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের প্রায় কোনো চিহ্নই আর সেখানে চোখে পড়ে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাসিনার সেই স্বৈরশাসনের অবসান হয়। উৎখাত হওয়ার পর তিনি তার ঘনিষ্ঠ মিত্র প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে গিয়ে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন।
নির্বিচারে আন্দোলনকারীদের গুম ও হত্যা করার অভিযোগে অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
হাসিনা-বিরোধী বিক্ষোভের সময় এক হাজার চার’শর বেশি মানুষ হত্যার ঘটনায় তার ভূমিকার জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বিচার করে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রহসনের বিচার করার জন্য ২০১০ সালে শেখ হাসিনা নিজে ওই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি হাসিনাকে উৎখাতের পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আজীবন আওয়ামী লীগের ভোটার রিপন মৃধা বলেন, তিনি যে দলকে সমর্থন করেন, সেই দলকে নিষিদ্ধ করার পর নির্বাচন নিয়ে তার তেমন আগ্রহ নেই।
এরপরও তিনি হয়তো ভোট দেবেন। কিন্তু ব্যালটে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক না থাকায় কোন দলকে ভোট দেবেন, তা নিয়ে এখনো দোটানায় আছেন।
প্রায় ৫০ বছর বয়সি মাঝি রিপন মৃধা জানান, পরিবারের সদস্যরা ভয় পাচ্ছেন যে ভোট না দিলে তারা আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন।
এটা এমন সময়ে হতে পারে যখন কয়েক দশকের হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ঘটনায় হাসিনা ও তার দল এখনো ব্যাপক ক্ষোভের মুখে রয়েছে।
হাসিনার শাসনামলে আওয়ামী লীগের প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামী পদ্ধতিগত নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। দলটির কয়েকজন নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে এবং অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
তাদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও ছিলেন। গত ডিসেম্বরে তিনি মারা গেছেন। তার ছেলে এবং বিএনপির বর্তমান চেয়াম্যান তারেক রহমান ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ডিসেম্বরেই দেশে ফিরেছেন।
বাংলাদেশে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলার মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত হচ্ছে। এতে নিহতের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এখন অন্যান্য দলের সাধারণ সমর্থকদের মতো আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থকেরা রেহাই পাচ্ছেন না। নেতাদের বিগত দিনের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট ক্ষোভের কারণে তারা রোষানলের শিকার হচ্ছেন।
রিপন মৃধা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা যদি ভোট না দিই, তাহলে আমরা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারি। সে কারণে আমাদের পরিবারের সদস্যরা ভোটকেন্দ্রে যাবে।’
যেসব এলাকায় একসময় আওয়ামী লীগ আধিপত্য ছিল, সেখানে দলটির পুরোনো সমর্থকদের সঙ্গে আলাপ করে বোঝা যায়, তাদের মনোভাব বিভক্ত হয়ে পড়েছে। অনেকে ভোটকেন্দ্রে যাবেন বলে জানালেও অন্যরা আদৌ ভোট দেবেন না বলে জানিয়েছেন।
গোপালগঞ্জে রিকশাচালক সোলায়মান মিয়া বলেন, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা এ বছর ভোট দেবেন না। তার ভাষায়, ‘ব্যালটে নৌকা ছাড়া নির্বাচন কোনো নির্বাচন না।’ গোপালগঞ্জের অনেক বাসিন্দা তার সঙ্গে একমত।
ঢাকার কেন্দ্রস্থল গুলিস্তান এলাকায় রয়েছে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়। সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় সেখানে ভাঙচুর ও আগুন লাগানো হয়। এর পর থেকে পরিত্যক্ত ওই ভবনে গৃহহীনেরা আশ্রয় নিয়েছেন। ভবনের কিছু অংশ গণশৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কার্যালয়ের বাইরে হকার আবদুল হামিদ বলেন, কয়েক মাস ধরে এই এলাকার আশপাশে আওয়ামী লীগের কর্মীদের দেখেননি।
তিনি বলেন, ‘আপনি এখানে আওয়ামী লীগের কোনো সমর্থককে পাবেন না। কেউ সমর্থক হলেও তা কখনো স্বীকার করবে না। আওয়ামী লীগ আগেও সংকটে পড়েছে, কিন্তু কখনো এ রকম প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়নি।’
কাছেই আরেকজন হকার সাগর, উলের তৈরি মাফলার বিক্রি করছেন, যেগুলোতে বিএনপি এবং তার সাবেক মিত্র ও বর্তমানে প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক রয়েছে।
সাগর বলেন, ‘এই দলগুলোর মাফলার ভালোই বিক্রি হচ্ছে।’ আওয়ামী লীগ কিছু সমর্থক দলের ফিরে আসার বিষয়ে আশাবাদী।
ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আরমান বলেন, ‘দল হয়তো কৌশলগত নীরবতা পালন করে থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাওয়া অনেক দূরের বিষয়।’
আরমান আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে। আর যখন ফিরবে, শেখ হাসিনাকে নিয়েই ফিরে আসবে।’
তবে ঢাকার রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জবান ম্যাগাজিনের সম্পাদক রেজাউল করিম রনি এতটা নিশ্চিত নন। তিনি মনে করেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের টিকে থাকা কঠিন হবে।
রেজাউল করিম রনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘যদি আওয়ামী লীগকে ছাড়া নির্বাচন হয়ে যায়, তাহলে তাদের ভোটাররা ধীরে ধীরে স্থানীয় পর্যায়ে এক ধরনের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। তারা স্থানীয়ভাবে মিশে যাবে, যে দল বা শক্তি তাদের এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করবে, তাদের সঙ্গে মিশে যাবে। এভাবে তারা দৈনন্দিন জীবন সাজাতে শুরু করবে।’
রেজাউল করিম বলেন, এতে একবার নির্বাচন হয়ে গেলে আওয়ামী লীগের জন্য তার সমর্থকদের ফিরে পাওয়া কঠিন হবে। তিনি বলেন, যদিও দলের সমর্থকদের একটি অংশ এখনো হাসিনা ছাড়া দলের ভবিষ্যৎ দেখতে পান না, তারপরও দলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তার শাসনামলে কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে হতাশ।
রেজাউল করিম বলেন, ‘সমর্থকেরা বিভক্ত থাকায়, হাসিনা থাকুক বা না থাকুক, আওয়ামী লীগের জন্য আগের রাজনৈতিক অবস্থানে ফিরে আসাটা অত্যন্ত কঠিন—প্রায় অসম্ভব।’
অন্য বিশ্লেষকেরা যুক্তি দিচ্ছেন, আপাতবিরোধী মনে হলেও জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থনের সাম্প্রতিক জোয়ারে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ পুনরুত্থানের এক ধরনের প্রাসঙ্গিকতা পাওয়া যেতে পারে।







