সরকারি কর্মকর্তাদের ৫ বছরের বেশি থাকা ঠিক নয়: প্রধান উপদেষ্টা

প্রযুক্তিনির্ভর দুনিয়ায় দ্রুত পরিবর্তনশীল ব্যবস্থায় খাপ খাইয়ে নিতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তরুণদের জায়গা করে দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর মতে, প্রযুক্তির গতি এত দ্রুত যে নীতি প্রণয়নকারীরা দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য সরকারি কর্মচারীদের পাঁচ বছরের বেশি সরকারে থাকা ঠিক নয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছর পরপর নতুন করে ঢেলে সাজানো উচিত।

রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফসিসি) আজ বুধবার একটি অনুষ্ঠানে এভাবেই বক্তব্য শুরু করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এভাবেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস এই বিশেষ প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই ধরনের সমাবেশে আমরা কী আলাপ করি, কী চিন্তা করি, ভবিষ্যতের জন্য কী স্বপ্ন দেখি এবং কী রকম প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন করি, তার ওপরে। আগামী বিশ্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বিশ্ব এবং এর পরিবর্তনের গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। আমরা যদি নিজেদের গতি দ্রুত না করি এবং ওই গতির সঙ্গে নিজেদের সামঞ্জস্য বিধান না করি, তবে আমরা অনেক পেছনে পড়ে যাব।’

প্রযুক্তি খাতকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বর্তমানে আমরা চিন্তায়, কাজে ও নীতিতে পিছিয়ে আছি, কারণ, আমরা এই খাতকে অন্য সাধারণ ১০টা খাতের মতো মনে করছি। কিন্তু এই খাত হলো মূল খাত, যেখান থেকে আমাদের ও সারা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ রচনা হবে। পরিবর্তনের এই ছোঁয়া পাওয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।

আরও পড়ুন:  হাদিকে গুলি: মূল অভিযুক্ত ফয়সালের স্ত্রী ও প্রেমিকাসহ আটক ৩

উদাহরণ দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘আমরা সবাই এটা অনুভব করি, যখন নিজেদের পরিবারের দিকে তাকাই। আজকের ১০ বছরের একটি শিশু প্রযুক্তির ব্যবহারে যেভাবে দক্ষ, ২৫ বছর পর বর্তমান প্রজন্মকে তার কাছে “গুহাবাসী” মনে হবে। তাদের ভাষা ও চিন্তা আমাদের থেকে আলাদা। নেতৃত্বের এই অক্ষমতা আমাদের দোষ নয়, বরং আমাদের মস্তিষ্ক তাদের মতো করে কাজ করে না। এই দূরত্ব সামাল দেওয়াই হলো আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।’

ডিজিটালাইজ করা মানে জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া, কিন্তু সেটি হচ্ছে না বলে অসন্তোষ প্রকাশ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘সরকার বলছে—আমরা সবকিছু ডিজিটালাইজ করে দেব, কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায় না। ডিজিটালাইজেশন মানে শুধু দপ্তরের ভেতরে কম্পিউটার বসানো নয়, বরং সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। নাগরিককে যেন সরকারের কাছে আসতে না হয়, বরং সরকারি সার্ভিসই নাগরিকের কাছে যাবে। তথ্যপ্রযুক্তির শক্তি এটাই হওয়া উচিত। নাগরিককে যখন সরকারের কাছে আসতে হয়, তখনই দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। সুতরাং, প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই যোগাযোগ সরাসরি করতে হবে, যাতে দুর্নীতির সুযোগ না থাকে।’

‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’ আমাদের উদ্ভাবনী যাত্রায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সামনে অনেক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, যার নেতৃত্বে ছিল তরুণেরা। এই তরুণেরাই শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে। আজকের তরুণ প্রজন্ম পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজন্ম। তাদের শক্তিকে আমাদের স্বীকৃতি দিতে হবে। প্রযুক্তিই তাদের এই শক্তির উৎস।’

আরও পড়ুন:  টাইম ম্যাগাজিনের ১০০ প্রভাবশালীর তালিকায় ড. ইউনূস

জুলাই আন্দোলনের কথা স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘ইন্টারনেট যখন বন্ধ করে দেওয়া হলো, তখন সারা দেশের তরুণেরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। এই ইন্টারনেট বন্ধ করার বিষয়টি একটি স্বৈরাচারী সরকারকে বিদায় করার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। সম্প্রতি আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটির ১২টি স্কুলে ইন্টারনেট সংযোগ দিতে পেরেছি। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ওই শিশুদের ভিডিও কনফারেন্সের মুহূর্তটি ছিল এক অদ্ভুত অনুভূতি। বাংলাদেশের এক অংশ ইন্টারনেট সুবিধা পাবে আর অন্য অংশ পাবে না—এটি কাম্য নয়। আমাদের নীতি হওয়া উচিত—সবার জন্য সমান সুযোগ। পার্বত্য অঞ্চলে আড়াই হাজার স্কুল আছে, আমরা মাত্র ১২টি দিয়ে শুরু করেছি। প্রযুক্তি আমাদের পৃথিবীর নাগরিক করেছে, আমাদের গতিহীনতা আমাদের শেষ করে দেবে।’

চাকরিকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য না করার পরামর্শ দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘আমরা বরাবরই বলে আসছি—সবাইকে চাকরি দেব। কিন্তু চাকরি বিষয়টি এসেছে “দাসপ্রথা” থেকে। মানুষের জন্ম হয়েছে একজন সৃজনশীল জীব হিসেবে, দাস হিসেবে নয়। প্রযুক্তি আমাদের নিজস্ব কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করার এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সার্থকতা হবে প্রতিবছর কত শতাংশ তরুণকে উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করা গেল, তার ওপর। আমি তরুণদের বলব, সরকারের কাছে টাকা বা জমি না চেয়ে নীতি ঠিক করে দেওয়ার দাবি জানান। যে সরকার দিতে চায়, তাকে সন্দেহের চোখে দেখবেন।’

আরও পড়ুন:  যুক্তরাষ্ট্র-ভারতসহ চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক

প্রযুক্তির গতি এত দ্রুত যে নীতি প্রণয়নকারীরা দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমার মতে, সরকারি কর্মচারীদের পাঁচ বছরের বেশি সরকারে থাকা ঠিক নয়, কারণ, তাদের মন একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে আটকে যায়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছর পরপর নতুন করে ঢেলে সাজানো উচিত, কারণ, পৃথিবী প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে। প্রযুক্তির কাজ হলো পুরোনোকে ফেলে দেওয়া আর সরকারের ধর্ম হলো পুরোনোকে আঁকড়ে ধরা। এই দ্বন্দ্বে প্রযুক্তিকেই জিততে হবে।’

সবশেষে একটি দুঃখজনক বিষয়ের উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ জালিয়াতির ক্ষেত্রে বিশ্বে পরিচিতি পাচ্ছে। জাল সার্টিফিকেট, জাল ভিসা ও পাসপোর্টের কারণে অনেক দেশ বাংলাদেশিদের প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না। এটি একটি জালিয়াতির কারখানা হতে পারে না। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের এই কলঙ্ক মুছে ফেলতে হবে। আমরা তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ দেব এবং একটি মানুষের সহায়ক সরকার গঠন করব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *