ভয়াবহ তুষারঝড়ের কবলে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রভাবে দেশটিতে এরই মধ্যে ১৩ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। নিউ মেক্সিকো থেকে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ১৪ কোটি মানুষ শীতকালীন ঝড়ের সতর্কতার আওতায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত দক্ষিণ রকি পর্বতমালা থেকে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় ভারী তুষারপাত, শিলাবৃষ্টি ও বরফবৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে টানা কয়েক দিন তীব্র শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের আবহাওয়াবিদ অ্যালিসন সান্তোরেলি বলেন, তুষার ও বরফ খুব ধীরে গলবে, দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা কঠিন হবে। এতে উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
ঝড়ের প্রভাবে অন্তত এক ডজন অঙ্গরাজ্যে জরুরি অবস্থা জারির অনুমোদন দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটির ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে আগাম ত্রাণসামগ্রী, জনবল এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার দল মোতায়েন করেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টি নোম। তিনি জনগণকে অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঝড়ের তাণ্ডবে শনিবার পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বাড়িঘরে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। টেক্সাস ও লুইজিয়ানায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। টেক্সাসের শেলবি কাউন্টিতে বরফে ভারী হয়ে গাছ ভেঙে বিদ্যুৎ লাইন ছিঁড়ে পড়েছে, ফলে জেলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাসিন্দা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন।
বরফবৃষ্টিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ঘূর্ণিঝড়ের সমতুল্য হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আবহাওয়াবিদরা।
বাতিল হাজার হাজার ফ্লাইট
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটঅ্যাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ও রোববার মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ১৩ হাজার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ওকলাহোমা সিটির উইল রজার্স আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শনিবারের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়। ডালাস–ফোর্ট ওয়ার্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ৭০০র বেশি প্রস্থানকারী ফ্লাইট বাতিল হয়।
শিকাগো, আটলান্টা, ন্যাশভিল ও নর্থ ক্যারোলিনার শার্লটসহ বড় বড় বিমানবন্দরেও ফ্লাইট বিঘ্নের খবর পাওয়া গেছে। ওয়াশিংটনের রোনাল্ড রিগ্যান জাতীয় বিমানবন্দর থেকে রোববারের প্রায় সব প্রস্থানকারী ফ্লাইট আগেভাগেই বাতিল করা হয়।
দক্ষিণাঞ্চল অতিক্রম করার পর ঝড়টি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রবেশ করবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন আবহাওয়া বিভাগ। ওয়াশিংটন থেকে নিউইয়র্ক ও বোস্টন পর্যন্ত এলাকায় প্রায় ৩০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত তুষারপাত হতে পারে।
মিডওয়েস্ট অঞ্চলে বাতাসের সঙ্গে অনুভূত তাপমাত্রা নেমে এসেছে শূন্যের নিচে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত। উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের রাইনল্যান্ডারে প্রায় তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
চরম আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ন্যাশভিলে দর্শকবিহীনভাবে আয়োজন করা হয়েছে গ্র্যান্ড ওলে অপ্রির অনুষ্ঠান, বাতিল করা হয়েছে লুইজিয়ানার মার্ডি গ্রাস প্যারেড।
যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই শীতঝড়ের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো এর ব্যাপ্তি ও পরবর্তী তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। প্রায় দুই হাজার মাইলজুড়ে দেশটির বড় অংশ এই ঝড়ের প্রভাবে পড়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরল।
শীতকালীন ঝড়ে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন দেড় লাখের বেশি মার্কিনি
ভয়াবহ শীতকালীন ঝড় ও তুষারপাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও লুইজিয়ানাসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এক লাখ ৬০ হাজারের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। তীব্র ঠাণ্ডায় বরফের ভারে গাছ ভেঙে বিদ্যুৎ লাইন ছিঁড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া বিরূপ আবহাওয়ায় ফ্লাইট বাতিল ও জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভয়াবহ শীতকালীন ঝড়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ১৩ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করেছে।
মার্কিন আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, তুষারপাত, শিলাবৃষ্টি এবং বরফশীতল বৃষ্টির সঙ্গে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা আবহাওয়া ২৫ জানুয়ারি থেকে আগামী সপ্তাহের শুরু পর্যন্ত দেশের পূর্বাঞ্চলের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকাজুড়ে বয়ে যাবে।
শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঝড়কে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে দক্ষিণ ক্যারোলিনা, ভার্জিনিয়া, টেনেসি, জর্জিয়া, উত্তর ক্যারোলিনা, মেরিল্যান্ড, আরকানসাস, কেনটাকি, লুইজিয়ানা, মিসিসিপি, ইন্ডিয়ানা ও পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় ফেডারেল জরুরি দুর্যোগ অবস্থা ঘোষণার অনুমোদন দিয়েছেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি এবং ঝড়ের কবলে থাকা সব অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছি। নিরাপদ থাকুন এবং উষ্ণ থাকুন।’
মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি জানিয়েছে, ১৭টি অঙ্গরাজ্য এবং ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া (ওয়াশিংটন ডিসি) ইতোমধ্যে আবহাওয়া সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা জারি করেছে।
শনিবার বিকালে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে আমাদের হাজার হাজার মানুষ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় আছেন। ইউটিলিটি কর্মীরা দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।’
পাওয়ারআউটেজ ডটকমের তথ্যানুযায়ী, স্থানীয় সময় শনিবার রাত ১০টা ১৭ মিনিট পর্যন্ত এক লাখ ৬০ হাজারের বেশি মার্কিন গ্রাহক বিদ্যুৎহীন ছিলেন, যার সিংহভাগই লুইজিয়ানা ও টেক্সাসের বাসিন্দা।
এদিকে, টেক্সাসে বিদ্যুৎ বিপর্যয় সীমিত রাখতে মার্কিন জ্বালানি বিভাগ শনিবার একটি জরুরি আদেশ জারি করেছে। এর মাধ্যমে টেক্সাসের ইলেকট্রিক রিলায়েবিলিটি কাউন্সিলকে ডেটা সেন্টার এবং অন্যান্য বড় স্থাপনাগুলোতে ব্যাকআপ জেনারেটর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর সতর্ক করে বলেছে, এই দীর্ঘস্থায়ী তুষারঝড়টি দক্ষিণ-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক বরফ জমিয়ে তুলতে পারে, যা অত্যন্ত বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলতে পারে। সোমবারের মধ্যে গ্রেট প্লেইনস অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ শীত এবং বিপজ্জনক ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটঅ্যাওয়ার-এর তথ্যমতে, শনিবার রাত ১০টা ২১ মিনিট পর্যন্ত চার হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া রবিবারের জন্য নির্ধারিত আরও ৯ হাজার ৪০০-এর বেশি ফ্লাইট আগাম বাতিল করা হয়েছে। ডেল্টা, ইউনাইটেড এবং জেট ব্লু-র মতো বড় এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।







