মার্কিন-ইরান উত্তেজনা রোধে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো

ইরানে চলমান দেশজুড়ে বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হুমকিতে গভীর উদ্বেগে রয়েছে আরব উপসাগরীয় দেশগুলো। তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রকে সংযত থাকতে অনুরোধ জানাচ্ছে তারা।

পর্যবেক্ষকদের মতে, পর্দার আড়ালে সৌদি আরব ওয়াশিংটনকে ইরানে হামলা না চালানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। একই সঙ্গে কাতার ও ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। গত বুধবার ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগ ভেঙে পড়েছে- এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই তিন দেশ উত্তেজনা প্রশমনে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে।

গালফ বিশ্লেষক আন্না জ্যাকবস খালাফ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রচলিত যোগাযোগ চ্যানেলগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারছিল না, ওয়াশিংটনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী।’

দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুহান্নাদ সেলুম বলেন, ‘গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট ছিল না। এই অনিশ্চয়তাই তাদের সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করেছে।’

আরও পড়ুন:  সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ১২১.৫৫ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে এডিবি

যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
ইরানে নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে শতাধিক নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে তেহরান। বিপরীতে বিরোধী পক্ষের দাবি, নিহত বিক্ষোভকারীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সহায়তা আসছে।’ তিনি কী ধরনের হামলার কথা ভাবছেন তা স্পষ্ট না করলেও, এই বক্তব্যই গোটা অঞ্চলকে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বাধ্য করেছে।

আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর আশঙ্কা, ইরানে হামলা হলে তেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়বে, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক নিরাপত্তা নষ্ট হবে এবং ইরান পাল্টা আঘাত হানতে পারে তাদের ভূখণ্ডে।

এর আগে ২০১৯ সালে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের তেল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর তেহরান কাতারের আল-উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়।

একজন ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ‘সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কসহ আঞ্চলিক দেশগুলোকে আগেই সতর্ক করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে এসব দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হবে। এর পরপরই কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটি থেকে কিছু মার্কিন কর্মী প্রত্যাহার করা হয়।’

আরও পড়ুন:  ট্রাম্প আজ এক রোমাঞ্চকর ঘোষণা দেবেন : হোয়াইট হাউস

অপ্রত্যাশিত পরিণতির ভয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের নেতৃত্ব দুর্বল দেখতে আপত্তি না করলেও, হঠাৎ শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে কে বা কী সেই শূন্যতা পূরণ করবে- এটাই তাদের সবচেয়ে বড় ভয়। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর দেশটির পতন, গৃহযুদ্ধ, আল-কায়েদা ও আইএসের উত্থান- এই অভিজ্ঞতা আরেকটি বড় দেশে দেখতে চায় না উপসাগরীয় শক্তিগুলো।

খালাফ বলেন, ‘তারা বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তা চায় না। বরং আরও উগ্র শক্তি ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাই তাদের বেশি আতঙ্কিত করে।’

কাতার, কুয়েত ও ওমান দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সঙ্গে সহাবস্থানের পথ খুঁজে নিয়েছে। কাতার তো ইরানের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রও ভাগাভাগি করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ইরানের অন্যতম বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। ফলে ইরানে অস্থিরতা হলে আমিরাতও বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।

আরও পড়ুন:  এবার মেক্সিকোকে হুমকি দিলেন ট্রাম্প

সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বৈরী হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে- তা বাস্তববাদী রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব তার উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক সংস্কার ও পর্যটন পরিকল্পনার কারণে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায়।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবেইর বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য স্থিতিশীলতা ও শান্তি, যাতে আমরা আমাদের জনগণের জন্য একটি ভালো ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি।’

তবে সৌদি বিশ্লেষক খালেদ বাতারফি বলেন, ‘ধীরে ও নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন হলে তা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু হঠাৎ শাসন পরিবর্তন ও রাষ্ট্র ভেঙে পড়া- এটা কারও জন্যই ভালো হবে না। গোটা অঞ্চল আগুনে পুড়ছে, আমরা আরেকটি আগুন দরজায় চাই না।’

সূ্ত্র/আলজাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *