মার্কিন ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিতের আওতামুক্ত যারা

বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের পাসপোর্টধারীদের ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিতের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটি শুধু অভিবাসন প্রত্যাশীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

প্রক্রিয়া স্থগিতের সিদ্ধান্তটি কার্যকর হবে আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সূত্র জানিয়েছে, এটি কার্যকরের আগ পর্যন্ত যাদের ভিসা সাক্ষাৎকারের সময় দেওয়া হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে।

দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসন প্রত্যাশীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করে আসছে। মার্কিন প্রশাসনের শঙ্কা হলো, অভিবাসীরা দীর্ঘদিন বসবাস করায় সরকারি কল্যাণ সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাই আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে জাতীয়তার ভিত্তিতে সামগ্রিকভাবে অভিবাসী ভিসা স্থগিত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর।

ফক্স নিউজের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও আছে- পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভুটান, মিয়ানমার, নেপাল, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মঙ্গোলিয়া, লাওস, কাজাখস্তান, ইরান, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া ও সিরিয়া।

প্রশ্ন উঠছে, অভিবাসী ভিসার আওতায় ঠিক কারা পড়েন? শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী বা বেড়ানোর উদ্দেশে কিংবা আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে যারা যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান তারাও কি এর আওতায় পড়বেন?

অভিবাসী বিবেচিত হন যারা
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কেবল পরিবারিক সম্পর্ক, কর্মসংস্থান, দত্তক গ্রহণ, বিশেষ শ্রেণি ও ডাইভার্সিটি ভিত্তিতে অভিবাসী ভিসা দেয়।

বিশেষ শ্রেণির আওতায় পড়বেন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি দপ্তরের হয়ে কাজ করা সাবেক কর্মীরা। এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের হার কম এমন দেশগুলোর নাগরিকদের যোগ্যতার কঠোর শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বার্ষিক ডাইভার্সিটি কর্মসূচির আওতায় অভিবাসী ভিসা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন:  মার্কিন ভিসা পেতে বন্ড জমার তারিখ জানাল দূতাবাস

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের অধীনে কোন ধরনের ভিসা প্রয়োজন হবে তা নির্ধারিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দূতাবাস বা কনস্যুলেটে আবেদন করলে, কনস্যুলার কর্মকর্তা আইন অনুযায়ী আবেদনকারীর ভিসা পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করবেন। যোগ্য হলে, কোন ভিসা শ্রেণিটি প্রযোজ্য হবে সেটিও তিনি নির্ধারণ করবেন।

ইমিগ্র্যান্ট বা অভিবাসী ভিসা আবেদনের যোগ্য হন, মার্কিন নাগরিকের স্বামী বা স্ত্রী, বাগদত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও সেখানে বসবাস করেন এমন ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং দত্তক নিতে চাওয়া কেউ। এ ছাড়া, পেশাজীবী এবং ইরাক ও আফগানিস্তানে দোভাষী কিংবা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা অভিবাসী ভিসার আওতায় পড়েন।

যাদের জন্য প্রয়োজ্য নয়
নন-ইমিগ্র্যান্ট বা অ-অভিবাসীরা নতুন নিয়মের আওতায় পড়বেন না। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ভিসা দেওয়া হয়- শিক্ষার্থী, ক্রিড়াবিদ, ব্যবসায়ী, কূটনীতিক বা অন্য দেশের সরকারি কর্মকর্তা, সেমিনার বা সম্মেলনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক ব্যক্তি, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, শিল্পী ও পর্যটকদের। উদ্দেশ্য ভেদে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার এমন মোট ৩৪টি ক্যাটাগরি আছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চাওয়া দর্শকরা নতুন সিদ্ধান্তের আওতায় পড়বেন না। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সব ভিসা আবেদনকারীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিহাস যাচাই করতে পারে।

বাংলাদেশি নন-ইমিগ্র্যান্টদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। চলতি মাসের শুরুতে ভিসা বন্ড কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এ নীতিও কার্যকর হবে ২১ জানুয়ারি থেকে। এর আওতায় বি১ ও বি২ ধরনের ভিসা পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিকে জামানত হিসেবে ৫ হাজার, ১০ হাজার কিংবা ১৫ হাজার ডলার জমা দিতে হবে। কাকে কত ডলার জামানত দিতে হবে তা নির্ধারিত হবে ভিসা সাক্ষাৎকারের সময়।

আরও পড়ুন:  সন্তান জন্মের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চাইলে বাতিল হবে ভিসার আবেদন

বি১ ও বি২ কে বলা হয় ভিজিটর ভিসা। যারা সাময়িকভাবে ব্যবসার উদ্দেশে, শিক্ষামূলক, পেশাগত বা বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ, চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান তাদের ভিসার ধরন হয় বি১। আর যাদের উদ্দেশ্য থাকে ভ্রমণ, বিনোদন কিংবা চিকিৎসা তাদের দেওয়া হয় বি২ ভিসা। এই ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একটানা ৯০ দিনের বেশি থাকা যায় না।

কতদিনের জন্য স্থগিত
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন আমেরিকার অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহারের অবসান ঘটাতে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ, কিছু মানুষ আমেরিকান জনগণের সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

টমি পিগটের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭৫টি দেশ থেকে অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে। এই সাময়িক সময় বলতে পররাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক অভিবাসন প্রক্রিয়ার নিয়মের পরবর্তী পুনর্মূল্যায়নের পর্যায়কে বোঝানো হয়েছে।

আর বার্তা সংস্থা এএফপিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেছেন, এটি শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশির সংখ্যা কত
মার্কিন জনশুমারি ব্যুরোর তথ্যের বরাত দিয়ে গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টার জানিয়েছে, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ৩ লাখ মানুষ নিজেদের বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তথ্যসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে, বাংলাদেশি জনসংখ্যার হিসাব কেবল সেইসব মানুষের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যারা নিজেদের শুধু বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তাদের মধ্যে অভিবাসী ক্যাটাগরির ভিসাধারী কতজন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন:  বাংলাদেশিদের নতুন ভিসা নিয়ে যা জানাল মার্কিন দূতাবাস

পিউয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ১৯ লাখ। যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ১৫.৪ শতাংশ। একই বছরের জানুয়ারিতে এই পরিমাণ ছিল রেকর্ড ৫ কোটি ৩৩ লাখ।

২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, এই অভিবাসীদের ১ কোটি ১০ লাখের জন্ম মেক্সিকোতে। ৩২ লাখের ভারতে, চীনের ৩০ এবং ফিলিপাইনে জন্ম ২১ লাখের।

গত সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এ পর্যন্ত এক লাখের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে। যা এক বছরে সর্বোচ্চ। আর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তর গত মাসে জানিয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে ৬ লাখ ৫ হাজারের বেশি মানুষকে প্রত্যাহার করেছে। আরও ২৫ লাখ মানুষ নিজ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *