যেখানে রাস্তা মিলে যায়, স্বপ্ন ছিটকে পড়ে

চন্দন কুমার লাহিড়ী

বটগাছ আছে বলেই বটতলা। সাইজে বিশাল, বয়সে প্রবীণ। শাখা–প্রশাখা ছড়িয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে তিন রাস্তার ঠিক মাঝখানে—অথবা বলা যায়, তিনটি রাস্তা এসে তার কাছেই মিলেছে। ইট বিছানো হেরিংবোন এর সড়ক। খানাখন্দে ভরা, এবড়োথেবড়ো। পুবদিক থেকে, তিস্তা পাড়ের দিক ঘেঁষে যে পথটা শহরমূখি এসেছে, বটতলায় এসে তা দুভাগ হয়ে গেছে। খানিকটা এগোলে পশু অফিস, হাইস্কুল চিনে ফেলে ডানদিকে রেলওয়ে স্টেশন, বাঁদিকে গেলে হাসপাতাল, থানা আর ডাকবাংলা পেরিয়ে সোজা চলে যায় রংপুরের দিকে। আর ডানপাশের সেই সরু পথ ধরে বালিকা বিদ্যালয় পিছনে ফেলে একটু এগোলেই বাজার—পীরগাছা। এই বটগাছের গোড়াতেই জুপড়ির মতো একটা দোকান। মনে পরে? টং-জাতীয় ছোট্ট বসার জায়গা। দোকানের মালিক একজন সংক্ষিপ্ত চেহারার মানুষ—সাড়ে চার ফুট হবে বড়জোর। মুখে সাদা-কালো মিলিয়ে গুটিকয়েক দাঁড়ি, মাথায় টুপি। সবাই তাকে ডাকে নোয়াখালি চাচা। দোকানটা তারই। পণ্য বলতে—দুই প্যাকেট বিড়ি, আর গোটাকয়েক পান-সুপারি।

এই সামান্য সম্বলেই তার সারাদিনের বেচাকেনা। চাচা থাকেন পীরগাছায়, কিন্তু কথা বলেন নোয়াখালির ভাষায়। রংপুরি করেননি তেমন রপ্ত। আমরাও তাল মিলিয়ে সেই ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করি। কবে, কখন, কী কারণে তিনি এলাকা ছেড়ে এখানে এসেছেন—তা কেউ জানে না। কেনই বা পিতৃভূমি ফেলে এলেন? সেটিও অজানা। নদীর পাড় ভাঙতে ভাঙতে একসময় মানুষ সব হারিয়ে অন্য পাড়ে গিয়েই বাসা বাঁধে কিন্তু নদীর পাড় ছাড়ে না মানুষ—শুধু পাড় বদলায়। কিন্তু নোয়াখালি ফেলে ডজন ডজন মানুষ এ অঞ্চলে। নতুন বাসা, নতুন জীবন। আর এই বটতলায় একমাত্র দোকানের মালিক নোয়াখালি চাচাই। চারপাশে বাড়িঘর। সংলগ্ন এলাকাতেই বসাকদের বাড়ি। প্রফুল্ল বসাক—নাম যেমন, মানুষটা ঠিক তার উল্টো; সারাক্ষণ ভাবগম্ভীর। সওদাগরি ব্যবসা। উল্টো দিকে জামাল ডাক্তারের বাড়ি। স্থানীয় হাসপাতালের স্টোরের দায়িত্বে চাকরি করেন, তবু মানুষ তাকে ডাক্তার বলেই চেনেন /ডাকেন। হয়তো হাসপাতালে চাকরি করলেই মানুষ ডাক্তার হয়ে যায়। দাপুটে লোক। টিএনও সাহেবের বাসার পেছন ঘেঁষে তার বাড়ি। সামনে ছোট একটা পুকুর—ডোবার মতো।

আরও পড়ুন:  মাটির টানে ভাটির দেশে অনিন্দিতা দাস

দোকানের পাশেই কম কথা বলা নুরুজ্জামান মাস্টার, ঘর তুলেছেন বটে, কিন্তু চালের কল তখনো চালু হয়নি। এরপর এক বাড়ি পেরোলেই হরমনদার বাড়ি। আচমকা তার হরমনের প্রভাব বেড়ে বিগড়ে গিয়েছিলেন। সবাই মূলত গ্রাম থেকে এখানে এসে নতুন বসতি গড়ে তুলেছেন। বিনিময়ে ভোগ করছেন কারেন্টের আলো আর হেড়িং বোনের রাস্তা। খানিকটা সময়ের আলো হয়ত অন্ধকার ঘুচায় কিন্তু পথ আগায় না। সাইকেল চালিয়ে ক্লান্ত পথিক, কিংবা পায়ে হাঁটা মানুষ—সবাই খানিকক্ষণ এখানে বসে জিরোয়। দু-চারজন রিকশাওয়ালাও মাঝে মধ্যে এসে ভিড় করে। দোকানটা তখন সরগরম হয়ে ওঠে। পাওনা বুঝে না পেলে চাচা মাঝেমধ্যে চিৎকারও করেন। কেউ মুখে পান গুঁজে আয়েশ করে বিড়িতে টান দেয়। চাচার সঙ্গে দ্বিমাত্রিক ভাষায় আড্ডা চলে। রংপুরের মানুষের মূখে বিকৃত নোয়াখালির ভাষা, সে এক দৃশ্য বটে। চাচা নিজে বিড়ি খান না, খানিকটা ফোকলা দাঁতে সুপারি চিবোন। মাঝে মাঝে চাচি এসে দোকান পাহারায় দাঁড়ান। চাচার একমাত্র ছেলে। পড়াশুনা করতে চায় না। তাই তার মনে বড় কষ্ঠ। এই পুরো এলাকায় একমাত্র দোকানের অধিপতি নোয়াখালি চাচা। সকাল, সন্ধ্যা, শীত, বৃষ্টি—সব সময়ই তার দোকান খোলা। সকালে চাচার দোকান পেরিয়ে একদিকে সড়ক ধরে মেয়েরা, অন্যদিকের সড়ক ধরে ছেলেরা—স্কুলমুখী হয়।

আরও পড়ুন:  বসন্ত এসে গেছে

বটগাছের ছায়ায়, এই ছোট্ট দোকানকে ঘিরেই কত গল্প, কত যাওয়া–আসা—চুপচাপ জমে থাকে। ভাবছি, এই নোয়াখালি চাচার দোকানকে কেন্দ্র করেই যেন একটা ছোট্ট জগৎ ঘুরে চলে। তারপর এখান থেকে সেসব স্বপ্ন আর গল্প কখনো ট্রেনে করে আবার কখনো তিস্তা নদীর পাড়ে গিয়ে দূর দুরান্তে হারিয়ে যায়। স্বপ্ন হারায় মন পরে থাকে বটতলায়। সকাল বেলার মন। বিকেল বা সন্ধে বেলার মন। কিংবা মনের মানুষের মন। একদিন প্রতিদিন। সকাল সাড়ে নটা ছুঁইছুঁই। স্কুলড্রেস পরা একটি ছেলে এসে নোয়াখালি চাচার দোকানের আড়ালে দাঁড়ায়। দাঁড়ানোটা আসলে দাঁড়ানো নয়—এক ধরনের অপেক্ষা। চোখ দুটো রাস্তার দিকেই থাকে, কিন্তু মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও। ঘড়ির কাঁটা দশটার দিকে এগোতেই সে হঠাৎ হনহনিয়ে ছোটে স্কুলমুখী। ঠিক একই সময়ে, বামদিকের রাস্তা ধরে আরেকজন—একই বয়স, একই তাড়া, একই উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে চলে সামনে। দুই গতির মাঝে ক্ষণিকের জন্য চোখাচোকি। খুব অল্প সময়। কথা হয় না, থামা হয় না—শুধু দৃষ্টি বিনিময়। তারপর দুজনার দুটি পথ, নিজ নিজ গতির ভেতরে। সময় বয়ে চলে। তিস্তা তার ভয়ার্ত রুপ হারায়। কিন্তু সেই দৃষ্ঠিবিনিময় হারায় না। আজও তা থেমে থাকে বটতলায়। সময় আর জীবনের ভিড়ে চাপা পড়ে থাকা এক অসম্পূর্ণ মুহূর্ত হয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *