বছরজুড়ে যত বড় ঘটনা

২০২৫ বাংলাদেশের জন্য আর পাঁচটা বছরের মতো নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারের পারদর্শিতা মূল্যায়নের জন্য ওই বছরের শেষ পাঁচ মাস যথেষ্ট ছিল না। ২০২৫ সেই পূর্ণাঙ্গ বছর, যে বছরের পুরোটা সময় পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। নির্ধারিত সময়, অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলে অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় তেমন একটা নেই।

বছরটি শুরু হয় কর বাড়ানোর মধ্য দিয়ে। গত ১ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের সভায় মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধনী) অধ্যাদেশ-২০২৫-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে ৪৩ ধরনের পণ্য ও সেবার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়, যা পরে কিছু ক্ষেত্রে কমানো হয়েছিল।

৭ জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাঁকে বিদায় জানাতে রাস্তায় মানুষের ঢল নামে। পরে খালেদা জিয়া দেশে ফেরেন। তবে অসুস্থতাকে সঙ্গী করে হাসপাতাল–বাসায়ই দিন কাটাতে হচ্ছিল তাঁকে। বছরের শেষে তাঁর জীবনাবসান ঘটে, আর এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

ভারতে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বক্তৃতা প্রচারের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে বিক্ষোভের মধ্যে ভাঙা হয় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি। ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত মৃত্যুর তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের (২০২৪) মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সমাবেশ করে আত্মপ্রকাশ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যে দলটি ২৮ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় গেছে।

আরও পড়ুন:  অভিনেতা মাহফুজ আহমেদের ব্যাংক হিসাব তলব

ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের হাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ১৬ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালত বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। বিচারিক আদালতের রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১০ মে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০ মে বাংলাদেশে চালু হয় স্টারলিংক। মে মাসের শেষ দিকে নিজেকে মেয়র ঘোষণার দাবিতে নগরভবনের সামনে টানা বিক্ষোভ শুরু করেন বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন।

২২ মে খবর পাওয়া যায়, প্রধান উপদেষ্টা হতাশ, ক্ষুব্ধ। তিনি পদত্যাগের কথা ভাবছেন। যদিও পরে পদত্যাগ করেননি।

বছরজুড়ে দাবিদাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ হয়। সরকারি চাকরিজীবীরাও বাদ যাননি। কোনো ক্ষেত্রে সরকার কঠোর হয়েছে, কোনো ক্ষেত্রে হয়নি। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা অথবা দুর্বলতার সুযোগে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র থেকে লুট হয় বিপুল পাথর (মে মাস)। জুলাইয়ে গোপালগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিতে হামলাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে নিহত হন ছয়জন। ২০২৫ সালেই বহু বছর পর বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়। এতে বেশির ভাগ পদে জয় পায় ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেল।

২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে ৩৬ জন নিহত হন, এর ২৮ জনই শিক্ষার্থী। বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও নিহত হন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে গত ৫ আগস্ট জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। অক্টোবরে তৈরি হয় জুলাই সনদ। বিচার এগোতে থাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। ১৭ নভেম্বর আদালত একটি মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

আরও পড়ুন:  বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ালেন শাহরুখ খান

অক্টোবর ও নভেম্বরে কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা ঘটে। ১৪ অক্টোবর মিরপুরে রাসায়নিক গুদামে আগুনে প্রাণ হারান ১৬ জন। ১৮ অক্টোবর ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগে। ২৬ নভেম্বর মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ে নিহত হন এক যুবক। ২১ নভেম্বর ভূমিকম্পে নিহত হন ১০ জন। ২৫ নভেম্বর কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগে।

গত ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিধ্বস্ত হয় বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান, যাতে ৩৬ জন নিহত হনফাইল ছবি

বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরের ১১ তারিখে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। তার পরদিন খুন হন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি, যিনি ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। শহীদ হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে এখনো আন্দোলন চলছে।

১৮ ডিসেম্বর সংগঠিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয় প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার। সংবাদমাধ্যম দুটির কার্যালয় ভাঙচুর ও লুটপাট শেষে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হামলার শিকার হয় ছায়ানট, উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ও।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টিও বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল। ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়েছেন তারেক রহমানই।

দ্রুত নির্বাচনই ‘সমাধান’

মব সন্ত্রাস দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকার নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। এমন অবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত শক্তিশালী সরকারই সমাধান—এমন বক্তব্য জোরালো হয়।

লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্রুত নির্বাচনের চাহিদা তৈরি হওয়ার বড় কারণ দুটি। প্রথমত, নিত্যদিনের নিরাপত্তাহীনতা থেকে মানুষ মনে করেছে যে কেউ যখন-তখন আক্রান্ত হতে পারে। এই নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব সন্ত্রাস, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, নির্বিচার মামলা ইত্যাদি কারণে। দ্বিতীয়ত, মানুষ বুঝে গেছে প্রত্যাশিত সংস্কার তেমন একটা হবে না। এই সরকার পারবে না। তাই নতুন সরকারের ও তাদের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করাই ভালো হবে।

আরও পড়ুন:  মার্কিন ভিসা স্থগিতের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

আলতাফ পারভেজ আরও বলেন, যে অর্থনীতি যে ক্রমে উত্থানরহিত হয়ে পড়ছিল এবং পুলিশসহ বেসামরিক প্রশাসনে যে স্থবিরতা ও সক্রিয়তার ঘাটতি দেখা যাচ্ছিল, সেটাও এ রকম বোধ প্রবল করেছে যে অতি দ্রুত নির্বাচন না হলে রাষ্ট্র অস্তিত্বের সংকটে পড়বে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হবে বলে সরকারের আশ্বাস আছে, পুরো নিশ্চয়তা নেই। ফলে আশায় থাকতে হচ্ছে। বিখ্যাত সিনেমা দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশনে অ্যান্ডি ডুফ্রেন (অভিনেতা টিম রবিন্স) একটি চিঠিতে কারাসঙ্গী রেডকে (অভিনেতা মরগ্যান ফ্রিম্যান) বলেন, ‘আশা খুব ভালো একটি জিনিস, সম্ভবত শ্রেষ্ঠতম বস্তু; আর ভালো কোনো কিছুরই কখনো মৃত্যু হয় না।’

সিনেমাটিতে দেখা যায়, অ্যান্ডি ডুফ্রেন তাঁর জেলের কুঠুরিতে সুড়ঙ্গ খুঁড়তে ১৯ বছর সময় নিয়েছিলেন, তারপর মুক্তি। বাংলাদেশের মানুষ ৫৪ বছর ধরে সত্যিকার গণতন্ত্র, বাক্‌স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর কি এসব পাওয়া যাবে—তা নিয়ে অনিশ্চয়তাভরা এক আশা নিয়েই থাকতে হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *