চন্দন কুমার লাহিড়ী

১…
মনের মানুষ কিংবা মানুষের মন—
এই শব্দগুলো প্রথমে কাছাকাছি মনে হলেও আসলে তাদের গভীরতা এবং দূরত্ব দুটোই অসীম। একদিকে এদের মধ্যে রয়েছে নৈকট্যের অসামান্য বাঁধন, অন্যদিকে রয়েছে দুরত্বের গভীর এক রহস্যময়তা। মন আছে বলেই তো কেউ কারো মনের মানুষ হয়। মনের মানুষ হওয়ার মানে হলো, এক মনের গভীরতায় অন্য মনকে জয় করা। আর এই জয় মানেই একটি অজেয় মনের ভেতরে জয়ের নেশায় মেতে ওঠা। নেশা করেন মেতে ওঠেন তাতে তো কোন সমস্যা নেই। আর মনে রাখা প্রয়োজন যে, জয় বিজয় এতো সব শব্দের মায়াজাল। এ জালে জড়ালে নিজেকে মুক্ত করা কঠিন। অথবা মুক্তি এখানে এসে বদ্ধ হয়ে পরে। তবুও নেশায় আবিস্ট মানুষ। মনের ধারনা নিয়ে পুস্তকে বলা হয়েছে- মানুষের মন হলো চিন্তা, অনুভূতি, উপলব্ধি, স্মৃতি, ইচ্ছা ও চেতনার এক জটিল সমষ্টি, যা আমাদের সচেতন ও অচেতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করে এবং মস্তিষ্কের কার্যকলাপের উপর নির্ভরশীল; এটি মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণার মূল বিষয়, যা আমাদের আচরণ ও মানসিক অবস্থা ব্যাখ্যা করে। এটি বুদ্ধি, বিবেকবোধ ও আবেগের প্রকাশ ঘটায় এবং এর রহস্য উন্মোচনে দর্শন থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞান পর্যন্ত বিভিন্ন তত্ত্ব প্রচলিত আছে। মানুষের মন মূলত সুখ, সন্তুষ্টি, ভালোবাসা, নিরাপত্তা, এবং অর্থপূর্ণতা চায়, যা বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়—যেমন ভালো সম্পর্ক, লক্ষ্য অর্জন, অন্যের কল্যাণ, শখ পূরণ বা মানসিক শান্তি। এটি একটি জটিল বিষয়, কারণ মন একই সাথে চিন্তা, অনুভূতি, ইচ্ছা, কল্পনা ও স্মৃতির সমষ্টি এবং এর চাহিদা ব্যক্তিভেদে ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়, যা প্রায়শই পরিবর্তনশীল ও জটিল।

এতকিছুর পরও তাহলে প্রথম সত্যি হচ্ছে—সবকিছুর আগে মন। কিন্তু প্রশ্ন আসে, কার মন? উত্তর খুব সহজ—মানুষের মন। এই মনই মানুষের অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দু, যা দিয়ে পৃথিবীকে দেখা হয়, অনুভব করা হয়। কবি তাই প্রশ্ন করেন, “মন ছাড়া কি মনের মানুষ হয়?” আবার কখনও অন্যজন বলেন, “পাগল মন রে মন আমার।” এই পাগল মনই যেন নিজের আবেগের জালে জড়িয়ে রহস্যময়তার এক অসীম সাগরে অথবা শুন্যে ভেসে বেড়ায় পৃথিবীর সমস্ত সীমানা অতিক্রম করে। এখন তাহলে সহজ ভাবনা হচ্ছে মন ভাসতে চাইলে ভাসুক, হারাতে চাইলে হারিয়ে যাক। যেখানে খুশি যেমন ইচ্ছেয় তার বিচরনের বাসনা পূর্ন হউক। বাঁধা কেন, কার কী তাতে। বাসনার জগত তো অনিয়ন্ত্রিত অসীম। কে তাকে করবে মানুষের অধীন, কোন মায়াবলে। আর তাই এই মানুষের মন নিয়ে কথা বলতে গেলে, সবাই প্রশ্ন করবে, কোন মানুষ, কোথাকার মানুষ। মানে তার স্থান, সংগ্রাম, অর্থনীতি, রাজনৈতিক পরিচয়, শ্রেনী অবস্থান ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে কাবু করে ছাড়বেন। ফানাপানা হয়ে যাবে প্রাণ সাথে মন। কারণ উপরের সবগুলো বিবেচ্য বিষয় এর সাথে মনের ধারনা, তার গন্ডি, চিন্তার রকমফের এমনকী মনের মানুষ ঠিক করার মতন মানুষিক গড়নও ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন বিদেশ্ী মানুষের মন। অথবা আর নিকটে যদি আমরা চিন্তা করি কিংবা দেশের অভ্যন্তরে মনের বিন্নাস, ধরন ধারন, প্রকৃতি, গতি, বোধ ইত্যাদি হয় আলাদা আলাদা। যেমন পাহাড়ী মানুষের মন। মানে যারা পাহাড় ঘেরা পরিমন্ডলে বাস করেন। অথবা সমুদ্র পারের মানুষের মন। তার মানে হচ্ছে মন অভিন্ন কিন্তু অঞ্চল ভেদে তার ব্যাপ্তি সীমানা আর ধরন হতে পারে ভিন্ন।

আরও পড়ুন:  উত্তরায় দম্পতিকে কোপানোর ঘটনায় পুরো চক্র গ্রেফতার: ডিএমপি

দেশের উত্তারাঞ্চল মানে রংপুর বিভাগের বড় অংশ সাথে ভারতের আসাম ও কুচবিহার জেলার তিস্তা পাড়ের মানুষের এই মনও তাই কখনো আবেগে, কখনো বাস্তবতায়, কখনো বা কল্পনার জগতে এক অন্য রকম দোলাচলে বসবাস করে। পাগলামি, আবেগ, আর জয় করার নেশা—এই তিনটি জিনিসই মিলে মনের মানুষকে নিজের করে নেওয়ার গল্প বলে যায়। মনকে জয় করা মানে আসলে নিজেকেই জয় করা। একদিকে জয়ের নেশা অন্যদিকে বাউল মন বলে ওঠেন- খেজুর গাছে হাড়ি বাধো মন। মানে মনকে বাঁধতে চান। মনকে মানুষের অধীন করার, তাকে তার দাস বানানোর এক অনবদ্য চেষ্টায় মেতে ওঠেন তাই কেউ কেউ। মন যদি অধীন হয়ে পড়ে, তাহলে কী তার ব্যাপ্তি সীমাবদ্ধ হযে পরে। মনের স্বাধীনতা কী বিঘ্নিত বা সীমাবদ্ধ হতে পারে। অথবা মনের গন্ডি সীমিত হয়ে পেন্ডুলামের মতো দোলাচলে দোলে।তাহলে মনের ধারনা কী। মন নিয়ন্ত্রণের ধারণা হলো নিজের চিন্তা, আবেগ এবং আচরণকে সচেতনভাবে পরিচালিত করার ক্ষমতা, যা ধ্যান, ব্যায়াম, লক্ষ্য নির্ধারণ ও মানসিক কৌশল (যেমন: ইতিবাচক চিন্তাভাবনা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম) ব্যবহারের মাধ্যমে অর্জন করা যায়, যাতে মনকে শান্ত রাখা, চাপ কমানো এবং জীবনের লক্ষ্য পূরণে মনোযোগী হওয়া যায়। এর মাধ্যমে ব্যক্তি অবচেতন মনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করে সচেতনভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কী ধারুন এই ধারনা। রোবট আর মানুসের মধ্যেকার নেকট্য বাড়ানো না কমানো আমাদের লক্ষ্য তা সবার আগে ঠিক করে নেয়া উচিত।

আরও পড়ুন:  শাহজালালে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কমিটি গঠন

তাই তিস্তা পাড়ের মানুষের এই মন, তাদের অনুভূতি, তাদের আবেগ—সবকিছু মিলে এক অনবদ্য গল্প তৈরি করে, যেখানে মনের মানুষ আর মানুষের মন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তিস্তা পাড়ের মানুষের এই মনও তাই কখনো আবেগে, কখনো বাস্তবতায়, কখনো বা কল্পনার জগতে এক অন্য রকম দোলাচলে বসবাস করে। পাগলামি, আবেগ, আর জয় করার নেশা—এই তিনটি জিনিসই মিলে মনের মানুষকে নিজের করে নেওয়ার গল্প বলে যায়। মনকে জয় করা মানে আসলে নিজেকেই জয় করা। রংপুরের তিস্তা-পাড়ের মানুষ, আর মানুষের মন। দুটোই এক অপূর্ব, মোহময় বিস্তার। নদীর মতোই উথাল পাতাল, কখনো উদ্দাম, কখনো মায়াবী কোমলতায়, নীরবতায় ভরা। তিস্তা ভাঙে, ভরা যৌবনে। একূল ভেঙে পড়ে, আবার ও কূলে গড়ে তোলে নতুন স্বপ্ন বালুময় আশা। জনজীবন হারায় না, সে শুধু স্থান বদলায়। নদীর পাড় আঁকড়ে ধরে মানুষ বাঁচে, স্বপ্ন দেখে, বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তিস্তা যেমন কেড়ে নেয়, তেমনি দুহাত উজাড় করে বিলিয়ে দেয়। আর তাই মানুষ মজে প্রেমে, নদী আর মানুষের আত্মার এই মিলন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবিরাম বয়ে চলে। যে পথে নদী কথা বলে, আর মানুষ বাঁচে প্রবল আশার বিশ্বাসে। আর তাই তিস্তা পারের মানুষের মনে বা প্রানে গান বাসা বাধে। তিস্তা পারের গান মূলত তিস্তাকে কেন্দ্র করে মানুষের জীবন-জীবিকা, দুঃখ-কষ্ট, নদী ভাঙা-গড়া, প্রকৃতি আর ভালোবাসার গল্প বলে, যেখানে ভাওয়াইয়া ও আঞ্চলিক সুরের মাধ্যমে জেলে, কৃষক এবং সাধারণ মানুষের মনের আবেগ, নদীকে ঘিরে বেঁচে থাকা ও প্রকৃতির বিরূপ প্রভাবের কথা ফুটে ওঠে, যা একই সাথে আশা, হতাশা আর সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। সাথে মনের ভিতরের অব্যাক্ত বেদনা, আশা , ভালবাসার প্রকাশ করে শিল্পির সুরেলা কন্ঠে। গেয়ে ওঠেন তিস্তা পাড়ের প্রাণ কোকিলা, কী কবার চান কন খুলিয়া। মনে রেখে লাভ কী, বলে ফেলুন। আহা কী ব্যকুল আহ্বান।

আরও পড়ুন:  বিএনপি নেতাকে গুলি করে হত্যা

লেখক পরিচিতি: মুক্ত লেখক ও অধিকার কর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *